মহামারীকালে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেশি চট্টগ্রামে: জরিপ

কোভিড-১৯ মহামারীকালে দেশজুড়ে অনিয়ম ও আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে, এসব ঘটনার ২০ দশমিক ৫ শতাংশই ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে।

শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে সামাজিক অস্থিরতার ঘটনা বেশি দেখা গেছে বলে জানাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও মাইক্রোগভর্নেন্স রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের এই যৌথ জরিপের প্রতিবেদন।

'কোভিড-১৯ সামাজিক প্রভাব: বাংলাদেশে বিরোধ, অস্থিরতা ও সংঘর্ষ প্রবণতা' শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় মোট ১৪১৬টি আর্থ-সামাজিক  দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও সহিংসতার  ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চে ৩৪৭ এবং এপ্রিল ১০৬৯টি ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা কার্যকর হয় ২৫ মার্চ থেকে। এরপর তা দফায় দফায় বাড়ানো হয়।

জরিপ প্রতিবেদন বলছে, দেশে মার্চের প্রথম সপ্তাহে অস্থিরতা-সহিংসতার ঘটনা ছিল মাত্র ৯টি। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এসে ৩৮৩টি ঘটনা পাওয়া যায়।

জেলাভিত্তিক আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এই জরিপে।

ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্ট্রোরাল সিস্টেম (আইএফইএস) ও ইউকেএআইডি সহায়তায় সম্পাদিত এই গবেষণায় কাজ করেছেন দেশের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন তরুণ গবেষক। জরিপের সার্বিক সমন্বয় করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আইনুল ইসলাম।  

জরিপ অনুযায়ী দেশজুড়ে অনিয়ম ও সহিংতার ঘটনাচিত্র

ঘটনা

সংখ্যা

ত্রাণসামগ্রী ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ বিতরণে অনিয়ম,দুর্নীতি ও সংঘর্ষ

৩১০

বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ

১৩৭

ভুয়া তথ্য, গুজব ও কটুক্তির কারণে সংঘর্ষ -সহিংসতা

১৬৩

গ্রেফতার ও তুলে নেওয়া

৭৬

নারী নির্যাতন-নিপীড়ন

১৬৩

বিরোধ,আক্রমণ ও সংঘর্ষ

১৩৯

ঘরে অবস্থান না করা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলায় জরিমানা

৩৭৯

এসব সংঘর্ষ ও সহিংসতার  ২৫ দশমিক পাঁচ নয় শতাংশ ঘটনার সঙ্গে সাধারণ মানুষ জড়িত বলে দেখা গেছে জরিপে।

এছাড়া ১৩ দশমিক পাঁচ দুই শতাংশ ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ১৭ দশমিক পাঁচ পাঁচ শতাংশ ঘটনায় প্রশাসন, ৮ দশমিক চার চার শতাংশ ঘটনার সাথে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক, ৭ দশমিক পাঁচ দুই শতাংশ ঘটনার সাথে গ্রাম্য মাতব্বর এবং ৬ দশমিক দুই শূন্য শতাংশ ঘটনার সাথে ব্যবসায়ীরা জড়িত রয়েছে।

বিভাগীয় পর্যায়ে সহিংতার ঘটনায় শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ এবং সিলেট বিভাগ রয়েছে তালিকার সব শেষে।

সহিংসতার বিভাগীয় চিত্র

বিভাগ

শতকরা

চট্টগ্রাম

২০.৫৫%

ঢাকা

১৭.০২%

খুলনা

১৩.৯১%

রংপুর

১২.৩৬%

বরিশাল

১০.৬৬%

রাজশাহী

৯.৩৯%

ময়মনসিংহ

৮.১২%

সিলেট

৭.২০%

জেলা পর্যায়ে সামাজিক অস্থিরতার দিক থেকেও প্রথম স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম; ৮৯টি ঘটনা। এতে দ্বিতীয়,  তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে বরিশাল (৬১টি),  হবিগঞ্জ (৫৮টি), ঝিনাইদহ (৫৫টি)। এ ধরনের ১১টি ঘটনা নিয়ে তালিকার শেষে রয়েছে  মেহেরপুর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাস সঙ্কটে সংঘর্ষ ও সহিংসতার দিক থেকে  সবচেয়ে আলোচিত জেলা  ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটেছে মাত্র ২০টি ঘটনা।

দেশজুড়ে মহামারী অবরুদ্ধ দশার এই সময়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টিকারী ৫৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে গ্রামে বলে জানাচ্ছে ওই প্রতিবেদন।  

এতে বলা হয়, শহরাঞ্চলে এমন ঘটনা পাওয়া গেছে তুলনামূলক কম; ৪০ দশমিক নয় ছয় শতাংশ।

এসব সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৯ জন, আহত হয়েছেন ৪৮৬ জন  এবং  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন ৮০২ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও মাইক্রো-গভর্নেন্স রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'কীভাবে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলা করছে' শীর্ষক  ওয়েবেনিয়ারে এসব তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়।

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৬ মে একটা ওয়েবেনিয়ার (অনলাইন সেমিনার) অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে  অংশ নিচ্ছে।”

আগামী ২৭ মে পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই ‘ওয়েবেনিয়ার’ চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য এই সংকটকালে শিক্ষার্থীদেরকে অনলাইন এডুকেশনে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের মাধ্যমে সমাজে সচেতনতামূলক মেসেজ পৌঁছানো।

“বিদেশি অনেক শিক্ষার্থীও আগ্রহের সাথে এই ওয়েবিনারে অংশ নিচ্ছে। প্রথমদিন ১৫৮ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছেন। পরের দিন ১৪৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।”

‘ওয়েবিনার’ শেষে পূর্ণ সময়ে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।

এই অনলাইন সেমিনার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেক হালিম বলেন, “কোভিড-১৯ এর মতো অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা তৈরি ও সংক্রমণ রোধে কমিউনিটিকে তথ্য দিয়ে শক্তিশালী করবে এই ওয়েবিনার।

“এছাড়া এই সময়ে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য ও গুজবেব বিরুদ্ধে তরুণরা সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।"

১০টি সিরিজের মাধ্যমে প্রতিদিন দুইটি সেশনে করোনাভাইরাস সংকটে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা আলোচনা করা হবে এই ওয়েবিনারে বলে জানান তিনি।

কোভিড-১৯  সঙ্কট মোকাবেলায় সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদার মানুষদের অধিকার, রোহিঙ্গা ইস্যু,  নারীর নিরাপত্তা, প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার সুষম বণ্টন, ভুল তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে তরুণদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

অধ্যাপক আইনুল ইসলামের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে পর্যায়ক্রমে আরো যুক্ত হবেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলওয়ার হোসেন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, এটুআই প্রোগ্রামের  ন্যাশনাল কনসাল্টেন্ট ভাস্কর ভট্টাচার্য, আইএফইএসের কান্ট্রি ডিরেক্টর সিলজা পাসিলিনা, আইএফইএসের আঞ্চলিক পরিচালক বাসু মোহন, আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ড. এ এস এম আলমগীরসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা।