লঞ্চে আগুন: ৪ কর্মকর্তার ‘অবহেলা’ পেয়েছে নাগরিক কমিটি

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনের ঘটনায় এটির মালিক, মাস্টার, ইঞ্জিন চালক ছাড়াও সরকারি চার কর্মকর্তার ‘দায়িত্বে অবহেলার’ প্রমাণ পেয়েছে নাগরিক তদন্ত কমিটি।

শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড এবং হতাহতের ঘটনায় এ তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

নাগরিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘটনার জন্য দায়ী সরকারি চার কর্মকর্তার মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা দুজন।

তারা হলেন- নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক (নৌনিট্রা) ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন ও সদরঘাটের পরিবহন পরিদর্শক দীনেশ দাস।

এছাড়া নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং ঢাকার সদরঘাট কার্যালয়ের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মো. মাহবুবুর রশীদকে প্রতিবেদনে দায়ী করা হয়েছে।

এতে ‘বেআইনি কার্যকলাপের’ জন্য লঞ্চের চার মালিক হামজালাল শেখ, মো. শামীম আহম্মেদ, রাসেল আহম্মেদ ও ফেরদৌস হাসান রাব্বানীকে দায়ী করা হয়। এদের মধ্যে ফেরদৌস ছাড়া তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে বরগুনায় যাওয়ার পথে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় অভিযান-১০। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি সম্পর্কে নাগরিক তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য জড়িতদের চিহ্নিত করা নয়।

“বরং সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি যেন তাদেরকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনে এবং এই ধরনের অত্যন্ত বেদনাদায়ক দুর্ঘটনায় লুপহোলগুলো দেখিয়ে দেওয়া যেন সেগুলো সমাধান করে।”

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় লঞ্চের মালিক, মাস্টার ও ইঞ্জিন চালককে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি গত বছর ২৬ অগাস্টের পর প্রায় তিন মাস চলেনি। পরে ১৯ ডিসেম্ববর প্রথম যাত্রা করে এবং ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে আগুন লেগে যায়।

কিন্তু সার্ভের মেয়াদ ও রুট পারমিট থাকার পরও নৌযানটির চলাচল কেন বন্ধ ছিল, সে বিষয়ে নৌনিট্রা বিভাগ ও নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা খোঁজ নেননি এবং শিপ সার্ভেয়ারকে জানাননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

“এছাড়া সদরঘাট টার্মিনালে অফিস হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিপ সার্ভেয়ারও বিষয়টি জানার চেষ্টা করেননি। এ ক্ষেত্রে তারা সকলেই দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন।”

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের নিবন্ধন সনদে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে প্রতিটি এক হাজার ১০০ ব্রিটিশ অশ্বশক্তি ক্ষমতার (বিএইচপি) দুটি চীনের ডিজেল ইঞ্জিন থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

কিন্তু দুর্ঘটনার পর নাগরিক তদন্ত কমিটির সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, লঞ্চটির দুটো ইঞ্জিন জাপানের ওসাকার ডাইহাটসু ডিজেল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের তৈরি; যেগুলোর প্রতিটি তিন হাজার ৩৬ বিএইচপি ক্ষমতার।

লঞ্চমালিকরা সার্ভে সনদের শর্ত লঙ্ঘন করে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই দুটো পুরানা ইঞ্জিন সংযোজন করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এছাড়া যেকোনো নৌযানে এক হাজার ১২০ কিলোওয়াট বা ১৫০১.৯২ বিএইচপি’র ওপরে ইঞ্জিন পরিচালনার জন্য ইনল্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ার (আইএমই) নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে এমন সনদধারী কোনো ইঞ্জিন ড্রাইভার ছিলেন না। এমনকি পরিবর্তিত ইঞ্জিন দুটি ওই লঞ্চের জন্য উপযুক্ত কি না, তাও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করানো হয়নি।

এছাড়া দুর্ঘটনার দিন কর্মরত লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. রিয়াজ শিকদার, দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার খলিলুর রহমান, ইঞ্জিন চালক মাসুম বিল্লাহ, আবুল কালাম আজাদসহ সকল গ্রিজার দায়ী বলে প্রতিবেদন বলা হয়।

এদের মধ্যে লঞ্চের মাস্টার রিয়াজ ও খলিলুর এবং ইঞ্জিন চালক মাসুম ও আবুল কালাম আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন।

সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে নাগরিক কমিটি জানায়, এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি চাঁদপুর ঘাট অতিক্রম করার পর ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয় এবং অস্বাভাবিক শব্দ হয় বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

ইঞ্জিনের ক্রটি সারাতে ব্যর্থ হওয়ায় লঞ্চটি আর না চালিয়ে নিরাপদ কোনো ঘাটে আগেই ভিড়ানো উচিত ছিল। অনেক যাত্রী লঞ্চ ভিড়ানোর অনুরোধও করেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

কিন্ত লঞ্চের মাস্টার ও ইঞ্জিন ড্রাইভার এ বিষয়ে ‘কর্ণপাত না করে’ ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে লঞ্চটি চালিয়ে যেতে থাকেন। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে নাগরিক তদন্ত কমিটি।

তাদের ভাষ্যমতে, “সেদিন লঞ্চটির ইঞ্জিনের শব্দ অন্য দিনের মতো ছিল না। ইঞ্জিন কক্ষ ও আশপাশের এলাকা প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে আগুন ধরে যায়।”

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এমভি-১০ লঞ্চ ট্র্যাজেডির জন্য শুধু মালিক, মাস্টার ও চালক নয়, দায়ী সকলকেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই যাবে এবং দুর্ঘটনাও কমবে না।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপুরণে আইন প্রণয়ন, টাকার পরিমাণ নির্ধারণ, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী (নৌযান মালিক, মাস্টার, চালক, সরকারি কর্মকর্তা) ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপুরণের টাকা আদায় করা, প্রত্যেক যাত্রীবাহী নৌযানে আনসার-নিরাপত্তা রক্ষী থাকা বাধ্যতামূলক করা, লঞ্চে ইঞ্জিনকক্ষ, প্রবেশপথ, মাস্টারব্রিজসহ সবখানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, প্রতিটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা নৌ মন্ত্রণালয় ও নৌ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ ২৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন

অভিযান-১০: লঞ্চের মালিক, মাস্টার ও চালকের দায় পেয়েছে তদন্ত কমিটি  

সুগন্ধায় লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা