লকডাউন: করোনাভাইরাসের মৃত্যুময় সপ্তাহে কমেছে শনাক্তের হার

করোনাভাইরাসে মৃত্যুর রেকর্ডময় সপ্তাহ পার করে দেশে পরীক্ষার বিপরীতে দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার কমেছে।

সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধের ‘সর্বাত্মক লকডাউনে’র এই সপ্তাহে বেড়েছে মৃত্যুর হার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও এনসিডিসির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “লকডাউন চলছে, এ কারণে মানুষ নমুনা পরীক্ষার জন্য খুব বেশি উৎসাহিত হচ্ছে না। এর মধ্যেও মঙ্গলবার ২৭ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করেছি। তাতে সংক্রমণের হার হচ্ছে ১৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ।“

আক্রান্তের এ হার ‘গত কয়েকদিনের তুলনায় কম’ জানিয়ে তিনি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবাইকে লকডাউনের বাকি দিনগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিকরণ এবং জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে সংক্রমণের হার গত কয়েকদিনে কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। কিন্তু এই যে মৃত্যু বেড়ে গেছে, এটা আমি বলব আমরা গত দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে অনেক রিল্যাক্সড ছিলাম, স্বাস্থ্যবিধি মানিনি এসব কারণেই হচ্ছে।

“দুই সপ্তাহব্যাপী যে লকডাউন চলছে তা যদি সুনির্দিষ্টভাবে পালন করতে পারি, তাহলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে।“

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২১ এপ্রিল সকাল আটটা পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৬৯৮ জন।

দৈনিক মৃত্যুতে রেকর্ড ছাড়ানোর এই সপ্তাহে নতুন এই ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬০২ জন।

সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পরদিন ১৫ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৭ হাজার ৩৬২ জন। ২১ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট শনাক্ত দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৩২ হাজার ৬০ জনে। এ সময় দৈনিক গড়ে শনাক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৫২৮ জন মানুষ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহব্যাপী দৈনিক শনাক্তের এই সংখ্যা আগের দুই সপ্তাহের চেয়ে কম।

এ বছর মার্চের পর থেকে দেশে আবার সংক্রমণ বাড়তে থাকে। ওই মাসের শেষের দিকে এবং এপ্রিলের প্রথমে এর বিস্তার আরও বাড়ে।

মহামারীর এই বিস্তার ঠেকাতে প্রথমে একগুচ্ছ বিধিনিষেধ দিয়ে সীমিত আকারে ৫ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যা লকডাউন নামে পরিচিতি পায়।

এরপর অফিস বন্ধসহ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের মধ্য দিয়ে ১৪ এপ্রিল এক সপ্তাহের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ দেওয়া হয়; পরে সরকার তা বাড়িয়ে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে।

লকডাউনের আগের এবং চলাকালীন সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৩৭ হাজার ৩৮ জন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। দৈনিক গড়ে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ২৯১ জন।

এর আগে গত বছরের ২ জুলাই একদিনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর গত ২৯ মে দৈনিক সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হয়। এদিন একদিনেই শনাক্ত হয় ৫ হাজার ১৮১ জনের।

এরপর থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে দৈনিক সংক্রমণ প্রায় আট হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে।

এই ধারা বজায় ছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেও। ১ থেকে ৭ এপ্রিল কোভিড শনাক্ত হয় ৪১ হাজার ৫১৪ জনের। এ সময় দৈনিক গড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৯৩১ জন।

দেশে মহামারী দেখা দেওয়ার পর এক সপ্তাহে এত রোগী আর কখনো শনাক্ত হয়নি।

লকডাউন শুরুর পর শনাক্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও বেড়েছে মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ আরও দেখা গেছে, ১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪২ জন, ৮ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৬৬ জন কোভিড আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন।

এরপর ১৫ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬০২ জনের। এ যাবতকালে বাংলাদেশে এটাই এক সপ্তাহে মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা।

গত সপ্তাহে টানা চার দিন দৈনিক মৃত্যু একশোর ওপরে ছিল। ১৯ এপ্রিল রেকর্ড ১১২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ফাইল ছবি

মৃত্যুর রেকর্ডময় সপ্তাহগুলোর মধ্যে অবশ্য দৈনিক নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ বেড়েছিল, লকডাউন শুরু হলে যা কিছুটা কমেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ মার্চ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় দেড়মাস ধরে নমুনা পরীক্ষা ক্রমাগত বেড়েছে। এক পর্যায়ে ৪ এপ্রিলের পর থেকে দৈনিক নমুনা পরীক্ষা ৩০ হাজারের বেশি হয়। ১২ এপ্রিল একদিনেই সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার ৯৬৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে।

এরপর লকডাউনের কড়াকড়ি শুরু হলে নমুনা পরীক্ষা কমতে থাকে। এক পর্যায়ে নমুনা পরীক্ষা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

১৬ এপ্রিল ১৬ হাজার ১৮৫টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল। পরে গত কদিন অবশ্য নমুনা পরীক্ষা আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

মঙ্গলবার একদিনে ২৭ হাজার ৫৬টি এবং বুধবার সারাদেশের ৩৩৫টি পরীক্ষাগারে ২৮ হাজার ৪০৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমার সঙ্গে সংক্রমণের হারও কমছিল। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় সময় থেকে তা আবার বাড়তে থাকে।

এপ্রিলের শুরুতে পরীক্ষা অনুযায়ী দৈনিক শনাক্তের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। গত ৫ এপ্রিল পরীক্ষা অনুযায়ী দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা গত ১০ অগাস্টের পর একদিনে সর্বোচ্চ। গত দুই সপ্তাহ ধরে পরীক্ষা অনুযায়ী শনাক্তের হার ২০ শতাংশের আশপাশে ছিল।

তবে গত কয়েকদিনে তা কমতে শুরু করেছে। বুধবার নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী শনাক্তের হার ছিল ১৫ দশমিক ০৭ শতাংশ। মঙ্গলবার ১৬ দশমিক ৮৫, সোমবার ১৭ দশমিক ৬৮, রোববার ১৯ দশমিক০৬, শনিবার ২১ দশমিক ৪৬, শুক্রবার ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার শনাক্তের হার ছিল ২১ শতাংশ।

আরও পড়ুন:

করোনাভাইরাসে আরও ৯৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৪২৮০  

কোভিড-১৯: দ্বিতীয় ঢেউয়ে কেন বিপর্যস্ত ভারত  

করোনাভাইরাস: প্রথম ডোজ পাওয়া ২৯ শতাংশের টিকার ‘কোর্স’ পূরণ  

কোভিড-১৯: আক্রান্ত বেশি যুবকরা, মৃত্যু বেশি বয়স্কদের  

লকডাউনের বিধিনিষেধ ২৮ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত