ভোজ্যতেল-মুরগির দাম আরও বেড়েছে, অস্বস্তিতে বিক্রেতারাও

সরকারের নানা উদ্যোগের পরও কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই; আবার একবার বেড়ে যাওয়ার পর সেই পণ্যের দামও আর তেমন কমছে না।

বেশ কিছু দিন থেকে কাঁচাবাজারের চিত্রটা অনেকটা এরকমই। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে আসার পর ক্রেতার নাভিশ্বাস আরও দীর্ঘ হচ্ছে। তেমনি পণ্যমূল্যের অস্থিরতায় বিক্রেতারাও জানাচ্ছেন অস্বস্তির কথা।

কারওয়ান বাজারের প্রবীণ মুদি দোকানি মনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন তো নিত্যপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি অনেক নাজুক। আমরা চিনি, তেলসহ আরও কিছু পণ্য বিক্রি করতে পারছি না। কারণ সঠিক প্রক্রিয়ায় এখন পণ্য কেনা যাচ্ছে না।

“সরিষার তেলের দামও ভয়াবহ রকমের বেড়ে গেছে। সরকার ছাড়া আর কারও পক্ষে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”

এ বাজারে কেনাকাটা করতে আসা শফিকুল ইসলাম মনে করেন, এখন শুধু আলু ও কিছু সবজি ছাড়া অধিকাংশ পণ্যের দামই ক্রেতার নাগালের বাইরে। গত দুই মাস ধরে এভাবেই চলছে।

আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে তাতে কোনো ফল পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে যেন, সরকারি উদ্যোগের ফলে দাম আরও বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষ নিজের বর্তমান বেতন দিয়ে মাস চলতে পারবে না।”

শুক্রবার রাজধানীর পীরেরবাগে একটি মুদি দোকানে গিয়ে দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাম তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতিলিটার ১৩৫ টাকায়।

যদিও গত মঙ্গলবার সরকারি ও বেসরকারি যৌথ ঘোষণায় লিটারে ৭ টাকা বাড়িয়ে প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাম তেলের দাম লিটারে ২ টাকা বাড়িয়ে ১১৮ টাকা করা হয়েছিল।

পীরেরবাগ বাজারের বিক্রেতা আবুল কাশেম বলেন, “তেল চিনির দাম এতটা বেড়েছে যে, ক্রেতার কাছে দাম বলতে আমাদেরও লজ্জা লাগে। কিন্তু আমরা যেই দামে কিনি তার চেয়ে কম দামে তো আর বিক্রি করতে পারি না।“

সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে দেশি সরিষার তেলের দামও কেজিতে ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। খোলা সরিষার তেল এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৯০ টাকা থেকে ২২০ টাকার মধ্যে, যা আগে মানভেদে ১৩০ টাকা থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ছিল।

ফাইল ছবি

কিছু কিছু বোতলজাত সরিষার তেলের এক লিটারের বোতলের গায়ে খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ২৩০ টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার দাম নির্ধারণের আগেই বাজার বেশ খানিকটা ওঠানামা করছিল। তবে গতকাল (বৃহস্পতিবার) পাইকারি বাজারে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল (সয়াবিন) বিক্রি হয়েছে ১৩২ টাকা ৫০ পয়সায়। সেই হিসাবে খুচরায় তা ১৩৬ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

“এর আগে গত সপ্তাহে সরকার দাম নির্ধারণ করার আগের দিন সয়াবিন তেলের দাম ১৩৪ টাকা ১৪ পয়সায় উঠেছিল।“

দাম কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে তিনি বলনে, “সরকার সয়াবিন তেলে কিছু শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি এ মুহূর্তে পণ্যটির ওপর এখনও লিটারে প্রায় ২৫ টাকার মতো শুল্ক রয়েছে। বাজার স্বাভাবিক করার জন্য সয়াবিন তেলকে আপাতত শূন্য শুল্কের ঘরে নিয়ে আসা প্রয়োজন।“

অপরদিকে এ বাজারে খোলা চিনিও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতিকেজি তিন টাকা বেশি ৭৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের মুদি দোকান আনছার মাঝি স্টোরের একজন বিক্রয় কর্মী জানান, প্রতিকেজি ১৫৫ টাকায় খোলা সয়াবিন তেল এবং ১৪৫ টাকায় পাম তেল বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৮৫ টাকায়।

“ক্রয় মূল্য বেশি পড়ায় এখন এ দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা তো আর লোকসানে বিক্রি করতে পারি না। খোলা চিনি বিক্রি বন্ধই করে দিয়েছি। কারণ পাইকারি দোকানগুলোর কেউই এখন আর নির্ধারিত মূল্যে পণ্য দিতে পারছেন না। তারা কেনাকাটার রশিদ বা স্লিপও দিতে রাজি হচ্ছে না।”

নিত্যপণ্যের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হওয়া আরেক পণ্য হচ্ছে মুরগির মাংস। চলতি সপ্তাহে রাজধানীর অন্যতম বড় কারওয়ান বাজারে কেজিতে আরও ৫ টাকা বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম, বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকায়। লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায় এবং পাকিস্তানি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ টাকায়।

ফাইল ছবি

টিসিবির হিসাবে গত এক মাসে মুরগির দাম অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে।

দুই মাস আগেও বাজারে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১২০ টাকা, লেয়ার মুরগি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং পাকিস্তানি মুরগি ২১০ থেকে ২২০ টাকা এবং সোনালিকা মুরগি ৩০০ টাকায় বিক্রি হত।

মুরগির মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রাণিখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়াই অন্যতম বলে উল্লেখ করছেন বিক্রেতা ও খামারিরা। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সব পর্যায়েই দামে প্রভাব পড়েছে।

পোলট্রি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্লানেট অ্যাগ্রো লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন পর্যায়ে মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রাণিখাদ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়া।

তার ভাষ্য, গত এক বছরে মুরগির খাবারের মূল্য গড়ে ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিকেজি ৩৪ টাকায় বিক্রি হওয়া সয়ামিল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকায়।

দাম বেড়ে যাওয়া আরেক পণ্য দেশি পেঁয়াজ গত দুই সপ্তাহ ধরে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে স্থির আছে। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৫০ টাকায়।

বাজার স্বাভাবিক রাখতে সম্প্রতি পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে সরকার। চিনি আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

একইভাবে শুল্ক কমিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১৮ লাখ টন চাল আমদানির সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।

আর প্রাণি খাদ্যের সঙ্কট কমাতে সয়ামিল রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের পরও গত তিন মাস ধরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। গত এক মাসে চালের দাম ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। খুচরা বাজারে এখন মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়, মাঝারি চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় এবং সরু চাল ৫৮ থেকে ৬৬ টাকায় প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে।

 

মুরগির দাম বাড়ছে লাফিয়ে  

লিটারে ৭ টাকা বাড়ল সয়াবিন তেলের দাম  

পেঁয়াজের দামে ‘কারসাজি’ নিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতির ক্ষোভ  

পেঁয়াজে শুল্ক নেই, চিনিতে হ্রাস  

ডিমের দাম চোখ রাঙাচ্ছে পুষ্টিতে