জাপানি মায়ের সন্তানদের জিম্মা: চূড়ান্ত শুনানি ২৮ অক্টোবর

জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি ইমরান শরীফের দুই শিশু সন্তান কার অভিভাবকত্বে, কার জিম্মায় থাকবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত শুনানি হবে আগামী ২৮ অক্টোবর।

এ নিয়ে আইনি যুক্তি উপস্থাপন বাকি থাকলে তা লিখিত আকারে এ সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের জমা দিতে বলা হয়েছে।

আর আদালতের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, আপাতত মা নাকানো শিশুদের সঙ্গে সারক্ষণ থাকবেন। বাবা ইমরান শরীফ থাকবেন কেবল দিনের বেলা।

আইনজীবীদের মধ্যস্ততায় দুই শিশু সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মা নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বিষয়টি মুলতবি রাখা হয়েছিল।

নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী বিষয়টি বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে।

তার আগে হলফনামা করে সম্পূরক কিছু কাগজপত্র জমা দেন নাকানো এরিকোর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

আর শিশুদের সাথে থাকা নিয়ে আদালতের সর্বশেষ আদেশ পরিমার্জন চেয়ে আবেদেন করে শরীফ ইমরানের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ করিম পরবর্তী শুনানির জন্য সময় চান। 

প্রবেশন কর্মকর্তা এদিন শিশুদের আদালতে নিয়ে এলে বিচারকরা চেম্বারে নিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন। 

ইমরান শরীফ

পরে দুপুরে শুনানি শুরু হলে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম. ইনায়েতুর রহিম আইনজীবীদের বলেন, “আপনারা বিষয়টা লম্বা করছেন।”

ইমরান শরীফের আইনজীবী ফাওজিয়া তখন বলেন, “আমরা চাচ্ছি বাবা-মা সার্বক্ষণিক বাচ্চাদের সাথে থাকুক।”

একথা শুনে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, “বাবা-মা এক সাথে থাকার অনুমতি আমরা দিতে পারি, হয় ব্যাংককে যান বা তৃতীয় কোনো দেশে যান। আপনারা মাঝে মাঝে বলেন না, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড? উনিতো (নাকানো এরিকো) এখানে বাংলাদেশে একা। উনার তো নাই কেউ। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয় না। আপনারা যদি অস্ট্রেলিয়া যেতে চান, ব্যাংকক যেতে চাইলে একসঙ্গে পাঠিয়ে দিই।”

আইনজীবী ফাওজিয়া করিম তখন বলেন, “প্যারিসে পাঠান। থাকার জন্য ভালো দেশ।”

এসময় নাকানো এরিকোর আইনজীবী শিশির মনির বলেন, “আমি একটা অসুবিধার কথা আদালতকে বলেছিলাম। এই টেকনিকটা (শুনানির জন্য ইমরান শরীফের আইনজীবীর সময় চাওয়া) ইউজ করা ঠিক হচ্ছে না। আমি (নাকানো এরিকো) কোনো আবেদন করিনি। সম্পূরক কয়েকটি কাগজ দিয়েছি। এর জন্য সময় নিতে হয়! আমার (নাকানো এরিকো) চাকরি চলে গেছে। এরপরেও আমি কর্তৃপক্ষকে ইমেইল করেছি। তারা আমার সেটি গ্রহণ করে কিনা নিশ্চিত না।”

দুই আইনজীবী এ সময় নিজেদের মধ্যে তর্কে জড়ালে বিচারক তাদের থামিয়ে বলেন, “আমরা এটা আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি রাখলাম। এই সময়ের মধ্যে আপনাদের সম্পূরক কিছু থাকলে দিতে পারেন, যদি কোনো লিখিত সাবমিশন থাকে সেটিও দিতে পারেন।

“আপনারা বলেছিলেন নিজেরা বসে কথা বলার চেষ্টা করবেন। করেছেন কিনা জানি না। যদি সে চেষ্টা থাকেন, করেন। সর্বশেষ আদেশ আমরা পরিবর্তন করছি না। আশা করি আগামী বৃহস্পতিবার বিষয়টি শেষ করবেন। এটা আমরা আর লম্বা করতে চাই না।”

ইমরান শরীফের পক্ষে আইনজীবী ফিদা এম কামালও এ সময় শুনানিতে ছিলেন।

দুই শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো রিট আবেদন করলে গত ১৮ অগাস্ট এক আদেশে হাই কোর্ট দুই শিশুকে হাজির করতে বলে।

শিশুদের বাবা ইমরান শরীফ ও তার বোন আমিনা জেবিনকে (শিশুদের ফুপু) ওই নির্দেশ দেওয়া হয়। ইমরান শরীফ যাতে দুই মেয়েকে নিয়ে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য তাদের দেশত্যগে নিষেধাজ্ঞাও দেয় আদালত।

সন্তানদের জিম্মা: জাপানি নাকানোর অপেক্ষা বাড়ল ৩ সপ্তাহ  

সন্তানদের জন্য জাপানি মা ও বাংলাদেশি বাবাকে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানে’ আসার সুযোগ

এর মধ্যে গত ২২ অগাস্ট দুই শিশুকে ইমরান শরীফের বারিধারার বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারপর থেকে তারা মহানগর পুলিশের সাপোর্ট সেন্টারে ছিল।

সেখান থেকেই গত ৩১ অগাস্ট দুই শিশুকে আদালতে নিয়ে যায় পুলিশ।

উন্নত পারিবারিক পরিবেশে শিশুদের রাখতে তাদের মা এরিকো ও বাবা ইমরানের আবেদনের পর সব পক্ষের সাথে আলোচনা করে ওইদিন আদেশ দেয় আদালত।

সে আদেশে ইমরান শরীফের ঠিক করা গুলশানের একটি ফ্ল্যটে দুই শিশুকে নিয়ে আপাতত ১৫ দিন একসাথে থাকতে বলা হয় তাদের।

জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো, ফাইল ছবি

ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে বলা হয়েছিল, বিষয়টি দেখভাল করতে। আর ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) বলা হয়েছিল, শিশু ও মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

কিন্তু সাত দিনের মাথায় গত ৩০ আগস্ট সে অদেশ পরিমার্জন (মোডিফিকেশন) চেয়ে আদালতে আবেদন করে নাকানো এরিকোর আইনজীবী।

৩১ আগস্ট সে আবেদনের শুনানির পর হাই কোর্ট সন্তানদের সথে মা-বাবার থাকা এবং তাদের সময় কাটানোর বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে দেয়।

আদালত বলে দেয়, মা-বাবা চাইলে বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যেতে পরবেন। কেনাকাটা করতে পারবেন, বাইরে খেতে পারবেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলাটি আদালতে উঠলে দুই পক্ষই সম্পূরক আবেদন করে। মা নাকানো এরিকোর আবেদনে একটি আরজি ছিল শিশুদের সাথে মা-বাবার থাকা বা সময় কাটানোর সময়, দিনক্ষণ আলাদা করে দেওয়া। তাতে আপত্তি তুলেছিলেন শিশুদের বাবার আইনজীবী রোকনউদ্দিন মাহমুদ। আদালত তাতে কর্ণপাত না করে অদেশ দেয়।

আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১১ জুলাই নাকানো এরিকো (৪৬) ও ইমরান শরীফ (৫৮) বিয়ে করেন। দুজনের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দুজনের কেউই নিজ ধর্ম ত্যাগ করেননি।

এর মধ্যে দাম্পত্য কলহ-বিবাদের জেরে গত ১৮ জানুয়ারি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন এরিকো।

টোকিওতে এক যুগের দাম্পত্য জীবনে তারা তিন মেয়ের বাবা-মা হন। তাদের বয়স যথাক্রমে ১১, ১০ ও ৭ বছর। তিন মেয়ে টোকিওর একটি স্কুলে পড়ে।

গত ২১ জানুয়ারি ইমরান টোকিওর ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তার এক মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন নাকচ করে।

পরে স্কুলবাসে করে বাড়ি ফেরার পথে বাস স্টপেজ থেকে ইমরান বড় দুই মেয়েকে অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান বলে এরিকোর ভাষ্য।

২৫ জানুয়ারি ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছে সন্তানদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করলে এরিকো তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এদিকে গত ২৮ জানুয়ারি সন্তানদের জিম্মায় চেয়ে টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন এরিকো।

টোকিওর আদালত গত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি পারিবারিক সাক্ষাতের আদেশ দেয়। তবে ওই আদেশ না মেনে ইমরান শরীফ শুধু একবার মায়ের সঙ্গে বড় দুই মেয়ের সাক্ষাতের সুযোগ দেন বলে এরিকো হাই কোর্টে করা আবেদনে বলেছেন।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইমরান মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি।

এদিকে গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত এরিকোর অনুকূলে বড় দুই মেয়ের জিম্মা হস্তান্তরের আদেশ দেয়।

বাংলাদেশের হাই কোর্টে করা রিট আবেদনে এরিকো বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এতদিন বাংলাদেশে আসতে পারেননি তিনি। গত ১৮ জুলাই শ্রীলঙ্কা হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন।

এরিকো জানান, ইমরান মেয়েদের সঙ্গে দেখা করাতে গত ২৭ জুলাই তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। এতে তার মনে আশঙ্কা হয়, ইমরান মেয়েদের আর কখনও তার সঙ্গে ‘দেখা করতে দেবেন না’। এ কারণেই তিনি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন।