খুন-পালানোর সব কৌশল শিখেই নামেন জিকরুল্লাহ-আরিফুল

চাপাতি কিভাবে লুকিয়ে রাখতে হবে, খুন কিভাবে করতে হবে, আর তারপর কিভাবে পালাতে হবে- এই সব কৌশল শিখেই ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যামিশনে খুনিরা নেমেছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

সোমবার হত্যাকাণ্ডস্থল থেকে ধরা পড়া দুই মাদ্রাসাছাত্র জিকরুল্লাহ ও আরিফুলকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম।

গোয়েন্দারা মনে করছেন, জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ‘স্লিপার সেলের’ পরিকল্পনায়ই ঢাকার তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে বাড়ির সামনে দিনের বেলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুরকে।

ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ফেইসবুকে লেখালেখি করতেন ওয়াশিকুর, একই ধরনের লেখালেখিতে সক্রিয় আহমেদ রাজীব হায়দারকেও খুন করা হয়েছিল একই কায়দায়। ওই হত্যামামলায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর বিচার চলছে।

ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং রিমান্ডে থাকা জিকরুল্লাহ ও আরিফুলের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য নিয়ে বুধবার নিজের কার্যালয়ে মনিরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

ওই দুই মাদ্রাসাছাত্র পুলিশকে জানিয়েছেন, ১৫ দিন আগে তারা ওয়াশিকুরকে হত্যা করতে নির্দেশ পেয়েছিলেন।

মনিরুল বলেন, “যাত্রাবাড়ীর এক বাসায় মাসুম নামের এক ব্যক্তি তাদের চাপাতি দিয়ে কাউকে কিভাবে কৌশলে কুপিয়ে আহত করে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে তার প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তারা আলাদাভাবে নিজের কাছে চাপাতি রেখে ঢাকায় ৫/৬দিন চলাফেরাও করেছিল।”

জিকরুল্লাহ ও আরিফুল এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনজন এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন। আবু তাহের নামে অন্যজন পালিয়ে যেতে পেরেছেন।

গ্রেপ্তার দুজন যে মাসুমের কথা বলছেন, তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করছেন বলে গোয়েন্দা পুলিশের সন্দেহ। 

মনিরুল বলেন, “ছদ্মনাম ব্যবহার করেই তারা যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে বাসা ভাড়া নিয়েছিল। সেখানে তারা ইন্টারনেটে নিজেদের মতাদর্শের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। নিজেদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, কিভাবে কাউকে হত্যা করতে হবে, কেন হত্যা করতে হবে তার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটনোর চেষ্টা করত।”

এই স্থানে খুন হন ওয়াশিকুর

‘মাসুম’ পরিচালিত ‘স্লিপিং সেল’ই ওয়াশিকুর হত্যার দায়িত্বে ছিল বলে মনে করেন মনিরুল, যে সেলে আটজন সদস্য ছিল বলেও পুলিশ তথ্য পেয়েছে।

মনিরুল বলেন, “কয়েক মাস আগে যাত্রাবাড়ী থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক এক যুবকও এই সেলের অন্যতম নেতা। সাহসী বলে তার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি ছিল। এই সেলের অন্য সদস্যরা এখন কী করছে, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।”

জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে বলে কয়েক বছর ধরে মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা দাবি করে এলেও গোয়েন্দাদের এখনকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একাধিক ‘স্লিপার সেল’ এখন সক্রিয়।

“একেকটি সেলের কাজ একেক রকম। ওপর থেকে আসা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে সেলগুলো। ফলে এক সেলের সঙ্গে অন্য সেলের যোগাযোগ সেভাবে থাকে না,” বলেন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

ব্লগার রাজীব হায়দার এবং ব্লগার আসিফ মহীউদ্দিনের ওপর হামলায় এই ধরনের ‘স্লিপার সেলের’ সদস্যরাই অংশ নিয়েছিল বলে গোয়েন্দারা মনে করছেন।

২০১৩ সালের ওই দুটি ঘটনার একটিতে রাজীব মারা যান। তবে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান আসিফ।

নিহত ওয়াশিকুর রহমান বাবু

রাজীব হত্যা মামলার পলাতক আসামি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেদোয়ানুল আজাদ রানা একটি স্লিপার সেলের প্রধান ছিলেন বলেও দাবি করেন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল।

রানাকে এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। পলাতক এই ব্যক্তি ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডেও সন্দেহভাজন।

মনিরুল বলেন, জিকরুল্লাহ ও আরিফুল দুজনই হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র। জিকরুল্লাহ এখনও পড়ছেন, কয়েক বছর আগে আরিফুল সেই মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় মিরপুরের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

এই দুজনেরই নিজেদের আয়ের কোনো উৎস ছিল না জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মাদ্রাসায় তারা থাকত ও খাওয়া-দাওয়া করত।

হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী পরিচালিত হাটহাজারী মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, জিকরুল্লাহ তাদের ছাত্র নয়।

এই বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল বলেন, “ভিন্ন নামের তারা সেখানকার ছাত্র থাকতে পারে। এই বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবে গোয়েন্দারা।”

গ্রেপ্তার জিকরুল্লাহ ও আরিফুল

তিনি বলেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিনের খুতবা শুনে এই দুজন তার মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। যাত্রাবাড়ীতে তার খুতবা শুনতে যেত তারা, তবে পরস্পরকে চিনত না।

জসিম উদ্দীন কয়েক বছর আগে ‘কথিত জিহাদে’ অংশ নিতে নাফ নদী পার হয়ে মিয়ানমার যেতে চেয়েছিলেন জানিয়ে মনিরুল বলেন, তার সঙ্গে তখন ২০/২৫ জন অনুসারী ছিল, যাদের মধ্যে আরিফুল একজন। সাহসিকতার জন্য জসিম উদ্দিন তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছিল।

আরিফুল ২০১২ সালে নরসিংদীতে জেএমবি সদস্যদের একটি জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে পুলিশের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে।  

মনিরুল বলেন, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও হয়েছিল। পরে সে ওই মামলায় জামিনে বের হয়েছিল।

“মূলত সে প্রচণ্ড উগ্রপন্থি। তাই জেএমবিতে থাকা অবস্থায় সে যখন দেখল, এখানে তার মতের সঙ্গে বা সে যেভাবে কাজ করতে চাইছে, তা জেএমবির অন্যরা সমর্থন দিচ্ছে না, তখন সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে জড়িয়ে পড়ে।”

জিকরুল্লাহ ও আরিফুল আর কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কি না কিংবা কোনো হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানেন কি না অথবা তাদের সঙ্গে আর কারা রয়েছেন, তা জানতে চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।