কোভিডে মৃত্যুর শীর্ষে আসলে কোন দেশ?

ছবি: রয়টার্স
গত দুই বছরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছুঁইছুঁই, সরকারি হিসাবে এটি বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের কয়েকটি দেশে গত দুই বছরে কোভিডে যে পরিমাণ মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেসব দেশে মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে ঢের বেশি; এমনকি তা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি।

তাহলে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রই শীর্ষে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বিবিসি।

বিশ্বের গড় মৃত্যুর চেয়ে বেশি মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রে

ছবি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা/বিবিসি

মৃত্যু বা তার কারণ পরিমাপের জন্য আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ড নেই। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন উপায়ে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করে, ফলে একের সঙ্গে অন্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে সঠিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি হলো, একটি দেশে বছরে গড়ে কত সংখ্যক মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেই সংখ্যার অতিরিক্ত সংখ্যাটা বের করা।

অনেক দেশ অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করলেও কিছু দরিদ্র দেশ, তা করে না কিংবা খুব কম কমই করে।

২০২০ ও ২০২১ সালে প্রত্যেক দেশের অতিরিক্ত মৃত্যু নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। অতিরিক্ত মৃত্যুর এই সংখ্যা পরিমাপের ক্ষেত্রে সরাসরি কোভিডে মৃত্যু বলে নিশ্চিত নয়, এমন কারণগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ছবি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা/বিবিসি

যেমন- চিকিৎসার জন্য লোকেরা হাসপাতালের চিকিৎসা সুবিধা পায়নি এমন কারণগুলো রয়েছে। এটি কিছু অঞ্চলে সব থেকে খারাপ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

ওই প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, যদিও মৃত্যু গণনার এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ দেশ নয়, তবে এটি প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে।

ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ ও ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত মারা গেছে ৯ লাখ ৩০ হাজার মানুষা। কিন্তু ভারতে মারা গেছে ৪৭ লাখ, রাশিয়ায় ১১ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ১০ লাখ মানুষ।

বিবিসি লিখেছে, সংস্থাটির পরিসংখ্যান মূলত ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্য ইকোনমিস্টের পরিসংখ্যান এবং অতিরিক্ত মৃত্যু নিয়ে অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে বেশ সঙ্গতিপূর্ণ।

জনসংখ্যা বিবেচনায় সামঞ্জস্য করা হলে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি ১ লাখে ১৪০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু নিয়ে র‌্যাংকিং থেকে ছিটকে পরে। কিন্তু দেশটি প্রতি ১ লাখে বৈশ্বিক গড় ৯৬ এর অনেক উপরে রয়েছে। এ ছাড়া এটি সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার একটি।

ছবি: জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি/বিবিসি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ করা মহামারী বিশেষজ্ঞ প্রভাত ঝা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত মৃত্যুর তুলনায় সরকারি হিসাবে ১৫ শতাংশ কম মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। এর বেশিরভাগই প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা যেমন বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যেসব মৃত্যু হয়েছে সেগুলো এড়িয়ে গেছে।

“সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মতো অনেক মৃত্যু এড়িয়ে যায়নি।”

সরকারি হিসাবে মহামারীর দুই বছরে ভারতে কোভিডে মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখ ২৪ হাজার মানুষের। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভারতে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা হতে পারে ৪৭ লাখ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ সংখ্যা।

কোভিডে মৃত্যুর সরকারি হিসাবের খবর কী?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সর্বাধিক মৃত্যুর রেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রের, যা পরবর্তী নিকটতম দেশ ব্রাজিলের চেয়ে ৩ লাখ বেশি। কিন্তু অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যাও বেশি।

ছবি: জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি/বিবিসি

বিবিসি জানিয়েছে, আপনি যখন মাথাপিছু হিসাবে একই রকমের ১০টি দেশের চিত্র দেখেন, তখন কোভিডে মৃত্যুর রেকর্ডে ব্রাজিল ও পেরু উভয়ের নিচে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুসারে, মাথাপিছু হিসাবে কোভিড মৃত্যুর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে অষ্টাদশ অবস্থানে রয়েছে।

নর্থ ক্যারোলাইনা ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজির অধ্যাপক জাস্টিন লেসলার বলেন, “সংক্ষেপে আমি মনে করি, মাথাপিছু নিশ্চিত মৃত্যুর হার একটি বেশ ভালো সূচক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ নয়, তবে এটি অবশ্যই উচ্চ প্রান্তে রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের জনসংখ্যার গড় বয়স বিবেচনায় নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মিশিগান ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজির অধ্যাপক ভ্রমর মুখার্জি বলেন, “আমাদের এমন দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা উচিৎ, যেগুলোর বয়সের কাঠামো একই রকম- কারণ আমরা জানি, কোভিডে বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি; তাই আমাদের ‘আপেলের সঙ্গে কেবল আপেলেরই’ তুলনা করা উচিৎ।”

ছবি: জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি/বিবিসি

স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ প্রতিবেশী কানাডার সঙ্গে তুলনা করলে একই বয়সের জনসংখ্যার হিসাবে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আরও খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

লেসলার বলেন, “অনেক ইউরোপীয় দেশ- যেমন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং স্পেনের সঙ্গে তুলনা করা যুক্তিসঙ্গত। এসব দেশের মাথাপিছু মৃত্যুর হার কম ছিল।

“তবে এই ব্যবধান রাত-দিন নয়, যুক্তরাষ্ট্র সেই বর্ণালিটির উপরের প্রান্তে রয়েছে।”