ঘটনাস্থলে কাটা আঙুল, চাপাতি

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎ রায়কে যেখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে পাওয়া গেছে দুটি চাপাতি।

চাপাতির আঘাতে বিচ্ছিন্ন রাফিদা আহমেদ বন্যার কাটা আঙুলটিও ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল বলে শাহবাগ থানার এসআই সোহেল রানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির ৫০ গজ উত্তরে যেখানে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যার ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়, সেখানে একটি ব্যাগও পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, “ব্যাগের ভেতরে কয়েকটি পেপার (সংবাদপত্র) ভাঁজ করা ছিল। মনে হচ্ছে, এতে চাপাতিগুলো মোড়ানো ছিল।”

ল্যাপটপের ওই ব্যাগে একটি জিন্স প্যান্ট ও কয়েকটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেটও পাওয়া গেছে। ব্যাগটি হামলাকারীদের বলে ধারণা পুলিশের।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে লেখক দম্পতির পর হামলার পর ওই স্থানটি ঘিরে ফেলে পুলিশ। বন্যার কাটা আঙুলটি পরীক্ষার জন্য সিআইডি সংগ্রহ করেছে বলে এসআই সোহেল রানা জানান।

মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎকে লেখালেখি ঘিরে হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা। এর মধ্যেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। এবারের একুশের বইমেলায় তার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে।   

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানঘেঁষে ফুটপাতে অভিজিৎ ও বন্যার ওপর হামলা হয়।

অভিজিৎ ও বন্যা বইমেলা থেকে বেরিয়েছিলেন। দুর্বৃত্তরা ফুটপাতে তাদের ওপর হামলা চালায়।

ছেলের ওপর হামলার খবর শুনে হাসপাতালে অজয় রায়

হামলার স্থানটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ

প্রত্যক্ষদর্শী এক চা দোকানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোপানোর পর চাপাতি দুটি ফেলে দুই হামলাকারীর একজন টিএসসি মোড়ের শহীদ মিলন চত্বরের দিকে এবং অন্যজন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে পালিয়ে যায়।”

কোপানোর সময় এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে হামলাকারীরা তার দিকে তেড়ে গেলে তিনি দমে যান বলে এই চা দোকানি জানান।

চাপাতির কোপে মাথায় গুরুতর জখম হন অভিজিৎ, আঙুল হারান বন্যা। দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর অভিজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।   

অভিজিৎ রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যা (ফেইসবুক থেকে নেওয়া ছবি)

এক দশক আগে বইমেলা চলাকালে সড়কের একই দিকে বাংলা একাডেমির পাশে আনবিক শক্তি কমিশনের উল্টোপাশের ফুটপাতে লেখক হুমায়ুন আজাদকে কোপানো হয়েছিল।

হুমায়ুন আজাদও জঙ্গিবাদীদের হুমকি পাচ্ছিলেন। তার হামলার স্থানেও এবারের মতো চাপাতি পাওয়া গিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিতের ওপর হামলার খবর পেয়ে হাসপাতালে উপস্থিত অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “যারা অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, তারাই একইভাবে আবার হামলা চালিয়েছে।”

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, “প্রগতিশীল লেখকদের ধারাবাহিকভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা হুমকি দিয়ে আসছে, এই হত্যাকাণ্ড তারই ধারাবাহিকতা।”

ড. অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাসের দর্শন, ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’, ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’, ‘ভালবাসা কারে কয়’, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা : বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

অভিজিৎ রায়ের বই বাংলা বই বিক্রির ওয়েবসাইট ‘রকমারি ডটকম’ থেকে সরাতে হুমকি দিয়েছিলেন হত্যাকাণ্ডে উসকানিদানের অভিযোগে গ্রেপ্তার ফারাবী শফিউর রহমান।

শাহবাগ আন্দোলনের মধ্যে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের পর ফেইসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দেওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ফারাবীকে। পরে জামিনে ছাড়া পান ফারাবী।