ওই অ্যাশেজের দ্বিতীয় টেস্ট ছিল সেটি। প্রথম টেস্ট জিতে সিরিজে এগিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। আলোচিত এই টেস্টে ২ রানের জয়ে সমতা ফেরায় ইংল্যান্ড। এখনও পর্যন্ত টেস্ট ইতিহাসের একমাত্র ২ রানের জয় সেটি। মূলত ওই জয় দিয়েই শুরু হয় অ্যাশেজ পুনরুদ্ধারের পথে ইংলিশদের অবিস্মরণীয় অভিযান।
২০০৫ সালের ৪ অগাস্ট শুরু হয়েছিল ম্যাচ। টস জিতে আগে বোলিং নেন পন্টিং। মার্কাস ট্রেসকোথিকের ব্যাটিং ঝড়ে প্রথম সেশনেই ইংল্যান্ড তুলে ফেলে ১৩২ রান!
প্রথম দিনই অবশ্যই ইংল্যান্ডকে অলআউট করতে পেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে ৮০ ওভারের কম খেলেই ইংলিশরা তুলে ফেলে ৪০৭ রান। পরের দিন অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে অলআউট হয় ৩০৮ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান বোলাররা ঘুরে দাঁড়ায়। ৬ উইকেট নেন শেন ওয়ার্ন, ৪টি ব্রেট লি। ইংল্যান্ড গুটিয়ে যায় ১৮২ রানে। জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৮২।
রান তাড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার টপ ও মিডল অর্ডার। ১৭৫ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে শেষ করে তারা তৃতীয় দিন। উত্তেজনাপূর্ণ তিনটি দিন শেষে আসল নাটক জমে ওঠে চতুর্থ দিনে। শেষ তিন ব্যাটসম্যানের চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে অসাধারণ এক জয়ের কাছে চলে যায় অস্ট্রেলিয়া। নবম উইকেটে ওয়ার্ন ও লি গড়েন ৪৫ রানের জুটি।
৪৩ রানে অপরাজিত ব্রেট লি নুইয়ে পড়েছেন হতাশায়, তার পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিচ্ছেন ইংল্যান্ডের জয়ের নায়ক অ্যান্ড্রু ফ্লিন্টফ, সেই ছবিটি জায়গা পেয়ে গেছে ক্রিকেটীয় স্পিরিটের চিরন্তন উদাহরণগুলোর তালিকায়।
উজ্জীবিত ইংল্যান্ড পরে সিরিজও জিতে নিয়ে দেড় যুগ পর পুনরুদ্ধার করে অ্যাশেজ। বলা হয়, ২ রানের ওই জয়ই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল ইংলিশদের।
টস জয়ের পর পন্টিংয়ের সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল তখনই। অস্ট্রেলিয়া হেরে যাওয়ার পর প্রশ্নগুলো উচ্চকিত হয় আরও। ওই ম্যাচের উত্তেজনা নিয়ে যেমন, তেমনি টস জয়ের পর পন্টিংয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে চর্চা হয়েছে বছরের পর বছর, হয় এখনও।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পন্টিং ফিরে তাকালেন ১৫ বছর আগের সেই দিনটিতে। জানালেন, সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরই চূড়ান্ত হয়েছিল টসের সিদ্ধান্ত। এখনও কি মনে হয়, সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল? পন্টিং জানালেন উত্তর।
“অবশ্যই, এখনও সেটিই মনে করি। মাত্র এক রানেরই (২ রান) ব্যাপার ছিল, তাই না? ম্যাচের কোনো এক পর্যায়ে আরেকটি রান বেশি হলেই হয়ে যেত। নিজের ওই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ নিয়ে আমি এখনও অটল। যদিও ম্যাচের প্রথম দিনে যা হয়েছিল ও চূড়ান্ত ফল যা ছিল, সেদিকে তাকালে টসের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করা কঠিন।”
“ কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও এরকম ছিল না যে টস করতে গেলাম আর চট করে বোলিং নিয়ে ফেললাম। কয়েকদিন ধরেই আমরা আলোচনা করছিলাম যে কী করা উচিত এবং জয়ের সেরা পথ কোনটি। আমরা খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম।”
“ টেস্টের আগে আবহাওয়া খুব বাজে ছিল। সাইক্লোন বয়ে গিয়েছিল, উইকেট ঢেকে রাখা ছিল কয়েক দিন ধরে। পাশাপাশি আমরা জানতাম, আমাদের বোলাররা প্রথম টেস্টে ওদের ব্যাটসম্যানদের ওপর দাপট দেখিয়েছে। সবকিছু মিলিয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছিল আগে বোলিং করার।”
“ আমরা আশা করেছিলাম, উইকেটে প্রথম দিনে সহায়তা মিলবে… কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। বোলাররাও ভালো করেনি। আমরা নো বল করেছি কিছু, নো বলে উইকেট পেয়েছি, লাঞ্চের সময়ই ওরা বিনা উইকেটে ১২০ হয়ে যায় (১ উইকেটে ১৩২)। তখনই ভাবছিলাম, নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
অস্ট্রেলিয়া আরেকটা ধাক্কা খেয়েছিল ম্যাচ শুরুর আগে। গা গরমের সময় বলের ওপর পা পড়ে অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে ছিটকে যান গ্লেন ম্যাকগ্রা। আগের টেস্টে ৯ উইকেট নিয়ে তিনিই ছিলেন ম্যাচের সেরা।
সেই টস নিয়ে এখনও চর্চা হয়, লোকে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান, এসব নিয়ে অবশ্য আপত্তি নেই পন্টিংয়ের। বরং ক্রিকেটের বৃহত্তর ছবিটাই তার চোখে ভাসে বেশি।
“ লোকে যা মনে করার করবে, যা বলার বলবে। সমস্যা নেই। এসব জীবনেরই অংশ এবং ইতিহাসের এমন একটি অংশ, যা নিয়ে লোকে যুগ যুগ ধরে কথা বলবে।”
“ ইতিহাস বলবে, এটি ছিল অবিশ্বাস্য এক টেস্ট ম্যাচ, যেখানে কেবল একটি রান (২ রান) নির্ধারণ করে দিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য, সম্ভবত সিরিজের ভাগ্যও। শেষ পর্যন্ত এতটাই কাছাকাছি ছিল লড়াই।”