সম্পদ বিক্রি করে খরচ চালাবে ইভ্যালি

গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত ই-কমার্স কোম্পানি ইভ্যালি আপাতত সাবেক এমডি মোহাম্মদ রাসেলের বিলাসবহুল গাড়িসহ অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে পরিচালন ব্যয় বহন করবে।

ইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ কথা জানান।

তিনি বলেন, “হাই কোর্টের আদেশটি পেয়ে আমরা অনেকখানি আনন্দিত হয়েছি। এটি ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা হলেও আলো দেখাচ্ছে। বলা যায়, সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি।

“যারা ইভ্যালিতে জিনিসপত্র বিক্রি করেছেন কিংবা যারা ক্রয় করেছেন তাদের পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। কিছুটা প্রয়াস হলেও রাখব। কিন্তু এটা সময়ের ব্যাপার। অডিট চলার সময় আমরা আরও ভালো চিত্র জানতে পারব।”

প্রতারণার একাধিক অভিযোগে গতবছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন গ্রেপ্তার হন। তার কয়েকমাস আগে থেকেই বেতন পাচ্ছিলেন না কোম্পানির প্রায় দুই হাজার কর্মী।

এ অবস্থায় ইভ্যালির অবসায়ন চেয়ে এক গ্রাহকের আবেদনে ২২ সেপ্টেম্বর ইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। পরে ১৮ অক্টোবর ইভ্যালির অবসায়ন এবং তার আগে ইভ্যালির ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে চার সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় হাই কোর্ট।

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে চেয়ারম্যান করে গঠিত এই পর্ষদে সদস্য হিসেবে আছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. রেজাউল আহসান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলনকে করা হয়েছে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল

ওই পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় তিন মাস পার হলেও কোম্পানির নিয়মিত খরচ বহনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না জানিয়ে বিচারপতি মানিক বলেন, “আদালতের রায়ে দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এটা ইভ্যালির পাওনাদারদের পাওনার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কিন্তু এর থেকে সুবিধা যেটা হবে, সেটা হচ্ছে ১৫ জন সিকিউরিটি গার্ড ও ১৫ জন কর্মচারী- এই ৩০ জন লোকের বেতন দেওয়া যাবে। তারা গত তিন মাস ধরে কাজ করছে।”

ইভ্যালির প্রধান কার্যালয়ে এখন যে ১৫ জন কর্মী কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অ্যাকাউন্ট্যান্ট আছেন চারজন। অডিটের জন্য কাগজপত্র তৈরি করতে তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে।

এছাড়া সাভারের তিনটি গুদামের মালামাল পাহারা দিতে রয়েছেন ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী। তাদের তিন মাস আগে নিয়োগ দেওয়া হলেও বেতন দেওয়া যায়নি।

পর্ষদ চেয়ারম্যান মানিক বলেন, আরেকটি বড় খরচ হবে অডিট করাতে, সেটার আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

রাসেল গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া ইভ্যালির প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর জুলাই পর্যন্ত তাদের দায়-দেনার পরিমাণ ছিল ৫৪৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে তার কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তার সুস্পষ্ট ধারণা এখনও পাওয়া যায়নি।

টাকা ‘সরিয়েছেন’ রাসেল-শামীমা

ইভ্যালির সম্পদের তদন্ত করতে গিয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা রাসেল ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে কোম্পানির সম্পদ মিশে যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছে বর্তমান পর্ষদ। সে কারণে দুজনের ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব বের করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সাভারে ইভ্যালির ওয়্যারহাউজ

বিচারপতি মানিক বলেন, “আমাদের কাছে যেসব কাগজ আছে, তার থেকে মনে করছি রাসেল ও তার স্ত্রী অনেক টাকা নিয়ে নিয়েছে। সে কারণে হাই কোর্টে দরখাস্ত করেছিলাম যে রাসেলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব এবং তার সমস্ত সম্পত্তির তথ্য যেন দেওয়া হয়। হাই কোর্ট সে আদেশ মঞ্জুর করেছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য ব্যাংককে হাই কোর্ট আদেশ দিয়েছে, রাসেল ও শামীমার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাই কোর্টে উপস্থাপন করতে হবে। অন্যান্য কর্তৃপক্ষকেও আদেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তথ্য দেওয়া হয়।

ইভ্যালির সার্ভার বন্ধ

ইভ্যালির অফিস, বন্ধ হওয়ার আগে

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে রাসেল দাবি করেছিলেন, ইভ্যালির সার্ভার এবং ওয়েবসাইটের ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ হাজার কোটি টাকা। সেই সার্ভার আর ওয়েবসাইট এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ইভ্যালির ফেইসবুক পেইজটিও আর আপডেট হচ্ছে না।

এ বিষয়ে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, “ইভ্যালির ওয়েবসাইটটা এখনও খোলা যাচ্ছে না। সার্ভার অ্যামাজনের হাতে। সেখানে অনেক টাকা-পয়সা বাকি পড়ে আছে। এই সার্ভার খুলতে পারলে অনেক তথ্য পাব।”

রাসেলরা চড়তেন দামি গাড়িতে

গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম টাকায় ব্যয়বহুল প্রচারাভিযানের পাশাপাশি রাসেল ও তার স্ত্রী নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনদের নামে কয়েকটি দামি গাড়ি কিনেছেন জানিয়ে ইভ্যালির বর্তমান চেয়ারম্যান জানান, আদালত এসব গাড়ি বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে।

“ইভ্যালির ২৪টি গাড়ির মধ্যে ১৪টির দখল এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ১০টি গাড়ির দখল এখনও পাইনি। সেগুলোর দখল পেতে ফৌজদারি মামলা করছি। পুলিশের সাহায্য চাইছি যেন গাড়িগুলো আমাদের কাছে হস্তান্তর করে।”

বিচারপতি মানিক জানান, তাদের কাছে থাকা ১৪টি গাড়ির মধ্যে অন্তত পাঁচটি বিলাসবহুল। ইভ্যালির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা সেগুলো ব্যবহার করতেন।

“আমরা সেগুলি ব্যবহার করব না। এগুলো বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্যান্য যেসব অর্ডিনারি গাড়ি রয়েছে, সেগুলো আমরা ভাড়ায় দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিক্রি করলে কিছু পয়সা আসবে। ভাড়ায় দিলে প্রতিনিয়ত একটি আয়ের পন্থা হবে।”

কোম্পানির ল্যাপটপ, ডেস্কটপসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রির পরিকল্পনা জানিয়ে ইভ্যালি পরিচালনা পর্ষদ প্রধান বলেন, “প্রাক্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেক ল্যাপটপ নিয়ে গেছেন। আমরা তাদেরকে সেগুলো ফেরত দিতে চিঠি দিয়েছি। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করব।

“কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ইভ্যালি থেকে অগ্রিম পয়সা নিয়েছে। সেগুলো ফেরত পেতে চিঠি লিখেছি। ফেরত না দিলে যথারীতি তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করব। এই প্রক্রিয়ায় কিছু পয়সা আসবে। এছাড়া অন্যান্য কিছু সোর্সের কথাও হয়ত আমরা জানতে পারবো এবং সেইভাবে পয়সা কালেকশান করার চেষ্টা করব।”