অর্থ পাচার ঠেকাতে ‘মনোযোগ’ দিতে বললেন কৃষিমন্ত্রী

কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক
দেশে ভারী শিল্পায়ন শুরু হলে যাতে রিজার্ভে ‘ঘাটতি না হয়’ সেজন্য অর্থ পাচার ঠেকাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআরকে ‘কঠোর মনোযোগ’ দিতে বলেছেন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক।

বুধবার আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে এনবিআর আয়োজিত সম্মাননা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কর্মকর্তাদের তিনি একথা বলেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, “ওভার ইনভয়েস এবং আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে বিরাট পরিমাণ টাকা বাংলাদেশ থেকে চলে যায় বিদেশে। ব্যবসায়ীরা দুর্নীতির মাধ্যমে বা নানান মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করে দিচ্ছে।

“এখানেই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কেন মানি লন্ডারিং হয় সেটা খুঁজে বের করতে হবে।”

দেশে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে ভারী শিল্পায়ন শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা সঞ্চয়নে ‘টান পড়বে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেজন্য এখনই মুদ্রাপাচারকাণ্ডে কঠোর মনোযোগ দিতে হবে।

“আমাদের অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। এখন যদি নতুন শিল্পায়নে বিনিয়োগ হয় তাহলে অনেক ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি করতে হবে। সেটি করতে গেলে যে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশি মুদ্রা আছে সেটি কমে যাবে।”

গত তিন থেকে চার দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের উদাহরণ টেনে পেছনের কারণ হিসেবে মুদ্রা পাচার ঠেকাতে দেশটিতে কঠোর সাজার বিধানের কথা উল্লেখ করেন কৃষিমন্ত্রী।

“মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে তাদের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট ছিল। তারা বৈদেশিক মুদ্রাকে রক্ষা করে সেটাকে ভারী শিল্পায়নে বিনিয়োগ করেছে। তাহলে আমাদেরকেও সেই দিকে যেতে হবে।

“মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে এনবিআরকে বড় একটা ভূমিকা নিতে হবে। কোনো ক্রমেই আমাদের ব্যবসায়ীরা যেন বিদেশে টাকা না পাঠায়।”

দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে শুল্ক ও কর কর্মকর্তাদের অনেক বেশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “নিজেদের মাঝে প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়াতে সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে কর-জিডিপির হার বাড়াতে কর্মকর্তাদের আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান কৃষিমন্ত্রী। এসময় বাংলাদেশ কর আহরণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের পেছনে পড়ে থাকার কথাটি স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

“এই হার কখনও ১০ এর ঘর অতিক্রম করছে না। অথচ নেপাল, ভুটান, ভারত, এসব দেশে কর জিডিপির হার ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ করে আমরা কতটা এগিয়েছি সেটা এনবিআরকে খুঁজে বের করতে হবে।”

এনবিআর কর্মকর্তাদের বিষয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা দূর করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার পাশাপাশি সমাজে বৈষম্য দূর করতে কর আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে সেসচব প্রচারের পরামর্শ দেন কৃষিমন্ত্রী।

“এখন বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাব করে। কোনো এলাকায় ৫০০ কম্বল বিতরণ করতে গেলে ৫০০০ মানুষ চলে আসবে।

“আমরা জনপ্রতিনিধি হিসাবে যখন গ্রামে যাই শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে কয়েকটা টাকার জন্য। তাদের চেহারার দিকে তাকালে দেখা যায় কেমন যেন হাড্ডিসার।”

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “এখন হয়তো অনেকেই না খেয়ে থাকে না, আগের মতো অনেক বেশি কষ্ট করে না। কিন্তু জীবনযাত্রার মান এখনও অনেক নিচে। এতে অনেক বেশি বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

“তোমার জন্য আমার জীবন যাত্রার মান অনেক উপরে উঠবে আবার একটা শ্রেণি বঞ্চিত হবে, সেটি তো হতে পারে না।”

নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “কাস্টমস ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটা সত্য যে কাস্টমসের বর্তমান কর্মতৎপরতায় এটা একটু একটু করে কেটে যাচ্ছে।”

এসময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আয়কর সনদ প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম শুল্ক এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতার বিষয়টি তুলে ধরেন।     

“এক সময় রাজা-বাদশাদের খরচের কাজে শুল্কায়নের অর্থ ব্যয় করা হলেও এখন তা ব্যাপক শিল্পায়নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন নজর দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে কিভাবে স্বচ্ছতা বাড়ানো যায়।”

কর জিডিপির হার নিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে নানাভাবে করছাড় দেওয়ার কারণে এখন কর-জিডিপির হার ৯ শতাংশের উপরে উঠছে না। সব ধরনের করছাড় সুবিধা রহিত করা হলে বর্তমান কর কাঠামোতে কর-জিডিপির হার ১৬ শতাংশ হতে পারত।” 

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন অনুষ্ঠানে বলেন, “ব্যবসায়ী ও এনবিআর কর্মকর্তাদেরকে উইন-উইন পরিস্থিতিতে কাজ করে যেতে হবে।”

কর নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাতে সঠিক ধারণা থাকে সেজন্য জাতীয় রাজস্ব উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে এফবিসিসিআই কর্মশালা করতে চায় বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে নানা স্তরের কর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম- ইআরএফকেও সম্মাননা দেয় এনবিআর।