মেয়রদের আক্ষেপ, মন্ত্রীর প্রশংসা

রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ এবং নিজেদের ক্ষমতা না থাকা নিয়ে এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করেছেন ঢাকার দুই মেয়র।

সেখানে উপস্থিত স্থানীয় সরকার মন্ত্রী দুই মেয়রের প্রশংসা করে বলেন, তিনি তাদের সঙ্গে আছেন।

শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে ৫০ বছরের অর্জন উদযাপন নিয়ে এই অনুষ্ঠান হয়। আয়োজক ছিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থা ওয়াটারএইড।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ছিলেন বিশেষ অতিথি।

নিজের এলাকার লেকের দূষণ নিয়ে মেয়র আতিক আক্ষেপ করে বলেন, “এত সুন্দর করে ঢাকা শহর গড়তে চাইছি। বর্জ্য কোথায় যাবে? অভিজাত এলাকার লেক-বনানী-গুলশান লেক, আমাদের হাতিরঝিল সব নোংরা। আমরা মাছ ছাড়তে পারি না। পানিতে বর্জ্য পড়ছে। পানি দূষিত হচ্ছে। নর্দমার পানি দূষিত। খালে সেই পানি পড়ছে সেটাও দূষিত। খালের পানি নদীতে পড়ছে, নদী দূষিত। খাল দখল হয়ে যাচ্ছে।”

“ওয়াসার এমডি আছেন এখানে। ১৭৩ একর জমি। মাত্র তিন একর দখলমুক্ত। বাকিটা দখলে।”

পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে আতিক বলেন, “পাঁচটা পয়ঃনিষ্কাশন প্লান্ট হতে যাচ্ছে। এতে কিন্তু সব বাসা-বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন হবে না। কিছু বাকি থাকবে। হয়তো ৮০ ভাগ পর্যন্ত করা যাবে। কিন্তু সেগুলেতো ২০৩০ সালে হবে। কিন্তু এই মধ্যবর্তী সময়ে আমরা কী করব? আমার প্রস্তাব হচ্ছে, প্রত্যেক বাসা-বাড়িতে সোকওয়েল প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যথাযথ নকশার সোকওয়েল থাকতে হবে। যারা বাসা-বাড়ি বানাচ্ছে তাদের একটা আইনের মধ্যে আনতে হবে।”

সিটি কর্পোরেশনের জায়গা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাসা-বাড়ির স্লাজ নেওয়ার জন্য অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। এখন উত্তরের ময়লার জন্য মিরপুর যেতে হচ্ছে, আমিনবাজার যেতে হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক ডাম্পিং স্টেশন করতে পারলে তেলে খরচা কমে যেত। ট্রাফিক জ্যাম কমে যেত। কিন্তু জায়গা তো নেই। আমাদের যদি জায়গা দেওয়া হয় তাহলে আমরা অনতিবিলম্বে কাজটা আমরা করতে পারি।“

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, তারা দুই মেয়র ‘নাজুক’ অবস্থায় আছেন।

“আমাদের দুই মেয়রের অবস্থা খুব নাজুক। কিছুদিন পর পর শুনি আমাদের নিয়ে বলা হয়, ‘উনারা শুধু অভিযোগ করেন।’ আসলে ঢাকা যেহেতু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে এবং জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। এজন্য এত সংকট-সমস্যা। এগুলোর নিরসন করতে হলে আমাদেরকে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হয়। এবং জোরালোভাবে তুলে ধরতে হয়।”

ওয়াসার কাজের উল্লেখ করে সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, “আমি সংসদ সদস্য ছিলাম, তখন দেখেছি, ওয়াসার এমডি আমাদের সাথে ছিলেন। তীব্র পানি সংকট ছিল। পানির জন্য হাহাকার ছিল। আমরা পানির পাম্প বসানোর কাজ শুরু করি। আজ ১২ বছর হচ্ছে, এখনও সমাধান একটাই। পাম্প বসানো। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা। ২০০৯ সালে ৫০০ মিটারের পানি পেয়েছি। এখন পাওয়া যায় না। ১২০০ মিটার গভীরে যেতে যাচ্ছে। ঢাকার পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে।”

রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্বে থাকা ওয়াসার কাজের সমালোচনা করে দক্ষিণের মেয়র বলেন, “ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর নেই। পয়ঃব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে সেটি ঠিক করা হয়নি। আমি বনানীর ১৮ নম্বর সড়কে আমি থাকি। সেখানে যে নান্দনিক লেক রয়েছে, একদিকে গুলশান আরেকদিকে বনানী। সেই লেকটায় দশ মাস পয়ঃ দিয়ে ভরা থাকে, দুর্গন্ধ থাকে, মশা হয়।

“আতিক ভাই অনেকবার চেষ্টা করেছে, পরিষ্কার করে দিয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করা যায়নি। গুলশানের সেই অংশ এবং নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয়সহ বৃহৎ অংশের পয়ঃনিষ্কাশন সেখানে হচ্ছে। এখনই যদি নজর না দেই তাহলে টেকসই উন্নয়ন ঢাকার জন্য হবে না।”

তাপস বলেন, “পয়ঃনিষ্কাশনের মূল দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। কতটুকু করা হয়, কতটুকু হয় না তা পরিষ্কার নয়। খালে পরিষ্কার পানি প্রবাহমান নেই। ৯৫ ভাগ বাসায় সোকওয়লে নেই, সেপটিক ট্যাংক নেই। আমরা একটা গণবিজ্ঞপ্তিতে দিয়েছিলাম যে, নিজস্ব ব্যবস্থায় সোকওয়েল-সেপটিক ট্যাংক করতে হবে। গণবিজ্ঞপ্তির টাকাটাই অপচয় হয়েছে। কেউ উদ্যোগ নেয়নি। তাদের বাধ্য করতে হবে। নিয়ম আছে ইমারত নির্মাণ করতে হলে সিটি কর্পোরেশনের থেকে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেটা রাজউক করে।

“ইমারত নির্মাণের সময় আমাদের অনুমতি নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে আমরা পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে কাজ করতে পারতাম। যেহেতু আমাদের হাতে ক্ষমতা নেই, আমরা কোনো দিকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছি না। এই পয়ঃনিষ্কাশন কবে নাগাদ হবে? ২০৩০ সাল নাকি ২০৪১ সাল। নাকি আরও দূরে ২১০০ সাল ডেল্টা প্ল্যান নাগাদ। আমার মনে হয় যে পরিস্থিতি ২১০০ পর্যন্ত নিলে সকলে দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকব। দায়িত্ব আর নিতে হল না। ২১০০ তে যে আসবে সেই করবে।”

কাজের জন্য জমি পাচ্ছেন না মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, “আমাদের নগর পিতা বলা হয়, কিন্তু আমাদের জমি নেই। জমির জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে।”

পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম দুই মেয়রের প্রশংসা করে বলেন, “দুই মেয়রের কমিটমেন্ট আছে। তারা এনার্জেটিক, দেশপ্রেমিক। সেজন্য খালগুলো সিটি কর্পোরেশনের কাছে দিয়েছি। আগে ওয়াসার কাছে ছিল। তাদের দেওয়া হলেও সেটা তাদের কাজ নয়।“

মেয়রদের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “খালের পাড়ে কিছু অবকাঠামো এমনভাবে ছিল যেটা শহরকে নরক করার জন্য যথেষ্ট। সেগুলো ভাঙা হয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে আছি। হাতিরঝিল যাদের দায়িত্ব তারা ইরেসপনসিবল। যার যা কাজ সেটা করতে হবে। আমি আসার সময় দেখলাম, যা অবস্থা হাতিরঝিলের।”

স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান।