সব সময় বলতে পারি না: জঙ্গি নিয়ে পুলিশ কর্তা

ঢাকায় জঙ্গিবাদবিরোধী এক সভায় অংশ নিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, দেশের শত শত যুবক জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, এদের কাউকে কাউকে ধরার পর তথ্য জানতে অনেক ক্ষেত্রে কৌশল নিতে হয় তাদের।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ‘গুম’ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগের মধ্যে একথা জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার।

বৃহস্পতিবার ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই সভায় শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনাদের মধ্য থেকেও তো কিছুদিন আগে একজনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আপনাদের মতোই শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। কি, নিয়ে যাই নাই অ্যারেস্ট করে?

“উত্তম দা (হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া) সাক্ষী, এক বছর আগে আপনারা মানববন্ধন করেছেন, রাস্তা অবরোধ করেছেন। আমরা নিয়ে গিয়েছি, আমরা তো বলতে পারি না সব সময়। কারণ তার কাছ থেকে তো অনেক কিছু বের করতে হবে। সব কথা বলা যায় না। সহজ কথা যায় না বলা সহজে।”

গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসক শামীম খান নিখোঁজ হন, তার সন্ধান দাবিতে মানববন্ধন করেন সহপাঠীরা। নিখোঁজের ৩০ ঘণ্টা পর অচেতন অবস্থায় শামীমকে পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটির মসজিদে বোমা হামলায় জড়িত দুজনকে ওই ছাত্র মেডিকেলের ছাত্রাবাসে আশ্রয় দিয়েছিল বলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হয়েছিল। পরে ছাত্রাবাসে এসে ওই দুজনকে না পেয়ে আশ্রয়দাতা ওই ছাত্রকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ইন্টার্নির বাকিটা শেষ করতে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে পাঠানো হয়।”

গত অগাস্ট থেকে চার মাসে ঢাকায় রাজনীতিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী মিলে ডজনখানেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়সহ চারজন পরিবারের কাছে ফিরে এলেও অধিকাংশের এখনও সন্ধান জানা যায়নি।

সর্বশেষ ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিদেশফেরত মেয়েকে আনতে ধানমণ্ডির বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশে বের হয়ে নিখোঁজ হন সাবেক কূটনীতিক এম মারুফ জামান।

তার স্বজনরা বলছেন, মারুফ জামান বাসা থেকে বেরোনোর ঘণ্টাখানেক পরে বাসায় ফোন (ল্যান্ডফোনে) করে কয়েকজন লোক গেলে তাদের কাছে তার ল্যাপটপ দিয়ে দিতে বলেন। পরে তিনজন ‘সুঠামদেহী’ লোক মুখ ঢেকে ওই বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ, ডেস্কটপের হার্ডডিস্কসহ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে আসেন।

এর আগে গত ৭ নভেম্বর বিকালে নিখোঁজ হন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুবাশ্বার হাসান সিজার। তার সন্ধান দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী মানববন্ধন করলেও এখনও খোঁজ মেলেনি সিজারের।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৫৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। এসব ব্যক্তির মধ্যে পরিবারের কাছে ফিরেছেন সাতজন, পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে পাঁচজনকে এবং লাশ উদ্ধার হয়েছে দুজনের।

ওই পরিসংখ্যান উদ্বেগ জানিয়ে সংস্থাটির সাবেক কর্মকর্তা মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছিলেন, “অধিকাংশ পরিবারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছিল। এদের কেউ পরবর্তীতে ফিরে এলে ভয়ে কিছু বলতে চান না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে তার গণতান্ত্রিক আচরণে ফিরতে হবে।”

যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে এর কর্মী ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার খুন হন। এরপর তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় লেখক ব্লগার অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নিলাদ্রী নিলয়সহ বেশ কয়েকজন ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে। সে সময় খুনিদের গ্রেপ্তার দাবিতে আন্দোলন হলেও তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন সাড়া মেলেনি।

এরপর ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশিসহ অন্তত ২২ জন নিহত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর জঙ্গি গোষ্ঠী ‘নব্য জেমবি’ এবং আনসারউল্লাহ বাংলা টিম ও আনসার আল ইসলামের অনেক জঙ্গি ধরা পড়েন, পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন অনেকে।   

পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী কর্মকাণ্ডের ‘অল্প অংশই’ প্রকাশ্যে আসে। এর বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে।  

“যখন পুলিশ অপারেশন করে, যখন দুইজন অ্যারেস্ট হয়, দুইজন মারা যায়, দুইটা গুলি-বোমা উদ্ধার হয়, তখন জিনিসটা ভিজিবল হয়, আপনি দেখেন। কিন্ত এর পেছনে শত শত ঘটনা রয়ে গেছে, যেগুলো আপনারা দেখেন না, খবরে কখনও আসে না।”

তিনি বলেন, “জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে পুলিশ প্রতিনিয়ত কাজ করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি কীভাবে শত শত তরুণ-যুবক জঙ্গিবাদী হয়ে উঠছে। আপাত দৃষ্টিতে আপনি তো মনে করছেন, কোথাও তো কিছু নাই। কিন্তু না, অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি দমন করতে পেরেছে মন্তব্য করে ডিসি বিপ্লব বলেন, তবে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তার জন্য দরকার তারুণ্যের জাগরণ।

অনুষ্ঠানে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, “জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তারা ধর্মের নামে মানুষ মারছে। সমাজের সবাই এগিয়ে এসে জঙ্গিবাদ নির্মূলে কাজ করতে হবে।”

অন্যদের মধ্যে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের পরিচালক কানতারা খান আলোচনায় অংশ নেন।