চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ: দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার, তদন্তও চান শিক্ষামন্ত্রী

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণে ‘দুর্নীতির’ নানা অভিযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের হেয়ার রোডের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে আসেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এ বিষয়ে তদন্ত চেয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে ঢাকায় সরকারি বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি সেখানে তার নিজের ও পরিবারের কারও জমি নেই দাবি করেন।

তিনি এ কার্যক্রমে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি তদন্তের দাবিও জানান।

২০২০ সালে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের পর জেলা শহর থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে সদর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামে ৬০ একরের বেশি জায়গায় এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে প্রশাসন।

এ জন্য জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২১ সালের ৬ এপ্রিল। এ ভূমি অধিগ্রহণ নিয়েই জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে শিক্ষামন্ত্রীর পরিবার ও ঘনিষ্টজনদের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ ওঠে।

এতে প্রস্তাবিত জমির দাম কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে কয়েকশ’ কোটি টাকা বাড়তি আদায়ে ‘কারসাজির’ অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে।

এমন খবর প্রকাশের পর দীপু মনি এ বিষয়ে কথা বলতে সাংবাদিকদের সামনে আসেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সব ধরনের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি এ খবরকে ‘সামনে নির্বাচনের’ আগে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দাবি করেন।

তবে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াও আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দীপু মনি বলেন, “উন্নয়ন কার্যক্রম থামবে না। হয়ত অবকাঠামো নির্মাণ কেউ ষড়যন্ত্র করে থামিয়ে দিতে পারে।”

তিনি বলেন, যে জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা সেখানে তার চিকিৎসক বড় ভাই হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রম করার জন্য জমি কিনেছিলেন।

“বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি তা হস্তান্তর করে দেন। অন্য কারও জমি থাকতে পারে, সেগুলো তাদের ব্যক্তিগত বৈষয়িক ব্যাপার। আমার জানা নেই, এখন নাম দেখছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত এলাকায় নিজেদের কোনো জমি নেই দাবি করে তিনি বলেন, “আমার ও আমার পরিবারের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কোথাও কোনো সুযোগ নেই। আমার ও আমার পরিবারকে জড়িয়ে করা প্রতিবেদন ভিত্তিহীন, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

“সামনে নির্বাচন, সময়টাকেও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আমি বলব উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কেউ কাজটি করছেন।”

এটি ষড়যন্ত্র হতে পারে দাবি করে দীপু মনি বলেন, “এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি। উনারা বলতে পারেন দুর্নীতির অভিপ্রায় ছিল। যে জমির দাম বেশি দেখানো হচ্ছে।

“কিন্তু আমি বা আমার পরিবারের কেউ এখানে জড়িত না। কোনোভাবেই না। আমাদের কোনো জমি সেখানে নেই। আমার তো ছিলই না কখনও। আমার ভাই হস্তান্তরিত করেছেন আগেই। ফলে আমাদের কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থ নেই এখানে।”

তিনি বলেন, “আমাদের দিক থেকে দুর্নীতির বিষয় আসছে না। অন্য কেউ করছে কিনা, যেকোন পর্যায়ে দুর্নীতি হয়েছে কি না- সরকারের বা রাষ্ট্রের বহু রকমের মেকানিজম আছে। দুর্নীতি হয়েছে কি না খতিয়ে দেখতে পারেন।

“আমি চাইব, দাবি করব সেভাবে যেন এটা তদন্ত হয়। যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য আসছে সে বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “জেলা প্রশাসক সরকারেরই একটা অংশ। আমি সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে সরকারের একটি অংশ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছাড়া কোনো মত প্রকাশ করা আমার জন্য সমীচীন না।

“আমি মনে করি, এখানে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন, সেটা তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রকাশিত হওয়া উচিত। এবং সেই তদন্তে যদি দেখা যায়, সেখানে কারও দুর্নীতি বা অন্যায় আছে, তার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।”

জমির দাম বাড়িয়ে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আসছে, তাদের বিষয়েও কথা বলেন তিনি।

“জাহিদুল ইসলাম আমার মামাতো ভাই না। তার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক, সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ সন্দেহ নেই। যারা চাঁদপুরে রাজনীতি করে সবাই তাই।

“আর সেলিম খান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ২০টি ইউনিয়নের সভাপতির মতো সেও আমার ঘনিষ্ঠ।”

গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন আসছে, তাতে জমির দাম ২০ গুণ বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ এসেছে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “অধিগ্রহণের জন্য জমির মূল্য কে নির্ধারণ করে? জেলা প্রশাসক অফিসের মাধ্যমে হয়। শুনেছি প্রথম প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছিল ৫৫৩ কোটি টাকার, ৬২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও নেয়। পরে তিন মাসের অধিককাল কিছু করা হয়নি।

“আগের প্রাক্কলনের সদস্যরা হয়তো বদলি হয়ে যায়। পরে ১৩ জনের কমিটি হয়। পরের প্রাক্কলনে সেটি হয় ১৯৩ কোটি টাকা। ধরে নেই- আগে উচ্চমূল্যে করা হয়েছিল, দুটোই এসেছে প্রশাসনের মাধ্যমে। কিন্তু ২০ গুণ কি করে ৫৫৩ কোটি টাকা হয়, কোন গণিতে হয়, আমার জানা নেই।”

শিক্ষামন্ত্রী জানান, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানকে ভাঙনপ্রবণ এলাকা দাবি করে এটি টিকবে না বলে অভিযোগ করছেন।

এর জবাবে তিনি বলেন, “ভাঙনের কারণে চাঁদপুর শহর অনেক ছোট, অনেক ঘনবসতি। সে কারণে শহরে এটি হবার সুযোগ নেই। বাইরে দুটো জায়গা দেখা হয়েছিল হাইওয়ের পাশে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে একটু সমস্যা হলে হাইওয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

“আমরা চেয়েছি পাশের এলাকাগুলো থেকেও যাতে শিক্ষার্থীরা আসতে পারে। জমি নির্ধারণে প্রশাসনের সঙ্গে কথাবার্তা সবসময় হয়েছে। পাশে স্থায়ী বাঁধ আছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। বেড়ি বাঁধ আছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় মত দিয়েছে যে, স্থাপনা করা যাবে। এরপরও জায়গাটি অনুপুযুক্ত কেন তা আমার বোধগম্য নয়।”

চাঁদপুরে অন্য প্রকল্প করতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অভিযোগ করে দীপু মনি বলেন, “যখনই বড় প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছি, তখনই একটা মহল ভেঙে যাবে, অনুপুযুক্ত জায়গা এমন ক্যাম্পেইন শুরু করে। স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিরা এখন প্রশ্ন তুলছেন এটিরও একই পরিণতি হচ্ছে কিনা।”

নিজের দলের মধ্য থেকে বাধা আসছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতা সব দলেই থাকে। আমার দলেও নিশ্চয়ই আছে। জেলার সভাপতি সরাসরি মিডিয়াতে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে বলেছেন। প্রতিযোগিতা প্রতিহিংসায় রুপান্তরিত হওয়াটা ভাল না।”

দলের একজন সংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পর তা নিয়ে দলীয় ফোরামে কথা বলেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আসলে খুবই বিব্রতকর। দলের জেলার যে সভাপতি তিনি একটি গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। আমরা সেই গণমাধ্যমের চরিত্র সম্পর্কেও অবগত। জেলারই অন্য একটি আসনের সংসদ সদস্য একটি আর্টিকেল লিখেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে।

“আমি দলীয় শিষ্টাচার সম্পর্কে যা বুঝি, আমার কোনো অভিযোগ থাকলে সেটার নির্দিষ্ট ফোরাম আছে। সেই ফোরামে না বলে তারা গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন। তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি আপনাদের সামনে যা বলার বলেছি। ওনারা ফোরামে নিয়ে গেলেও ওখানে আমি যা বলতাম, এখানে আমি তা বলছি।

“তবে আমার দিক থেকে দলের শৃঙ্খলার বাইরে যেতে পারি না। দলীয় জেলা সভাপতি বা সংসদ সদস্য আছেন, তাদের সম্পর্কে দলীয় যে ফোরাম আছে, দলের সাধারণ সম্পাদক আছেন, তাদের কাছে কাগজপত্র পাঠিয়েছি। আমার দলীয় ফোরামের বাইরে তাদের সম্পর্কে আমি মন্তব্য করতে চাই না।”

আইনগত ব্যবস্থা নেবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি সেটাও ভাবছি। কারণ, যদি এর পেছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র থাকে, সেটা উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন।