বিবিআইএন: বিশ্ব ব্যাংকের ঋণে চার প্রকল্পের পরিকল্পনা

২০১৫ সালে বিবিআইএন চুক্তি সইয়ের পর চার দেশের মৈত্রী মটর শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল
ভারত ও নেপালের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিবহন ও বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশের অবকাঠামো সুবিধা ও শুল্কায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নের চারটি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।

এই চার প্রকল্পে প্রায় ৭৪ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার একটি রূপরেখা তুলে ধরে গতবছরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) একটি চিঠি পাঠিয়েছে বহুজাতিক এই ঋণদাতা সংস্থা।

‘বিবিআইএন-এর আঞ্চলিক পরিবহন ও বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি কর্মসূচি (প্রথম পর্যায়)’ নামের একটি কর্মসূচির অধীনে এ চার প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইআরডির বিশ্বব্যাংক শাখার অতিরিক্ত সচিব আব্দুল বাকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ কর্মসূচিতে অর্থায়নের প্রাথমিক সম্মতির কথা আমাদের জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। কর্মসূচিতে নিজেদের যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ দিয়েও তারা সহযোগিতা করতে আগ্রহী।”

২০১৫ সালের ১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের আন্তঃসীমান্ত চলাচলের সুযোগ তৈরি করতে একটি চুক্তি সই হয়। ওই বছর ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল চুক্তিটি অনুমোদন করে, কিন্তু ভুটান পিছিয়ে যায়।

গতবছর ২৭ নভেম্বর ভুটানকে বাদ রেখেই বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট (বিবিআইএন-এমভিএ) কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল।

তার আগেই ২০২০ সালের ১৭ জুন বাংলাদেশ সরকার এই চার দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন চেয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বলে জানান বিশ্ব ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরে ইআরডিতে পাঠানো চিঠিতেঅর্থায়নের যে পরিমাণ বলা হয়েছে, তা প্রাথমিক হিসাব। প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের যে পরিমাণ দেখানো হয়েছে তা কিছুটা বাড়তে পারে।

“বাংলাদেশ সরকারের চূড়ান্ত হিসাবে যে পরিমাণ অর্থায়নের প্রয়োজন হবে, সেটাই বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হবে। চূড়ান্ত হিসাবে এর কিছুটা বাড়তে-কমতে পারে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআর চার অংশে প্রকল্পে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।

ইআরডিতে পাঠানো চিঠিতে সম্ভাব্য অর্থায়নের একটি রূপরেখাও বিশ্ব ব্যাংক দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে বিশ্ব ব্যাংকের অঙ্গ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে এই ঋণ দেওয়া হবে।

সব ঠিক থাকলে আগামী ৪ এপ্রিল মূল্যায়ন বৈঠক এবং ২ মে দরকষাকষির আলোচনা হতে পারে। তারপর ২৬ মে এই ঋণ চূড়ান্ত করতে বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে।

বিশ্ব ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে আইডিএ তহবিলের ঋণ সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদ দিয়ে ৫ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হয়।

বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের পরিবহন ও আঞ্চলিক সমন্বয় বিশেষজ্ঞ এরিক নোরার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঢাকা এসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেন। পরে প্রাথমিক সম্মতির কথা জানিয়ে ইআরডিকে চিঠি দেয় বিশ্ব ব্যাংক।

ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এ কর্মসূচির আওতায় যে চারটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, তার একটি হচ্ছে ‘স্থলবন্দর উন্নয়ন ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’, যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ডলার।

দেশের তিনটি বড় স্থলবন্দর- বেনাপোল, ভোমরা এবং বুড়িমারীর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বাড়িয়ে সীমান্ত পরিবরহন ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাইজেশনে ওই অর্থ ব্যয় করা হবে। এর মাধ্যমে মালামাল ওঠানামার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা হবে।

দ্বিতীয় প্রকল্পে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাস্টম হাউসের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব স্টেশনের উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এনবিআরের মাধ্যমে ১৭ কোটি ডলার ব্যয় করা হতে পারে। শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিশ্ব ব্যাংকের অভিজ্ঞদের মাধ্যমে কারিগরি সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে চিঠিতে।

তৃতীয় প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয়ে ন্যাশনাল ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কমিটিকে (এনটিসিএফ) শক্তিশালী করা এবং জাতীয় বাণিজ্য ও পরিবহন সুবিধার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রস্তাবিত এই অর্থায়নের অবশিষ্ট ৩০ কোটি ডলার দিয়ে সিলেট-চারখাই-শেওলা-সুতারকান্দি মহাসড়কের উন্নয়ন করা হবে। এ প্রকল্পেও বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন ও নীতি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে।

এই সড়কটি সিলেটের সুতারকান্দিতে শেওলা স্থলবন্দরের সঙ্গে প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ে ১ ও ২ এর অংশ। এটি ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন (বিসিআইএম) করিডোর, যা ভারতের কলকাতা থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিবিআইএন-এমভিএ এর আওতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে তিনটি রুটের কথা ভাবা হয়েছে, তার একটিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পেট্রোপল-বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে আখাউড়া-আগরতলা স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরা পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী মোটরযান চলতে পারবে।  

দ্বিতীয় রুট ভারতের আগরতলা থেকে যাবে চট্টগ্রামে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত। আর তৃতীয় রুটে ভারতের শিলচর থেকে বাংলাদেশের সিলেট হয়ে পাটুরিয়ায় ফেরি পেরিয়ে বেনাপোল-পেট্রোপল দিয়ে কলকাতায় মোটরযান চলাচল করতে পারবে।

নেপাল থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত যে রুট ভাবা হয়েছে, তাতে কাঠমাণ্ডু থেকে ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়া আসা করা যাবে।

এই সবগুলো রুট মিলিয়েই স্থলবন্দর, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং শুল্কায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের সম্ভাব্য অর্থায়নের এই কর্মসূচিতে।