ENG
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২ আশ্বিন ১৪২৪

রাজনীতি এখন ব্যবসার অংশ: রেহমান সোবহান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2017-02-18 23:49:30 BdST

bdnews24
রেহমান সোবহান (ফাইল ছবি)

বাংলাদেশে রাজনীতি বর্তমানে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।

শনিবার রাজধানীতে দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতিবিদদের এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‍“বাংলাদেশের রাজনীতি এক সময় নিম্ন মধ্যবিত্তের কাছে থাকলেও এখন তা ব্যবসার অংশ হয়ে গেছে। টাকার মালিকরা এখানে যুক্ত হয়ে গেছে।

“সরকারের অংশ হওয়ার জন্য (টাকাওয়ালারা) বিনিয়োগ করছেন; ওই বিনিয়োগ থেকে তিনি লাভের আশা করছেন। আর এভাবে রাজনীতিকে ব্যবসায়ীকরণের কারণে সমাজে নানা ধরনের অনিয়মও তৈরি হচ্ছে।”

এসময় ‘রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণে’ অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে রানা প্লাজা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

তিনি বলেন, “ভবনটি ধসের পর আমরা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম, রানা রাজনীতি করার কারণে কোনো আইনকে তোয়াক্কা করেননি।

“ওই ভবনের কেয়ারটেকার তাকে বলেছিল যে, ভবনটি ধসে যেতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি ওসবে তোয়াক্কা করেননি।”

সিপিডির চেয়ারম‌্যান বলেন, “এখন যেখানে অর্থ, সেখানেই রাজনীতি। বর্তমানে কোনো গরিব লোক অন্যায়ের শিকার হলে তার বিচার পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এমনকি থানায় একটি জিডি করাও সম্ভব হচ্ছে না।

“নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দিন ও তোফায়েল আহমদ রাজনীতি করলেও এখন সে সুযোগ নেই।”

রেহমান সোবহান বলেন, “বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটাই এমন হয়ে গেছে। রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।”

রাজধানীর ব্র্যাক-ইন সেন্টারে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-সানেম আয়োজিত দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনের শেষ সেশনে দেওয়া বক্তব্যে ক্ষমতার প্রভাবে সমাজে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রেহমান সোবহান বলেন, “যারা রাজনীতি করছেন, যখন ক্ষমতায় থাকছেন, তখন তারা সরকারের ক্ষমতা দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করে সমাজে বৈষম্য তৈরি করছেন।”

টেকসই উন্নয়নের জন্য ‘মানসম্পন্ন শিক্ষা’ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের এই সদস‌্য।

তবে শিক্ষা ব‌্যবস্থায় বৈষম‌্য নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শিক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ধনী গরিবের মধ্যে বৈষম্য হচ্ছে। এমনকি ভাষা শেখার মধ্যেও বৈষম্য বিদ্যমান। ধনীর সন্তান শহরে থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। আর গরিবের সন্তান গ্রামে থাকছে, বাংলা মিডিয়ামে পড়ছে।”

প্রতিযোগিতার এই যুগে এগিয়ে যেতে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার সমান সুযোগ তৈরির মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “তখন তারা মানসম্পন্ন উৎপাদন বা সেবা দিতে পারবে, বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে।”

শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করেই শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে বলে মন্তব‌্য করেন এই অধ‌্যাপক।

সরকারের সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি নিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “সরকারের প্রায় ৪০ লাখ একর খাস জমি আছে। এর বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। অথচ এসব জমি গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে বণ্টন করা হলে বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসবে।

“দেশে বৈষম্য কমিয়ে মানবসম্পদ তৈরি করতে হলে অবশ্যই সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ছোট ছোট পরিবারের কাছে জমি বা সম্পদের যোগান বা ভর্তুকি দিয়ে তাদের কাছ থেকে উৎপাদন আদায় করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের সম্মিলিত উৎপাদন দিয়ে বাজার সৃষ্টি করে ওই উৎপাদনের মূল্য সংযোজন করতে হবে।”

এ প্রসঙ্গে ভারতের ‌‘আমুল ডেইরি’র কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তারা ২০ থেকে ৩০ লাখ ছোট কৃষকের কাছে এক, দুই বা তিনটি গাভী দিয়ে সহযোগিতা করে। পরে ওই সব গাভীর দুধ সংগ্রহ করে ওই দুধ থেকে গুড়ো দুধ, বাটার, চকলেটসহ অনেক ধরনের দুগ্ধপণ্য তৈরি করে বিশাল বাজার সৃষ্টি করেছে।”

বৈষম্য কমাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদও।

তিনি বলেন, “টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করতে পারলেই বৈষম্য কমবে।

“উচ্চ আয় ও নিম্ম আয়ের মধ্যে যত বেশি পার্থক্য হবে, তত বেশি বৈষম্য বাড়বে।”

মানসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ার কথা বলেন ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ।