মোবাইল ইন্টারনেট: ১২ ঘণ্টার ছন্দপতন, সেবাবঞ্চিত অনেকেই

মোবাইল ইন্টারনেটে অভ্যস্তদের জন্য শুক্রবার ছুটির দিনটা কেটেছে অস্বস্তিতে; ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে দিনের শুরু হয়েছে একটি প্রশ্ন দিয়ে- হলটা কী!

ফোন হাতে নিয়ে আয়েশ করে ফেইসবুক দেখা যেমন হয়নি, তেমনি কেনাকাটা, মোবাইলে আর্থিক সেবাভিত্তিক লেনদেন, অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের মত জরুরি কিছু সেবা না পাওয়ায় দিনের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে অনেককে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে দেশে থ্রিজি ও ফোরজির উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। সেই সেবা ফিরতে শুরু করে বিকাল ৫টার পর।

যারা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, এই সময়ে তাদের তেমন সমস্যা না হলেও সেই সেবার আওতায় যারা নেই, কিংবা ফোন হাতে যারা বাড়ির বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের সবারই ভুগতে হয়েছে।

হোয়াটস্যাপ, মেসেঞ্জারের মত অ্যাপ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বা বৈঠকগুলো করতে পারেননি অনেকে।

আবার ই-কমার্স ও এফ-কমার্সভিত্তিক কেনাকাটায় বড় ধরনের প্রভাবের কথা বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সাপ্তাহিক ছুটির দুপুরে একটু আয়েশ করে বাইরের খাবার খাবেন বলে যারা ফুডপান্ডার মতো অ্যাপভিত্তিক সেবা নেওয়ার কথা ভাবছিলেন, তাদের অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন রসনাবিলাস থেকে।     

তথ্যপ্রযুক্তি ও আইআইজি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে যেসব সেবা মোবাইল সিমের ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলে সেগুলো থ্রিজি ও ফোরজি বন্ধ থাকার সময় কাজ করেনি।

“যেমন যাননবাহন ট্র্যাক করার জন্য যেসব সেবা আছে, সেগুলোতে কাজ হয়নি। যেসব পস মেশিনে সিম ঢোকানো আছে, সেগুলো কাজ করেনি না। তবে যেগুলোর টেলিফোন লাইনের সঙ্গে বা ব্রডব্যান্ডের সঙ্গে লাগানো আছে, সেগুলো কাজ করছে।”

১২ ঘণ্টা পর দেশে থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা ফিরে এলে মোবাইল ফোনে খুলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমসহ বিভিন্ন সাইট ও অ্যাপ।

সোশাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে কুমিল্লাসহ কয়েকটি জেলায় দুর্গা পূজার মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা-ভাংচুরের পর বুধবার থেকেই ছয় জেলায় উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

শুক্রবার বিজয়া দশমীর দিন সকাল থেকে সারা দেশেই তা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয় বলে টেলিকম অপারেটদের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য।

তবে এত দীর্ঘসময় উচ্চগতির মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার বিষয়ে সরকার বা বিটিআরসির তরফ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

সকালে ফোন হাতে নেওয়ার পর গ্রাহকদের অনেকে বুঝতে পারছিলেন না সমস্যাটা কোথায়। পরে তারা বুঝতে পারেন, থ্রিজি ফোরজি না চললেও টু জি চলছে। তবে ওই গতির ইন্টারনেটে অনেক সেবাই কাজ করে না।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সর্বশেষ হিসাবে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ১২ কোটির বেশি; এর মধ্য ১১ কোটি ৫৪ লাখ গ্রাহকই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।

ব্রডব্যান্ড ও ওয়াইফাই ব্যবহারকারীর সংখ্যা সেই তুলনায় অনেক কম। ফলে দেশে যখনই উচ্চগতির ইন্টারনেট বন্ধ থাকে, তখন মোবাইল গ্রাহকরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

শুক্রবার ছুটির দিনে বাইরে যাবেন বলে যারা অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, তারা বেকায়দায় পড়েন সবচেয়ে বেশি। সকাল থেকেই উবার ও পাঠাওসহ অন্যান্য রাইড শেয়ারিং সেবা কার্যত কাজ করেনি।

তবে জরুরিভাবে যাদের যেতেই হবে, তারা বিকল্প উপায়ে গেছেন। যেমন মগবাজার এলাকার কিশো তার মাকে নিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে গেছেন অটোরিকশায়, যদিও বেশি ঝাঁকুনি তার মায়ের শরীরের জন্য ভালো না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে কিশো বলেন, “প্রতি শুক্রবার সকালে মাকে নিয়ে উবার ডেকে ডায়ালাইসিস করাতে হাসপাতালে যাই। আজ অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও না পেয়ে ভ্যাপস গরমের মধ্যে অসুস্থ মাকে নিয়ে সিএনজিতেই যেতে আসতে হয়েছে।”

আবার কোভিড সংক্রমণ কমে আসায় বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা সোমা দীর্ঘদিন পর বাচ্চাদের নিয়ে উবারে করে বেড়াতে যাবেন বলে আগের দিন পরিকল্পনা করেছিলেন। গাড়ি না পাওয়ায় তিনি সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, ছেলেমেয়েদের মন খারাপ করা খবরটা দিতে তারও খারাপ লেগেছে।

মোবাইল সিমনির্ভর পস মেশিনগুলো শুক্রবার কাজ করেনি থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট বন্ধ রাখার কারণে

মোবাইল অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবাদাতা পাঠাওয়ের  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুসেইন এম ইলিয়াস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে আজ (শুক্রবার) অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবাগুলো কাজ করতে পারেনি, সব বন্ধ ছিল। সিমভিত্তিক এসব সেবা উচ্চগতির মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কাজ করেনি।”

আর্থিক লেনদেনের মত জরুরি কাজও বাধাগ্রস্ত হয়েছে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায়।

শুক্রবার দুপুরে সুপারশপ মিনাবাজারের মগবাজার শাখায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহক বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো আর্থিক লেনদেনের অ্যাপ ব্যবহার করে করতে পারছেন না।

পাশাপাশি কয়েকজন গ্রাহক তাদের ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে গিয়েও আটকে গেছেন। বিশেষ করে যাদের কাছে নগদ টাকার ঘাটতি ছিল, তারা একেবারে বেকায়দায় পড়ে যান।

কেনাকাটা করার পর অর্থ পরিশোধের সময় কার্ড কাজ না করায় তাদের বোকা বনে যেতে হয়েছে।

কিছু ব্যাংকের কার্ড কাজ করলেও কয়েকটি ব্যাংকের কার্ড ‘পস’ মেশিনে (পয়েন্ট অব সেলস-পস, টাকা পরিশোধ করার যন্ত্র) কাজ করেনি বলে জানালেন ওই সময় ক্যাশ কাউন্টারের কর্মী আজাহার।

রামপুরায় বনশ্রী আবাসিকের সি ব্লকের একটি দোকানে ইউসিবি কার্ড দিয়ে ‘পস’ মেশিনে দু’ দফায় টাকা দেওয়া না গেলেও পরে লেনদেন সফল হয় বলে জানান সুমাইয়া নামে এক গ্রাহক।

ব্যাংকগুলো দিনের প্রথমভাগে কার্ড সেবা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মেসেজ পাঠায় গ্রাহকদের। তবে দু’একটি ছাড়া বেশির ভাগ ব্যাংকের কার্ড দিয়েই ‘পস’ মেশিনে টাকা পরিশোধ করা গেছে বলে জানা গেছে। তবে যেসব যন্ত্র সিম নির্ভর ইন্টারনেটে চলে, সেগুলো কাজ করেনি।

উচ্চগতির ইন্টারনেট ফিরল ১২ ঘণ্টা পর  

সারা দেশে উচ্চগতির থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ  

এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলায় অবশ্য সমস্যা দেখা যায়নি। মগবাজার এলাকায় সহজেই দুটি ব্যাংকের বুথ থেকে এটিএমে টাকা তুলতে দেখা গেছে কার্ড হোল্ডারদের।

  মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্রডব্যান্ডের আওতায় থাকলে ব্যাংকের সব ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এটিএম থেকে টাকাও তোলা যাচ্ছে। ব্যাংকের সব ধরনের লেনদেনে করা যাচ্ছে।

“কিন্তু আপনি যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে লেনদেন করতে চান, সেটা করা যায়নি। মোবাইল সিমের মাধ্যমে চলে এরকম কিছু পস মেশিন কাজ করেনি।”  

মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বনশ্রী আবাসিক এলাকার এজেন্ট কামরুল জানালেন, সকাল থেকে তারা টাকা আদানপ্রদান করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন। অ্যাপ কাজ না করায় ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে লেনদেন সারতে হয়েছে।

একইভাবে ই-কমার্স, এফ কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটাও বিঘ্নিত হয়েছে উচ্চ গতির মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকায়। কিউআর কোডভিত্তিক কুরিয়ার সেবা প্রদানও সকাল থেকে বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়েছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-ক্যাব এর মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম শোভন বলেন, “এরকমভাবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে ই-কমার্সে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বিক্রি কম হয়। পরের দিনও এর প্রভাব থাকে। আগের দিনের মত প্রায় সমপরিমাণ কেনাবাচা কমে যায়।”