লকডাউনের অস্বস্তি গেলেও ভাইরাসের ভয় কাটেনি রাজাবাজারে

করোনাভাইরাসমুক্ত হওয়ার জন্য তিন সপ্তাহের কঠোর অবরুদ্ধ দশা পেরিয়ে স্বস্তি বোধ করলেও ফের এলাকায় এই ভাইরাস যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দারা।

এর কারণ হিসেবে এলাকায় আবার আগের মতো ভ্যান গাড়িতে মাছ-সবজি ও ফলমূল বিক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হওয়ার সঙ্গে লকডাউন শুরুর আগে এলাকা ছাড়া বাসিন্দাদের ফিরে আসার সম্ভাবনার কথা বলছেন তারা।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে দেশব্যাপী টানা দুই মাসের লকডাউন শেষে সব কিছু খোলার পরে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সারা দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ জোনে ভাগ করে ফের বিধি-নিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই উদ্যোগের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত ৯ জুন পূর্ব রাজাবাজারে পরীক্ষামূলক কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন শুরু হয়।

এরপর ২১ দিন শুধু চিকিৎসক-নার্স-সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া আর কেউই ওই এলাকায় ঢুকতে বা সেখান থেকে বেরোতে পারেননি। ফার্মেসি ছাড়া এলাকার সব দোকানপাট ছিল বন্ধ। এই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল অভূতপূর্ব ও কষ্টকর অভিজ্ঞতা।

লকডাউনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার রাত ১২টার পর থেকে বিধি-নিষেধ শিথিল করে ওই এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার দুটি পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।

সকাল থেকে ফের বাইরের মানুষের আনাগোনা দেখে শঙ্কিত রাজাবাজার মসজিদ গলির একটি বাড়ির মালিক কে এম জোবায়ের।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২১ দিনের লকডাউনে অনেক কষ্টকর অভিজ্ঞতা আছে, অনেক অব্যবস্থাপনা ছিল সেগুলো বলতে চাই না। সামনে দিনগুলো নিয়েই বেশি চিন্তা। যে লোকগুলো এই এলাকার বাইরে থাকে অথবা যে সব ভাড়াটিয়া বাড়ি থেকে আসবে এবং লকডাউনের কথা শুনে অন্যত্র কোথাও চলে গিয়েছিল তারা তো আজ থেকেই এলাকায় ঢুকতে শুরু করবে। এই নতুন লোকগুলো করোনাভাইরাস নিয়ে আসছে কি না সেদিকে নজর রাখাটা জরুরি।

“এছাড়া দীর্ঘদিনের লকডাউন শেষে অনেকেই স্বাস্থ্য বিধি মানছে না, তাদের বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান করবে সেটাও প্রশাসনকে দেখতে হবে। সব মিলিয়ে স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক তো আর কাটছে না। সবকিছু নির্ভর করবে লকডাউন পরবর্তী ব্যবস্থাপনা কী হয় তার উপর।”

এই এলাকার ভাড়াটিয়া কারওয়ানবাজারের সবজি ব্যবসায়ী শাজাহান মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে ২১টা দিন পার করেছি। যেখানে দিনে এক হালি ডিম লাগত সেখানে একটি ডিম, যে মাছ দিয়ে সাত দিন চলতে পারতাম তা দিয়ে ২১ দিন পার করেছি। কারণ এখানে নির্দিষ্ট দোকান ছাড়া কিছুই ছিল না। আর তারা সব কিছুতেই দ্বিগুণ দাম রেখেছে।

“তারপরেও লকডাউন শেষ হওয়াতে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখনই এই এলাকা করোনাভাইরাসমুক্ত বলা যাবে না, কারণ প্রচুর বহিরাগত ঢুকছে, বিশেষ করে ভাসমান সবজি, মুরগি, ফল বিক্রেতারা বাইরে থেকে আসছে। এমনকি যারা বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছিল তারাও আসছে। এখন সঠিক ব্যবস্থাপনা দরকার, যাতে নতুন করে কেউ আক্রান্ত না হয়।”

বুধবার সকালে আবার পূর্ব রাজাবারের বিভিন্ন গলির ভেতরের দোকানগুলো খুলেছে। দোকানের সামনে রশি টানিয়ে বিক্রি করছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। 

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন মুদি দোকানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখানে বাইরের লোক ব্যবসা করেছে। আমাদের দোকান বন্ধ ছিল। ফলে প্রায় দ্বিগুণ দাম দিয়ে মানুষকে কেনাকাটা করতে হয়েছে। আমি নিজেও যে পণ্য বিক্রি করতাম ৬০ টাকায় সেটা ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। কষ্টের মাত্রা ছিল অবর্ণনীয়। ব্যবসা নেই, দাম বেশি তারপরেও আজকে থেকে শেষ হয়েছে এখন ব্যবসা করা যাবে।”

তিনি বলেন, “লকডাউন শুরুর আগের দিনই রাজাবাজার থেকে প্রচুর মানুষ অন্য এলাকায়, অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। কারণ তারা জানতেন ১৪ থেকে ২১ দিন তারা বাইরে বের হতে পারবেন না। এখন তারা আসতে শুরু করেছে।”

এভাবে চলতে থাকলে এই লকডাউন কোনো কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন পূর্ব রাজাবারের আরও বেশ কয়েকজন বাসিন্দা।

তবে তাদের আশ্বস্ত করে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “করোনাভাইরাসের সংক্রমন শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা স্বাস্থ্যবিধিসহ সরকারের সকল নির্দেশনা পালন করে আসছি। ২১ দিনের লকডাউন শেষ হলেও রাজাবাজার এলাকায় প্রবেশের মোট ১০টি গেইটের মধ্যে মাত্র দুটি আমরা খুলে দিয়েছি, বাকি আটটি গেইটই বন্ধ আছে। ফলে রিকশা বা গাড়িতে করে বহিরাগত প্রবেশের সুযোগটা কম থাকবে।

“তাছাড়া লকডাউন খুললেও স্বাস্থ্য বিধি মানার সকল প্রকার কার্যক্রম আমরা চলমান রাখছি।”

লকডাউনের মধ্যে এই এলাকায় কতজনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই ২১ দিনে ২০৫ জনের করোনাভাইরাস পরীক্ষা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সর্বশেষ গত ২০ জুন ১৯ জনের পরীক্ষা করা হয়, তাদের কারও করোনাভাইরাস ধরা পড়েনি।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউন পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্যান্য এলাকার মতো সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য বিধি মানাসহ সব ধরনের কার্যক্রম আমাদের চলমান রয়েছে।

“এখন এই এলাকা গ্রিন জোন হিসেবে থাকলেও আমাদের পুলিশ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক সুরক্ষায়  কাজ করছে।”