আবদুল মোনেম: শূন্য থেকে সফল এক নির্মাণ ব্যবসায়ীর জীবনালেখ্য

কৈশোরোত্তীর্ণ এক তরুণ যখন এসএসসি পাসের সনদ নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তখন তার এই শহরে টিকে থাকায়ই ছিল সংগ্রামের, লেখাপড়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যবসা শুরু করা সেই ছেলেটিই হয়ে উঠেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী।

৮৬ বছর বয়সে রোববার যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোনেম, তখন তার ব্যবসার সাম্রাজ্য বিশাল। নিজের নামে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানের ছাতার নিচে রয়েছে ডজনের বেশি কোম্পানি।

আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মোনেম বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ। মোনেমকে ‘আপাদমস্তক একজন সফল ব্যবসায়ী’ অভিহিত করে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “তিনি কোনো রাজনীতি বা রাজনৈতিক দর্শনের সমর্থক ছিলেন না। সব সময় একটা কথা বলতেন, কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থান করা যায়।”

প্রকৌশলী আব্দুল মোনেমের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে এসএসসি পাস করে মোনেম যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার হাতে ছিল গুটিকয়েক টাকা যা দিয়ে চলাই ছিল দায়।

অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করা মোনেম পরে ১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড গড়ে তোলেন।

তিনি এই কোম্পানিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের সামনের কাতারে নিয়ে আসেন। তার নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস লিমিটেড হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম শীর্ষ কন্সট্রাকশনস ফার্ম।

৬০ বছরের বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মার্কেট লিডার’ হিসেবে বিবেচিত এএমএল কন্সট্রাকশসের দেশের সবচেয়ে বড় ও চ্যালেঞ্জিং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রয়েছে। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভারসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজে যুক্ত এএমএল কন্সট্রাকশনস মেট্রো রেল প্রকল্প এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও বিভিন্ন কাজে জড়িত। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণেও ভূমিকা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের।

শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও আবদুল মোনেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি শুধু বয়সের কারণে মুরুব্বি ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মুরুব্বি ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের অবিভাবক। একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে একজন সুমানুষ ছিলেন।”

ফজলে ফাহিম বলেন, “২০০২ সালে পড়াশোনা শেষ করে আমি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরি। উনার সঙ্গে আমার দেখা হয় ২০০৩ সালে। আমাদের পরিবারের সঙ্গেও উনার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল।”

আবদুল মোনেম তার মনে ভিন্নভাবে স্থান করে নিয়েছিলেন জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি হাইওয়ে রাস্তা করেছিলেন তিনি। নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস করেছিল ওই রাস্তাটি। রাস্তাটি খুবই সুন্দর হয়েছিল। সবাই বলত, মোনেম সাহেব রাস্তাটি করেছেন, সে কারণেই এতো ভালো-সুন্দর। ওই সময় থেকেই তিনি আমার মণিকোঠায় ভিন্নভাবে স্থান করে নিয়ে আছেন।

“বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। অনেক কষ্ট করে, ধাপে-ধাপে তিনি তার প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন।”

আবদুল মোনেম ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছিলেন অনেক ক্ষেত্রে; খাবার, বেভারেজ, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ আরও নানা খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ১০ হাজারের বেশি মানুষ তার কোম্পানিগুলোতে নিয়োজিত রয়েছে। 

মোনেম গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইগলু আইসক্রিম, ম্যাংগো পাল্প প্রোসেসিং, ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালসন, ইগলু ডেইরি প্রোডাক্টস, সুগার রিফাইনারি, এম এনার্জি লিমিটেড, নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, এএম আসফল্ট এ্যান্ড রেডিমিক্স লিমিটেড, এএম অটো ব্রিকস, এএম ব্র্যান অয়েল কোম্পানি, সিকিউরিটিজ ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং এএম বেভারেজ।

এ গ্রুপের মালিকানাধীন আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াতে দেশের দ্বিতীয় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলেন তিনি।

এএম বেভারেজ ইউনিটের অধীনে কোকাকোলা ব্রান্ডের কোকাকোলা, ফান্টা ও স্প্রাইট বোতলজাত করে আসছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড।

দুই ছেলে এএসএম মাইনুদ্দিন মোনেম ও এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোনেমের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজের দায়িত্ব নিলেও বৃদ্ধ বয়সেও তিনি নিরলস কাজ করে গেছেন।

তার কর্মস্পৃহা স্মরণ করে মোনেমের একজন ঘনিষ্ঠজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একদিন তার সাথে গুলশানের বাসায় গল্প করতে গিয়ে আমি দেখেছি, উনি একদিকে আমার সঙ্গে কথা বলছেন অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন চেক বইতে স্বাক্ষর করছেন। একটা-দুইটা চেক নয়, দুইশ-তিনশ চেক। আমি রসিকতার সুরে বললাম, মোনেম ভাই এবার ক্ষ্যান্ত দেন। এসব দায়িত্ব দুই ছেলেকে দিয়ে দেন ভাগ করে।

“হাসতে হাসতে উনি বলেছিলেন, ওরা কি বুঝবে কীভাবে আমি এসব প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে গড়ে তুলেছি, ইটের পর ইট বসিয়েছি, রড গেঁড়েছি। বুঝবে না। দেখা যাবে একটা চেক স্বাক্ষর করবে, আরেকটা রেখে দেবে কালকের জন্য।

“সেজন্যই তো এই বয়সেও কাজটাকে এগিয়ে নিতে পারছি।”

আবদুল মোনেমকে নিয়ে এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “কাজের পোকা ছিল উনার মাথার মধ্যে। কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। ৮৬ বছর বয়সেও তিনি লাগামহীনভাবে কাজ করে গেছেন। মারা যাওয়ার চার দিন আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন।”

মোনেমকে একজন বিনয়ী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “উনার একটি বিষয় আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগত, অবাক হই, স্যালুট দেই…! আর সেটি হচ্ছে, এই যে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ব্যবসা করলেন, একটার পর একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন। কত মানুষের সাথে মিশলেন, কিন্তু একটি বারের জন্য টের পাইনি উনি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা শুভাকাঙ্ক্ষী। কেউই টের পায়নি তার রাজনৈতিক পরিচয়।

“বাংলাদেশের বর্তমান পেক্ষাপটে এটাই হচ্ছে একজন প্রকৃত ব্যবসায়ীর প্রকৃত গুণ। এখন তো আমরা হরহামেশাই দেখি, ব্যবসায় একটু উঠতে না উঠতেই কোনো না কোনো দলের হয়ে এমপি হয়ে যাচ্ছে, মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছে। আবদুল মোনেম সাহেবের মধ্যে সেটি ছিল না।”

ক্রীড়ামোদী

পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়েও খেলাধুলায় দারুণ আগ্রহী ছিলেন আবদুল মোনেম। বাংলাদেশে ফুটবলের জোয়ারের সময় ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি।

মোহামেডানের সাবেক একজন ফুটবলার, যিনি এখন সফল তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী, তিনি স্মৃতির পাতা থেকে তুলে ধরেছেন সেই দিনগুলোতে মোনেমের ভূমিকার কথা। 

“আশির দশকে যখনই মোহামেডান ও আবহনী ক্লাবের ফুটবল খেলা হত ঢাকা স্টেডিয়ামে. তখন খেলার দিন মোনেম ভাইকে না দেখলে আমরা (খেলোয়াড়রা) মনে জোর পেতাম না। খেলার দিন সকালে ঠিক ঠিকই তিনি খেলোয়াড়দের সাথে নাস্তা করতে আসতেন।

“আমাদের বলতেন, সাহস হারানো যাবে না। টিম জিতুক আর না জিতুক খেলায়াড়দের পুরস্কৃত করতেন তিনি, যে খেলোয়াড়রা গোল দিতেন তাদের জন্য আলাদা পুরস্কার দিতেন।

১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম পর্যন্ত ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মোনেম। তার সময়ে ফুটবল লিগে ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি।

আবদুল মোনেমের স্ত্রী, তিন মেয়ে, দুই ছেলে এবং বহু আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রয়েছে। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ব্যবসায়ী আব্দুল মোনেমের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক