জলবায়ুর ক্ষতির মুখে যারা, আলোচনায় তাদের কথা আসে না: রেহমান সোবহান

সংলাপে রেহমান সোবহান
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারপার্সন অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

জাতিসংঘের ২৬তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন বা কপ২৬ সামনে রেখে রোববার এক সংলাপে এ পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের এই সদস্য বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নিয়ে যারা কথা বলেন, আর যারা এর কারণে ক্ষতির সম্মুখীন, তাদের মধ্যে শ্রেণির ব্যাপার রয়েছে।

“এ কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা লোকেরা সেভাবে আলোচনার টেবিলে আসে না। জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক আলোচনার দুই জায়গাতেই।”

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ‘সবচেয়ে বেশি দূষণকারী’ দেশের সঙ্গে ‘সবচেয়ে বেশি দূষণকারী’ ব্যক্তিকেও চিহ্নিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

রেহমান সোবহান বলেন, ”যারা নদী দখল করছে, পানিতে দূষিত ময়লা ফেলছে। কারণ, তাদের বেশি টাকা পয়সা আছে, রাজনৈতিক প্রভাব আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি আসলে কী করতে পারেন। এটাই আমাদের জন্য সতিক্যকারের চ্যালেঞ্জ।”

ভার্চুয়াল পরিসরে ’কপ২৬ এর বাংলাদেশের প্রত্যাশা’ শীর্ষক ওই সংলাপ আয়োজন করে সিপিডি এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেইঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি) যৌথভাবে।

রেহমান সোবহান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জমি হারানো, নদী ভাঙন ও লবণাক্ততা প্রভৃতি কারণে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। এটা বৈশ্বিক উষ্ণতার একটা ক্ষতিকর প্রভাব।

”বৈশ্বিক পর্যায়ে যা ঘটুক না কেন, যে ধরনের সম্পদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক না কেন, পরিবেশগত কারণে মানুষ যে ঝুঁকি মোকাবেলা করছে সেটা তুলে ধরতে হবে। আমরা কতটা সফলভাবে করতে পারছি, সেটা দেখার বিষয়।”

জলবায়ু তহবিলসহ অন্যান্য উদ্যোগের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় অগ্রগতি অর্জন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন, “আমার কাছে মনে হয়, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকটা ব্যবসায়িক বিষয়। আমরা যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জিএসপি স্কিম দেখি, যা ইইউ পার্লামেন্টে আলোচনা হচ্ছে।

২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের নতুন জিএসপিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে গ্রিন গোথ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু শর্ত হিসাবে থাকছে। চামড়া শিল্প ও তৈরি পোশাক কীভাবে তৈরি হয়, সেদিকে নজর না দিলে সেক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হবে।

”জিএসপিতে এমন বিষয় রাখা হচ্ছে, যাতে এটাকে পরিবেশসম্মত উপায়ে উৎপাদন করা হয়। এটা আমাদের জন্য আর বিকল্প নয়, এটা এখন আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়তা। বিশেষ করে যখন আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণ করব। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।”

ঝুঁকির মুখে থাকা ৪৮ দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি শেখ হাসিনার বিশেষ দূত আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বলেন, প্রত্যেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কি কি অবদান রাখছে, তা প্রতিবছর পর্যালোচনার কথা বলছে সিভিএফ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটছে।

”মনিটরিং একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এটা বলেছেন- মুখের কথা যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো দেশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবার সরে এসেছে। আমরা জানি এটা মানা বাধ্যতামূলক, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের জন্য, উন্নত দেশের জন্য নয়।”

এলডিসি, সিভিএফ ও জি-৭৭ প্লাস চীনের মতো জোটগুলোকে সক্রিয় করার উপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা যেসব জোট আছে, তাদের সমন্বয় করে কাজ করা দরকার।

”যাতে যেসব দেশ প্যারিস চুক্তি এবং কার্বন নিঃসরণ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে রাখার বিষয় মানছে না, তাদেরকে বেশি পরিমাণে চাপে রাখতে পারি।“

আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমরা প্রতিটি দেশকে বলছি, যাতে সবাই তাদের প্রসপারিটি প্ল্যান নিতে পারে। বাংলাদেশ অনেক কাজ করতে পেরেছে, কারণ আমাদের নিজেদের জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে।”

আইসিসিসিএবি পরিচালক সলিমুল হক বলেন, “জলবায়ু সম্মেলন কারও একার বিষয় নয়, এটা হচ্ছে বিশ্ব নেতাদের বিষয়- তারা তাদের সন্তানদের জন্য বসবাসযোগ্য না কি বসবাস অযোগ্য পৃথিবী রেখে যাবে। এই বৈশ্বিক সমস্যার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ দরকার।

”বাংলাদেশ কেবল নিজের প্রতিনিধিত্ব করছে না, সিভিএফের আওতায় প্রায় ৫০টা ঝুঁকির মুখে থাকা দেশেরও প্রতিনিধিত্ব করছে।”

তিনি বলেন, সরকারগুলো সবকিছু করে দিবে না, বেসরকারি খাতের বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চাইতে বেশি ভূমিকা রাখার আছে। সমাজের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ব্যাপার আছে।”

কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জলবায়ু তহবিল গঠন না হওয়ার কথা তুলে ধরে সলিমুল হক বলেন, “প্রতিশ্রুতি ১২ বছর আগে কোপেনহেগেনে দেওয়া হয়েছিল। তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ১০০ বিলিয়ন ডলারের সংখ্যা বলেছেন। যা ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত হয়।

”যেটাতে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন হওয়ার কথা ২০২০ সাল থেকে। এটা এমনিতে বলা সংখ্যা, হিসাব করে করা হয়নি। এবারও আমি মনে করি না, তারা এটা পূরণ করতে পারবে।”

নিজেরা করির নির্বাহী পরিচালক খুশী কবিরের সঞ্চালনায় সংলাপে অন্যদের মধ্যে বিজিএমইএ-র সাবেক সভাপতি রুবানা হক, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের এফসিডিও-র ‍উন্নয়ন পরিচালক জুডিথ হারবর্স্টন।

মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং আইসিসিসিএডি-র ‍উপ-পরিচালক অধ্যাপক মিজান আর খান।