ভারত রপ্তানি বন্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেড়েছে গমের দাম

ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে এমনিতেই বাজার ছিল চড়া, এর মধ্যে ভারত গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এ খাদ্যপণ্যটির দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

বিশ্বের গম কেনাবেচার অন্যতম বড় কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর বাজারে গমের মূল্য সূচক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ বছর বিশ্ব বাজারে গমের দাম ৬০ শতাংশ বেড়েছে যার প্রভাবে রুটি, নুডলস থেকে শুরু করে গমজাত সব পণ্যের দামই বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে আমদানিনির্ভর সব দেশেই।

ছবি: রয়টার্স

এর মধ্যে ভারতের তাপপ্রবাহ বিপদ আরও বাড়িয়েছে। তীব্র গরমে ফলনে ক্ষতি হওয়ায় ভারতের বাজারে গমের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌছেছে। এ প্রেক্ষাপটে এ পণ্যটির রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দিল্লি। অবশ্য সরকারি কর্মকর্তারা একে বলছেন ‘সাময়িক নিষেধাজ্ঞা’।

ভারতের সরকার জানিয়েছে, গম রপ্তানির ওপর এরই মধ্যে যেসব ঋণপত্র ছাড় করা হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে ওই পরিমাণ গম রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া যেসব দেশের জরুরি খাদ্য প্রয়োজন, কেবল তাদের সরকারিভাবে গম রপ্তানি করা হবে। এর বাইরে সাধারণ সব রপ্তানি বন্ধ।

জি সেভেন জোটের দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও জাপানের কৃষিমন্ত্রীরা জার্মানিতে এক বৈঠকে ভারতের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

জার্মানির খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী কেম ওসডেমির বলেন, “যদি সবাই রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ দিতে শুরু করে তাহলে সংকট আরও খারাপের দিকে যাবে।”

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশ। তবে বেশিরভাগ গম নিজেদের বাজারেই বিক্রি হয়ে যেত বলে তারা বড় রপ্তানিকারক ছিল না।

ছবি: রয়টার্স

রাশিয়া ইউক্রেইনে সেনা অভিযান শুরুর পর সেদেশের গম রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া খরা, বন্যার কারণে অন্যান্য বড় গম উৎপাদনকারী দেশেও ফলন কমেছে এবার।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, ভারত হয়ত ওই ঘাটতি অনেকটা পূরণ করতে পারবে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ভারতও এ বছর রেকর্ড এক কোটি টন গম রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতি ফের বদলে দিয়েছে।

জাতিসংঘ (ইউএন) জানিয়েছে, ইউক্রেইনে যুদ্ধের প্রভাবে মার্চে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য রেকর্ড গড়েছে। এপ্রিলে তা সামান্য কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি ছিল।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সূর্যমুখী তেল উৎপাদন করত ইউক্রেইন। যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে রপ্তানি বন্ধ। এর প্রভাবে বিকল্প ভোজ্যতেলগুলোরও দাম বেড়ে গেছে। খাদ্যপণ্যের বাজার তাতে আরও চড়েছে।

ভুট্টা ও গমেরও বড় উৎপাদক ইউক্রেইন। এসব পণ্যের সরবরাহে টান পড়ায় হঠাৎই দাম ব্যাপক বেড়ে গেছে।

ছবি: রয়টার্স

খাদ্যের দামের সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেমন- ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের ঋণে সুদ হার বাড়িয়েছে যাতে ভোগব্যয়ে লাগাম টানা যায়।

এর ফলে ঋণ নিতে এখন খরচ বেশি পড়বে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনৈতি মন্দার দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কয়েকজন অর্থনীতির বিশ্লেষক।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক গ্রুপ গোল্ডম্যান স্যাকসের ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ ব্যাংকিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ চেয়ারম্যান লয়ড ব্ল্যানকফেইন বলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেওয়ার খুবই, খুবই উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।”

গোল্ডম্যান স্যাকস চলতি বছর ও পরের বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস, তা কমিয়ে দেওয়ার দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম সিবিএসে ওই মন্তব্য করেছেন ব্ল্যানকফাইন।