স্কটল্যান্ডের সঙ্গেই পারল না বাংলাদেশ

গ্যালারি জুড়ে লাল-সবুজের পতাকার ওড়াওড়ি আর বাংলাদেশের জার্সির ছড়াছড়ি। বিশ্বকাপে চোখের সামনে দেশের খেলা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্মাদনা তুমুল। মাঠের লাউড স্পিকারে বাংলা গানও বেজে উঠল ক্ষণে-ক্ষণে। কিন্তু যা ঘিরে এত আয়োজন, সেখানেই তাল-লয়-সুর কিছু নেই! বোলিংয়ে শুরুর ধার পরে হারিয়ে, ব্যাটিংয়ে নিজেদের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে বিবর্ণ বাংলাদেশ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হেরে গেল স্কটল্যান্ডের কাছে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে বাংলাদেশের বিপক্ষে স্কটল্যান্ডের জয় ৬ রানে।

শিশির ভেজা বলে আলগা কিছু ডেলিভারি পেয়ে শেষ ওভারে ১৭ রান তুলতে পারে বাংলাদেশ। ব্যবধান তাই কমে আসে কিছুটা। নইলে ফল যতটা কাছাকাছি মনে হচ্ছে, স্কটল্যান্ডের জয় তার চেয়ে কিছুটা সহজেই এসেছে।

ওমানের ক্রিকেট একাডেমি মাঠে রোববার স্কটিশরা ২০ ওভারে তোলে ১৪০ রান। বাংলাদেশ ইনিংস জুড়ে ধুঁকে ধুঁকে শেষ দিকে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত যেতে পারে ১৩৪ পর্যন্ত।

অথচ ম্যাচের প্রথম ভাগে দাপট ছিল কেবলই বাংলাদেশের। ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে স্কটিশরা ছিল দিশাহীন। তাদের ত্রাতা হয়ে আসেন তখন ক্রিস গ্রিভস। তার মাত্র দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ এটি, স্বীকৃত ক্রিকেটেই ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ছয়টি। মূল কাজ তার লেগ স্পিন বোলিং। অথচ বিশ্বকাপ অভিষেকে ব্যাট হাতে উপহার দিলেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। তার ২৮ বলে ৪৫ রান দলকে টেনে তোলে খাদের কিনারা থেকে।

পরে তার বোলিং দলকে এগিয়ে নেয় স্মরণীয় এক জয়ের পথে। ৩ ওভারে ১৯ রান দিয়ে তার শিকার সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের উইকেট। ম্যাচ সেরা তিনি ছাড়া আর কে!

গ্রিভস আর তার সতীর্থদের উজ্জীবিত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের জন্য ফিরে এলো স্কটিশ দুঃস্বপ্ন। ২০১২ আর ২০২১, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি খেলে হারের তেতো স্বাদ মিলল দুবারই।

যদিও তেমন কিছুর ইঙ্গিত ছিল না ম্যাচের শুরুটায়। তিন পেসার নিয়ে একাদশ সাজিয়ে টস জিতে বাংলাদেশ বোলিং শুরু করে পেসারদের দিয়েই। প্রথম ওভারে তাসকিন আহমেদ একটি বাউন্ডারি হজম করলেও রান দেন ৫। পরের ওভারে মুস্তাফিজুর রহমান নেন মেডেন।

এই দুজনের আঁটসাঁট শুরুর পর তৃতীয় ওভারে দলকে উইকেট এনে দেন মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। বাতাসে হালকা সুইং করা দুর্দান্ত ইয়র্কারে বোল্ড করে দিন তিনি স্কটিশ অধিনায়ক কাইল কোয়েটজারকে (০)।

শুরুতে সন্ত্রস্ত্র সেই স্কটল্যান্ডকে জাগিয়ে তোলেন জর্জ মানজি। তাসকিন আহমেদের নো বলে উড়িয়ে মেরে ছক্কা পান তিনি সাকিব বল হাতে জমাতে না পারায়। পরে দুর্দান্ত শটে ছক্কা মারেন মুস্তাফিজকে। মাঝে বাউন্ডারি আদায় করেন সাইফের বলেও।

প্রথম ৩ ওভারে কেবল ৭ রান করতে পারা স্কটল্যান্ড পরের ৩ ওভারে তোলে ৩২।

তবে মাথাচাড়া দেওয়া স্কটিশদের নুইয়ে দেন মেহেদি হাসান। নিজের প্রথম ওভারেই তিনি বিদায় করে দেন জুটি গড়ার চেষ্টায় থাকা দুই ব্যাটসম্যানকে। ম্যাথু ক্রস এলবিডব্লিউ হন ক্রস ব্যাটে উড়িয়ে মারতে গিয়ে। বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেওয়া মানজি বোল্ড সুইপ শটের চেষ্টায় (২৩ বলে ২৯)।

সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই সাকিবের জোড়া শিকার। অভিজ্ঞ রিচি বেরিংটনের উইকেট নিয়ে তিনি স্পর্শ করেন মালিঙ্গার ১০৭ উইকেটের রেকর্ড। সীমানায় দারুণ ক্যাচ নেন আফিফ হোসেন। এক বল পরই লিটন দাসের হাতে সীমানায় সহজ ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন মাইকেল লিস্ক।

এই উইকেটে লাসিথ মালিঙ্গাকে ছাড়িয়ে টি-টোয়েন্টির সফলতম বোলার হয়ে যান সাকিব। মাত্র দ্বিতীয় বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে পূর্ণ করেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬০০ উইকেট।

পরের ওভারে মেহেদিকে জায়গা বানিয়ে খেলতে গিয়ে যখন বোল্ড হন ক্যালাম ম্যাকলাউড, ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে তখন স্কটিশ ইনিংস প্রায় ধ্বংসস্তুপ।

৮ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে দিশাহারা দলকে উদ্ধার করেন গিভস ও মার্ক ওয়াট। ইনিংসের একমাত্র অর্ধশত রানের জুটি পায় স্কটল্যান্ড এই দুই স্পিনারের ব্যাটে।

দুর্দান্ত সব শটে দলের ইনিংসকে নতুন গতি দেন দুজন। মেহেদিকে রিভার্স সুইপে ছক্কায় ওড়ান গ্রিভস, তাসকিনকে ছক্কা মারেন আপার কাটে। ওয়াটও খেলেন দারুণ কিছু শট। ৩৪ বলে দুজন যোগ করেন ৫১ রান।

ওয়াটকে (১৭ বলে ২২) ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন তাসকিন। তবে ওই ওভারে হজম করেন তিনি ১৫ রান। ২৮ বলে ৪৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে গ্রিভস আউট হন শেষ ওভারে।

মুস্তাফিজ শেষ ওভারে দুটি উইকেট নেন বটে। তবে গ্রিভসের ইনিংসের পর শেষ দিকে দু পেসার সাফওয়ান শরিফ ও জশ ডেভির ছক্কায় ১৪০ ছাড়িয়ে যায় স্কটল্যান্ড।

রান তাড়ায় যথারীতি দুই ওপেনারকে দ্রুত হারায় বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে নান্দনিক ফ্লিক শটে মিড উইকেট দিয়ে চার মারেন সৌম্য সরকার। পরের ওভারে তার জন্য মিড উইকেটে একজন ফিল্ডার রাখেন স্কটিশ অধিনায়ক। সৌম্য বল তুলে দেন ঠিক তার হাতেই!

একটু পর লিটন দাস ডাউন দা উইকেট খেলে সহজ ক্যাচ দেন মিড অফে।

সাকিব উইকেটে যাওয়ার পরপরই চার মারেন একটি। কিন্তু এরপরই ধুঁকতে থাকেন টাইমিং পেতে। একই দশা মুশফিকেরও। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে রান আসে মোটে ২৫।

নবম ওভারে অফ স্পিনার মাইকেল লিস্কের দুটি বল নিজের জোনে পেয়ে প্রিয় স্লগ সুইপে টানা দুটি ছক্কায় ওড়ান মুশফিক। তাতে দলের রান রেট ছয়ের কাছাকাছি ওঠে। এরপরও অবশ্য রানের গতি খুব বাড়েনি, ছন্দ ফেরেনি দুজনের ব্যাটে।

সাকিবের অস্বস্তিময় উপস্থিতি শেষ হয় বাজে এক ডেলিভারিতে আরও বাজে শটে। গ্রিভস নিজের প্রথম বলটি করে হাফ পিচে, লেগ সাইডে যে কোনো প্রান্তে পাঠানো যায় সেই বল। সাকিব সেটিই উড়িয়ে মেরে তুলে দেন ফিল্ডারের হাতে। ২৮ বলে ২০ রানের ইনিংসটি ব্যাট হাতে তার বাজে সময়ের আরেকটি বিজ্ঞাপন হয়ে রইল।

দলকে এগিয়ে নেওয়ার ভার তখন থিতু হয়ে যাওয়া মুশফিকের ওপর। কিন্তু গ্রিভসের পরের ওভারে বোল্ড তিনি স্কুপ করার চেষ্টায়। ২ ছক্কা ও ১ চারের পরও তার ৩৮ রান করতে লাগে ৩৬ বল।

এরপর ব্যাটে-বলে করতে ভুগতে থাকেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহও। আফিফ হোসেন গিয়ে একটু প্রাণ দেন দলের ইনিংস। রানের দাবি মেটাতে গিয়ে তার ইনিংস থামে ১২ বলে ১৮ রানে। নুরুল হাসান সোহান ধরা পড়েন সীমানায়।

মাহমুদউল্লাহ একটি ছক্কায় আশা জাগিয়ে তোলেন খানিকটা। কিন্তু পরে নিজেই তা নিভিয়ে দেন আউট হয়ে। অধিনায়কের ২২ বলে ২৩ রানের ইনিংসটিও পেছনেই টানে দলকে।

শেষ ওভারে শেখ মেহেদি হাসান (৫ বলে ১৩) চেষ্টা করেন কিছুটা। তবে ম্যাচ ততক্ষণে নাগালের বাইরে। গ্যালারির নিস্তব্ধ বাংলাদেশি সমর্থকদের সামনে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে ওঠেন স্কটিশরা।

স্কটিশ কোচ শেন বার্জার ম্যাচের আগে বলেছিলেন, বাংলাদেশকে তারা ওমান-পাপুয়া নিউ গিনির চেয়ে ওপরে রাখেন না মোটেও। শুধু কথায়ও নয়, প্রমাণ মেলে ধরল তারা মাঠের ক্রিকেটেও।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

স্কটল্যান্ড:  ২০ ওভারে ১৪০/৯ (মানজি ২৯, কোয়েটজার ০, ক্রস ১১, বেরিংটন ২, ম্যাকলাউড ৫, লিস্ক ০, গ্রিভস ৪৫, ওয়াট ২২, ডেভি ৮, শরিফ ৮*, হুইল ১*; তাসকিন ৩-০-২৮-১, মুস্তাফিজ ৪-১-৩২-২, সাইফ ৪-০-৩০-১, সাকিব ৪-০-১৭-২, মেহেদি ৪-০-১৯-৩, আফিফ ১-০-১০-০)।

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৩৪/৬ (লিটন ৫, সৌম্য ৫, সাকিব ২০, মুশফিক ৩৮, মাহমুদউল্লাহ ২৩, আফিফ ১৮, সোহান ২, মেহেদি ১৩*, সাইফ ৫*; হুইল ৪-০-২৪-৩, ডেভি ৪-০-২৪-১, শরিফ ৩-০-২৬-০, লিস্ক ২-০-২০-০, ওয়াট ৪-০-১৯-১, গ্রিভস ৩-০-১৯-২)।

ফল: স্কটল্যান্ড ৬ রানে জয়ী।

ম্যান অব দা ম্যাচ: ক্রিস গিভস।