আইভীর হ্যাটট্রিক

প্রথমবার নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতা, দ্বিতীয়বার ধানের শীষের প্রার্থী, তৃতীয়বার বিএনপির নেতা; সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী বদলেছে বারবার, কিন্তু ভোটের ফল বদলায়নি।

রোববার অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয়বার মেয়র হতে চলেছেন আইভী।

বারবার কেন ভোটে জিতছেন- এই প্রশ্নে আইভীর উত্তর এসেছে, “জনগণকে আস্থায় আনার জন্যে কখনও মিথ্যা বলিনি, অযথা আশ্বাস দিইনি। সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছি, প্রতিবারই রিটার্ন করেছে।”

মেয়র পদে টানা তৃতীয়বার জয়ের আভাস নিয়ে রোববার রাতে আইভী যখন শহরের দেওভোগে নিজের বাড়িতে সাংবাদিকদের সামনে আসেন, তখন চারপাশ ঘিরে ছিল ‘আইভী আপা, আইভী আপা’ রব।

বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল আইভীকে; বলছিলেনও, “সময় তো আছে, আজ আর কথা না বলি।” কিন্তু তারপরও নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন এই জনপ্রতিনিধি।

ম্যাজেন্টা পাড়ের সিল্কের একটি শাড়ি পরে এসেছিলেন আইভী, সকালে তাকে ভোট দেওয়ার সময় দেখা গিয়েছিল লাল-সবুজ সুতির শাড়িতে।

আগের দুটি নির্বাচনেও দেখা গেছে একই চিত্র; সকালে আরামদায়ক সুতি শাড়িতে ভোট কেন্দ্রে, আর জয়ের পর উৎসবের রঙমাখা সিল্কের শাড়িতে, আর হাতের আঙুলে গর্বিত বিজয় প্রদর্শন।

তিন নির্বাচনের একেকটিতে একেক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল, কীভাবে উৎরালেন-প্রশ্নে আইভী বলেন, “সব নির্বাচনই চ্যালেঞ্জিং; একেকটার একেক রকম ধরন ছিল। সবগুলো অতিক্রম করে জয়টা নিয়ে আসাটাই সাফল্য।

“তবে যত কিছু এখানে হয়েছে, সবকিছুর মূলেই কিন্তু আমাদের এ জনশক্তি, জনস্রোত, জনসমর্থন। জনসমর্থন যদি না থাকত, তাহলে আমি নারায়ণগঞ্জে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না।”

রোববার বেলা পৌনে ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের দেওভোগের শিশুবাগ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা আলী আহমেদ চুনকার মেয়ে আইভী চিকিৎসা শাস্ত্রের ডিগ্রি নিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলেন বিদেশে, দুই যুগ আগে দেশে ফিরে হঠাৎই রাজনীতিতে নামেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে যখন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুর্দিন চলছিল, তখন দলের হাল ধরেছিলেন আইভী। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে দাঁড়িয়ে জিতে যান তিনি।

এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে শুরু হয় আইভীর টক্কর। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে চুনকার সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব ওসমানদের ছিল, তার জের চলতে থাকে আইভী-শামীম ওসমানের মধ্য দিয়ে।

পৌরসভা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হলে ২০১১ সালে প্রথম ভোটে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মেয়র প্রার্থী হন শামীম ওসমান।

তখন দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের আশীর্বাদ ছিল শামীমের দিকে, কিন্তু সেই লড়াইয়ে উৎরে যান আইভী। এক লাখ ১ হাজার ৩৪৩ ভোটে হার মানতে হয় শামীমকে। সেবার বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার প্রার্থী হলেও শেষ মুহূর্তে দলীয় সিদ্ধান্তে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

এরপর ২০১৬ সালে যখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আসে, ততদিনে আইন সংশোধন হওয়ায় দলীয় প্রতীকে মেয়র নির্বাচনের বিধান হয়ে গেছে।

সেবার আইভীই হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী; তার সঙ্গে দ্বৈরথে বিএনপি বেছে নেয় রাজনীতি নবিস অথচ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত সাখাওয়াত হোসেনকে।

সাত খুনের মামলা চালিয়ে আলোচিত আইনজীবী সাখাওয়াত ধানের শীষের প্রার্থী হয়েও নৌকা প্রতীকের আইভীর কাছে হারেন ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোটে।

ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফল তখনও আসেনি, তবে কী হচ্ছে, তার আঁচ পেয়েই রোববার সন্ধ্যার পর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়ির সামনে উল্লাস শুরু হয় তার সমর্থকদের। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন আগের দুই বার বিজয়ী আইভী। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

এবারের নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আইভীকেই প্রার্থী করে। অন্যদিকে বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রবীণ নেতা তৈমুর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে নামেন।

এজন্য বিএনপি দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ থেকে তৈমুরকে অব্যাহতি দিলেও দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তার হাতি প্রতীকের পক্ষেই নামেন।

অন্যদিকে এই নির্বাচনে আবার আলোচনায় আসেন শামীম ওসমান, যিনি এখন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। তার সমর্থকরা আইভীর জন্য ভোট চাইবেন কি না, তা নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে ভোটে নামার ঘোষণা দেন তিনি।

তবে তার ওই ঘোষণা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘনের ঘটনা বলে সিইসির কাছে থেকে মন্তব্য আসার পর তার নামা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইভীও। দলীয় নেতা হলেও শামীমকে বরাবর আইভী তো এড়িয়ে চলছেনই, সেই সঙ্গে তার সমালোচনাও থামাচ্ছেন না।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে রোববার বিকালে ব্যাটারিচালিত রিকশায় চড়ে নগরীর আদর্শ স্কুল কেন্দ্রে যান স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমান।

এর মধ্যে শামীম ভোট দেবেন কি না, সেটা নিয়েও ওঠে প্রশ্ন; তবে শেষ বিকালে ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি আইভীর নাম না নিয়ে বলেন, “আমি সারাজীবন প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছি। আমি আশা করব এই নির্বাচনে আমি যাকে ভোট দিয়েছি, সেই নৌকা মার্কা যেন জয়লাভ করে।”

আর ভোটে জয় যখন স্পষ্ট, তখন শামীমের অভিনন্দন পেয়েছেন কি না- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে অনেকটা শীতল উত্তর আসে আইভীর কাছ থেকে, “হয়ত করবে।”

জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর, বিদায়ী ইসির শেষ এই নির্বাচন জাতীয় অঙ্গনেও ছিল আলোচনার বিষয়। সংঘাতময় ইউপি নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জে গোলযোগহীন ভোটে অনেকটাই হাঁপ ছেড়েছে ইসি।

এই নির্বাচন দেখে এসে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তাই বলেছেন, “এটি ছিল আমার অনেক প্রত্যাশার স্থান। কারণ, আমি ইতোপূর্বে বলেছি যার শেষ ভালো, তার সব ভালো।

“বিগত ৫ বছরে যতগুলো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়েছে, আমার বিবেচনায় আমাদের প্রথম কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সর্বোত্তম।”

তবে ধারাবাহিকভাবে ভোটের হার কমেছে নারায়ণগঞ্জে। ২০১১ সালে প্রথম নির্বাচনে ভোটের হার যেখানে ছিল ৬৯ শতাংশ, ২০১৬ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে তা ৬২ শতাংশে নেমে আসে।

মহামারীর মধ্যে এবার তৃতীয় নির্বাচনে ভোটের হার দাঁড়ায় ৫৬ শতাংশ। আর এবার পুরো ভোট ইভিএমে হওয়ায় তাতে শ্লথগতির কথা বলেছিলেন প্রধান দুই প্রার্থীই।

রোববার সকালে নারায়ণগঞ্জ নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাসদাইরে ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ভোট শেষে তৈমুর ইভিএমে নিয়ে অভিযোগ তুলে বলেন, “মেশিনটা স্লো। ভেতরে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে; নাহলে এত ডিফারেন্স হতে পারে না।”

প্রশাসন তার বিপক্ষে কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জবাবে আইভী বলেন, “এত মিডিয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিংটা কোথায় হল? আমি অভিযোগ করছিলাম, ভোট স্লো হচ্ছিল। যদি স্লো না হত তাহলে এক লাখ ভোটের ডিফারেন্স হত।”

তবে টানা জয়ী হলেও নির্বাচনে ভোটের হারের সঙ্গে আইভীর ভোটও কমছে। সেই সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধানও কমছে।

প্রথম নির্বাচনে আইভীর সঙ্গে শামীমের ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৩ ভোট, দ্বিতীয় নির্বাচনে সেই ব্যবধান ৭৯ হাজার ৫৬৭তে নামিয়ে এনেছিলেন সাখাওয়াত।

এবার আইভীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ৬৬ হাজারে নামিয়ে এনেছেন তৈমুর।

নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে আইভী আওয়ামী লীগের বাইরে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে পাশে পেয়েছিলেন।

টানা ১০ বছরে মেয়রের দায়িত্ব পালনের পর শুরুতে তার পাশে থাকা কাউকে কাউকে এখন আগের মতো সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। তবে আইভী বিশ্বাস করেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ তার পাশেই আছে।

তৃতীয়বার মেয়র হিসেবে শপথ নিতে যাওয়া আইভী বললেন, “আগামী পাঁচ বছর আমি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে চাই। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাদের উৎসর্গ করতে চাই। সব ধরনের বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আমি জনগণের জন্য কাজ করতে চাই।”