সিইসি হুদার অতৃপ্তি কেবল সহিংসতায়

বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে বিএনপি বরাবর ‘সরকারের তাবেদার’ আখ্যা দিয়ে দিয়ে আসছে, জাতীয় পার্টির ভাষায় ‘অন্যের ধরিয়ে দেওয়া ফল’ ঘোষণা করে আসছে এই ইসি; তবে বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা সেসব কিছু গায়ে মাখছেন না।

তার দাবি, সমালোচনা-বিতর্ক যতই হোক, নিজেদের মেয়াদে কোনো ধরনের ‘চাপ ছাড়াই’ তারা আইনানুগভাবে সব নির্বাচন করেছেন।

নূরুল হুদার ভাষায় নির্বাচন কমিশনের মত ‘জটিল’ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কারো ‘বাহবা পাওয়ার সুযোগ নেই’।

নিজেদের কাজে সন্তুষ্টি থাকলেও একটি বিষয়ে অতৃপ্তি থেকে যাচ্ছে মাঠ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা নূরুল হুদার। আর সেটা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ে।

অবশ্য তার দৃষ্টিতে, দল, প্রার্থী ও সমর্থকদের সহনশীলতার অভাবই নির্বাচনে সহিংসতার কারণ, যা ইসির একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

২০১৭ সালে দায়িত্ব নেওয়া নূরুল হুদার কমিশনের পাঁচ সদস্যের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। তার আগে বৃহস্পতিবার তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) সাংবাদিকদের।

নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে এ অনুষ্ঠানে প্রশ্ন এসেছে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়েও, যেখানে আগের রাতেই ভোট দেওয়া হয়ে গিয়েছিল বলে বিএনপির অভিযোগ। 

এ বিষয়ে সিইসির ভাষ্য, ওই ধরনের অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত কিছু করা যায় না। তিনি নিজে ওরকম কিছু দেখেননি, কেউ আদালতেও যায়নি।

‘প্রভাবিত হইনি’

২০১৭-২০২২ মেয়াদের মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের প্রায় সব নির্বাচনই করেছে নূরুল হুদার কমিশন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব নির্বাচন নিয়ে কোনো ‘চাপে পড়েননি’ বলে দাবি করেন সিইসি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলের চাপ কোনো দিনও ছিল না; কখনো ছিল না। কোথাও কখনো কোনো চাপ ছিল না। কোনো রাজনৈতিক দলের লোকের প্রভাবে প্রভাবিত হইনি। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছি। সুতরাং চাপ ছিল না।”

সব নির্বাচনকে সমান গুরুত্ব দিলেও একটি অতৃপ্তির কথা বলেছেন বিদায়ী সিইসি।

“বারবার বলেছি-পরিবেশ পরিস্থিতি ভালো রাখার ক্ষেত্রে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের সহনশীল আচরণই প্রথম। নির্বাচনের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইসির নেই, যখন পযন্ত না প্রার্থী, জনগণ, দল, সমর্থক সহনশীল আচরণ করে। এটা কি সম্ভব? কখনো সম্ভব না; এখানেই অতৃপ্তি।”

তার ভাষায়, স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনে রাতে সংঘাত হয়েছে, আগে সংঘাত হয়েছে, নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে হয়েছে, ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে- এটা ফৌজদারী বিষয়, মানুষের সহনশীলতার বিষয়। মানুষের মনোভাব ঠিক হলে পরিবেশ পরিস্থিতি ঠিক হবে। সহিংসতা নতুন কিছু নয়, আর তা এবারেই শেষ হয়ে যাবে- তেমনও নয়।

“যারাই আসবে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, যদি যারা ভোটে অংশ নেন তারা সহনশীল আচরণ না করেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রেজাল্ট মেনে নিতে হয়।”

সিইসি হুদার মতে, দিনভর ভালো পরিবেশে ভোটের পর ফলাফল ঘোষণা শেষে যখন সহিংসতা দেখা দেয়, কথা দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; ‘বোধ সৃষ্টি’ না হলে তা সম্ভব নয়।

‘রাতের ভোট দিতে আমি দেখিনি’

এক প্রশ্নের জবাবে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ভোটের সময় নানা অভিযোগ থাকলেও ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর ইসির আর কিছু করার থাকে না।

“ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার মত অবস্থা হলে গণমাধ্যম, রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে তথ্য উপাত্ত পাই। কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পাই। যেখানে খবর পেয়েছি, বন্ধ করে দিয়েছি।… অভিযোগ আসে, তদন্ত করিয়ে নিই।… ফলাফল যখন জমা দেয় রিটার্নিং অফিসার, গেজেট হওয়ার পরে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে যেতে পারে। তখন ইসির হাতে কিছুই থাকে না।”

কেবল অভিযোগের উপর ভিত্তি করে ‘কনক্লুসিভ’ কিছু করা যায় না বলে মন্তব্য করেন সিইসি।

“একজনও আদালতে গিয়ে সংক্ষুব্ধ হওয়ার কথা জানায়নি। প্রতিকার চাননি। তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। … আদালতে যাননি, (তার মানে) অভিযোগ নেই। এটাই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।”

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে আদৌ ভোট হয়েছিল?

এ প্রশ্নে সিইসি বলেন, “এটা অভিযোগ আকারে থেকে গেছে। এ অভিযোগের তদন্ত আদালতের ইন্সট্রাকশন ছাড়া হয় না।…

“আমি দেখিনি, আপনিও দেখেননি। আপনারা দেখেছেন? রাতে হয়েছে- এটা (শুধু) অভিযোগ। এখন যদি তদন্ত হত আদালতের নির্দেশে, যদি বেরিয়ে আসত, নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত আদালতের নির্দেশে। হয়ত সারাদেশের নির্বাচনও বন্ধ করে দিতে পারত, নতুন করে নির্বাচন করতে পারত যদি সেরকম হত। রাজনৈতিক দল কেন সে সুযোগ নেয়নি, তারাই বলতে পারবে।”

তারপরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দল ইসির কাছে অভিযোগ নিয়ে এলে আলোচনা করে আইনানুগভাবে যতটুকু দরকার, কমিশন তা করেছে বলে মন্তব্য করেন নূরুল হুদা।

ভোট ‘অংশগ্রহণমূলক’

ভোট নিয়ে যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য এসেছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না সিইসি নূরুল হুদা।

তবে প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে গড়ে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে দাবি করে তিনি বলেছেন, “নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে সারাদেশে, মানুষ অংশ নিচ্ছে। ইসির প্রতি আস্থার উদাহরণ এটা।

“৮১-৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছে কোথাও কোথাও। এরপরও যদি বলে যে জাতি নির্বাচনবিমুখ, এটা ঠিক নয়।”

তার ভাষায়, কেউ নিজেকে ‘পুরোপুরি সফল’ দাবি করতে পারে না। করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে তিনিও অনেক কিছু পারেননি।

“মোস্ট কমপ্লেক্স ইন্সটিটিউশন এটা। এখানে আহামরি কিছু করে, সব ক্রেডিট নিয়ে একজন বাহবা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সত্য কথা এটা। বাস্তব হল, আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা কারো কাছে অবনত হইনি, শুধু আইনের কথায় আইনানুগভাবে কাজ করেছি।”

‘বন্দুক উঁচিয়ে নির্বাচন সাইজ করা যায় না’

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা নিয়ে এক প্রশ্নে কে এম নূরুল হুদা বলেন, জরুরি অবস্থা বা সামরিক সরকারের অধীনে করা নির্বাচনের সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির পার্থক্য আছে।

“শামসুল হুদা কমিশনের (জরুরি অবস্থার সময়) নির্বাচন ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে- এটা ঠিক, এটা তো অবশ্যই। সে সময় যে পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল জরুরি অবস্থার মধ্যে, ক্যান্টনমেন্টের আশির্বাদ নিয়ে এসব নির্বাচন করা হয়েছে। তবে এ অবস্থা চিরদিন গণতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে সম্প্রসারিত করে না।”

সিইসি বলেন, “গণতান্ত্রিক পরিবেশে উন্মুক্ত পরিবেশ থাকতে হয়। এখানে বন্দুকের নল বা লাঠি উঁচিয়ে নির্বাচনকে সাইজ করা যায় না। এটা ছেড়ে দিতে হয় উন্মুক্তভাবে; সেখানে ভুলভ্রান্তি হবে, সংঘাত হবে, বিতর্ক হবে, মিছিল হবে, মিটিং হবে- এখন যেমন হয়; ওয়েবিনার, জুম মিটিং হবে- এই হল পরিবেশে।

“এ পরিবেশের মধ্যে ভোট হয়। সুতরাং সেই নির্বাচনের মত বন্দুকের মাথায় রেখে নির্বাচনের অবস্থা একটা হতে পারে। সেটা চিরদিন থাকতে পারে না। নির্বাচনের জন্য দরজা খুলে দিতে হয়। এখন দরজা খুলে গেছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচন হয় এখন, এ নির্বাচন করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সম্ভব। এর মধ্যেই আমাদের যেতে হবে।”

রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচায় নিয়ে বিতর্ক আর আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে কাজ করে যেতে হয় বলে নিজের উপলব্ধির কথা বলেন সিইসি।

“এটা কঠিন, কিন্তু এটাই একমাত্র পথ। জরুরি অবস্থার মধ্যে নির্বাচনে মানুষের মাথায় লাঠি রেখে মাঠে ‍নিয়ে যাওয়া; তখন তো মানুষের মুখ ছিল না, কথা বলতে পারিনি। বাক স্বাধীনতা ছিল না। সে অবস্থায় নির্বাচন করা, সেটাকে সাসটেইন করা, চালিয়ে যাওয়া… ঠিক নয়।”

গত পাঁচ বছরে আলোচনা-বিতর্ক যা হয়েছে, তাকে স্বাগতই জানাচ্ছেন সিইসি হুদা।

তিনি বলেন, “পাঁচ বছর কাজ করা হয়েছে। সুশীল সমাজ গণতান্ত্রিক পরিবেশে সমালোচনা করবে না কেন? প্রচুর সমালোচনা হবে এবং সেটা হতেই হবে।

“তা না হলে এ প্রতিষ্ঠান থাকে না। সমালোচনা না চাইলে তো মার্শাল ল দিতে হয়, যে সমালোচনা করা যাবে না; অথবা ইমার্জেন্সি দিতে হয়। সমালোচনা থাকবে, সমালোচনা দেখব। আইনসিদ্ধভাবে যতটুকু দরকার করেছি। কারো কোনো প্রেসার ছিল না, অযৌক্তিক, অনভিপ্রেত সুযোগ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেনি, তেমন কিছু বলেওনি।”

মাহবুব তালুকদারকে ফোঁড়ন

বর্তমান ইসির মেয়াদের পুরোটা সময় অনেক বিষয়েই কমিশনের বাকি সদস্যদের সঙ্গে একমত হতে পারেননি নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। কমিশনের বিরুদ্ধেই একের পর এক বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় থেকেছেন তিনি।

সে প্রসঙ্গ ধরে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেন, “উনার একটা ব্যক্তিগত এজেন্ডা থাকে, উনি এসব বলেন। বলে যাচ্ছেন।

“কখনও আইসিউতে ছিলেন; অসুস্থতার কারণে সিসিইউতেও ছিলেন। সিঙ্গাপুর, ভারতে ট্রিটমেন্ট করিয়েছেন। ৩০-৪০ লাখ টাকায় ট্রিটমেন্ট করেন, এটা ইসি বহন করে। সুতরাং আইসিইউ, সিসিইউ- এসব ওখান থেকে এনে যোগ করেছেন কিনা জানি না।

“কোনো অনুষ্ঠান হলে, নির্বাচন হলে ছয়-সাতদিন ধরে বেছে বেছে বের করেন কোন শব্দটা কোথায় লাগাবেন। যেটা মিলিয়ে কাভারেজ হয়।”

এবারের ইউপি নির্বাচনে অনেক ইউনিয়নেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সিইসি হুদা প্রশ্ন করেন- বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন নিয়ে ইসির কী করার রয়েছে? এটা প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের বিষয়।

“আমরা ডেকে ডেকে এনে বলতে পারি না- আপনি নির্বাচন করেন, নির্বাচন করবেন। এটা কি আমরা করি? নির্বাচন ব্যবস্থায় সরকারের কোনো এলিমেন্ট নেই এখানে। যা আছে তা যথাযথ।”

ইভিএম ‘চালিয়ে যেতে হবে’

বিদায় বেলায় এসে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনকে ইভিএম পদ্ধতি এগিয়ে নেওয়ার অগ্রিম আহ্বান জানিয়ে রাখছেন সিইসি নূরুল হুদা।

তার ভাষায়, “আসলেই এটা উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন বিষয়। সঠিক লোকটা সঠিক ভোট দিতে পারে- এটা একটা পদ্ধতি। কারিগরি ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, মানুষ আমরা মেশিন চালাই, শত শত লোক নিয়োগ করি, দক্ষ লোকবল লাগে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে দক্ষ লোক এসে ট্রেনিং দেয়।”

তবে সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট করা আগামী কমিশনের পক্ষেও সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না নূরুল হুদা।

“অনেক জটিল বিষয়, অনেক লোক প্রশিক্ষণের দরকার হয়। অর্ধেকের বেশি পারবে বলে আমরা মনে হয় না। সে পরিমাণ আমরা রেখে যেতে পারব। আরও দুবছর রয়েছে (জাতীয় নির্বাচনের আগে)।… নতুন একটা প্রযুক্তি এলে দেখতে হবে। অনুরোধ করি, এ জিনিসটাকে আপনারা অ্যাবানডনড করবেন না। আমরা চলে যাচ্ছি।”