স্বস্তির জয়ে আশা জিইয়ে রাখল বাংলাদেশ

মুস্তাফিজুর রহমানের মাথায় হাত, মাহমুদউল্লাহর মুখ অন্ধকার। বাংলাদেশের বোলিংয়ে সেটি ষষ্ঠ ওভার। সহজ একটি ক্যাচ ছাড়ার পর গোটা দলকে মনে হলো বিধ্বস্ত। অধিনায়ক নিজে ক্যাচটি নিতে না পেরে যেন মিইয়ে গেলেন একদম। কয়েক ওভার ধরে তার মুখে হাসি-কথা কিছু নেই। ওমানের ব্যাটিংও তখন হচ্ছিল দারুণ। সব মিলিয়ে যেন অশনি সঙ্কেত! পরে অবশ্য আস্তে আস্তে চাপটা সরাতে পারল বাংলাদেশ। অধিনায়কের চেহারাও উজ্জ্বল হলো ক্রমে। মুখে ফুটল বোল। শেষ পর্যন্ত জয়ের স্বস্তিতে মাঠ ছাড়ল দল।

যে জয় বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখল বিশ্বকাপে। হেরে গেলেই শেষ হয়ে যেত অভিযান। ওমানের বিপক্ষে প্রবল চাপের ম্যাচে জয়টা এলো ২৬ রানে।

টি-টোয়েন্টিতে এই ব্যবধান যথেষ্টই বড়। তবে শেষের ৫-৬ ওভার আগেও ম্যাচে ভালোমতোই ছিল ওমান। কিন্তু পরে তারা পেরে ওঠেনি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কাছে।

ওমান ক্রিকেট একাডেমি মাঠে মঙ্গলবার ২০ ওভারে বাংলাদেশ করে ১৫৩ রান। আগের ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা মোহাম্মদ নাঈম শেখ ফিরে ৫০ বলে ৬৪ করে দলের সর্বোচ্চ স্কোরার।

তবে কার্যকর ইনিংসটি আসে সাকিব আল হাসানের ব্যাট থেকে। প্রথম ম্যাচে মন্থর ব্যাটিংয়ের জন্য সমালোচিত অলরাউন্ডার এবার করেন ২৯ বলে ৪২ রান।

পরে বল হাতেও ৩ উইকেট নিয়ে তিনিই ম্যাচের সেরা। প্রথম ওভারে ৫ ওয়াইডের হতাশা পেছনে ফেলে মুস্তাফিজুর রহমানের শিকার ৪ উইকেট।

তবে দলের সেরা বোলার ছিলেন নিঃসন্দেহে মেহেদি হাসান। ওমান যখন দ্রুত রান করে ছুটছে লক্ষ্যের দিকে, ৪ ওভারে মাত্র ১৪ রানে ১ উইকেট নিয়ে এই অফ স্পিনারই বদলে দেন ম্যাচের মোড়।

এই জয়ে আশা জিইয়ে থাকলেও পরের রাউন্ডের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না এখনই। বাংলাদেশকে জিততে হবে পাপুয়া নিউ গিনির বিপক্ষে পরের ম্যাচেও। শেষ রাউন্ডের অন্য ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ওমান জিতে গেলে আসতে পারে রান রেটের হিসাবও।

ওমানের বিপক্ষে এ দিন টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা হয় নড়বড়ে। লিটন দাসকে শূন্য রানেই কট বিহাইন্ড দেন আম্পায়ার। তবে রিভিউ নিয়ে তিনি টিকে যান। ৪ রানে বেঁচে যান ক্যাচ দিয়ে। শেষ রক্ষা হয়নি তবু। পরের বলেই বিলাল খানের দুর্দান্ত সুইঙ্গিং ডেলিভারিতে হয়ে যান এলবিডব্লিউ (৬)।

শেখ মেহেদি হাসানকে তিনে তোলা কাজে লাগেনি। নিজের বলে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে তাকে ফেরান আসরে প্রথম খেলতে নামা ফায়াজ বাট।

নাঈম চতুর্থ ওভারে টানা দুই বলে চার-ছক্কা মারেন কালিমউল্লাহকে। তবে পাওয়ার প্লের বাকি সময়টায় থাকেন ঘুমিয়ে। ৬ ওভারে তাই রান আসে ২৯। নাঈমের রান তাতে ১৯ বলে ১৫!

সেখান থেকে আরেকটু এগিয়েই শেষ হতে পারত তার ইনিংস। ১৮ রানে তার ক্যাচ নিতে গিয়ে ছক্কা বানিয়ে দেন ওমানের সেরা ফিল্ডারদের একজন জাতিন্দার। ২৬ রানে মিড উইকেটে তার সহজ ক্যাচ ছাড়েন প্রজাপতি কাশ্যপ।

দফায় দফায় জীবন পেয়ে তিনি টিকে যান। সাকিব ততক্ষণে গতি দিতে শুরু করেন দলের ইনিংসকে। ডট বলের ফাঁকে দু-একটি বাউন্ডারি আদায় করেন নাঈম। ১০ ওভারে দলের রানরেট প্রথমবার ছয় ছাড়ায়। দুজনের জুটি ৫০ স্পর্শ করে ৩৯ বলে। সময়ের সঙ্গে ক্রমেই ভালো খেলছিলেন সাকিব।

৫৩ বলে ৮০ রানের এই জুটি শেষ হয় ঝুঁকিপূর্ণ রানের চেষ্টায়। পয়েন্ট থেকে সরাসরি থ্রোয়ে আকিব ইলিয়াস বল লাগান স্টাম্পে। শেষ সময়ে ডাইভ না দিয়ে সাকিব কেন হাল ছেড়ে দিলেন, সেটির ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।

ম্যাচের আগের দিন ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, সেটির নমুনা মেহেদি ছাড়াও দেখা যায় আরও। পাঁচ ও ছয়ে নামানো হয় নুরুল হাসান সোহান ও আফিফ হোসেনকে। বড় শটের চেষ্টায় দুজনই আউট হন দ্রুত।

রান আসে তখন মূলত নাঈমের ব্যাটে। দারুণ চারে ফিফটি স্পর্শ করেন তিনি ৪৩ বলে। পরের ওভারে ছক্কায় ওড়ান বিলাল খানকে। তবে শেষটা ভালো করতে পারেননি তিনিও।

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর প্রথমবার আটে নেমে মুশফিকুর রহিম বিদায় নেন ৬ রানে। দ্রুত কিছু উইকেটে খানিকটা কমে রানের গতি। শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহর ১০ বলে ১৭ রানের ইনিংসে দেড়শ ছাড়াতে পারে দল।

রান তাড়ার শুরুতে ওমান বেছে নেয় দ্রুত রান তোলার কৌশল। দ্বিতীয় ওভারেই আকিব ইলিয়াসকে ফেরান মুস্তাফিজুর রহমান। তবে তাতে বদলায়নি ওমানের কৌশল।

আলগা বোলিং আর বাজে ফিল্ডিংয়ে ওমানকে সহায়তা করে বাংলাদেশও। উইকেট নেওয়ার ওভারে ৫টি ওয়াইড করার পাশাপাশি একটি ছক্কাও হজম করেন মুস্তাফিজ।

এর সঙ্গে যোগ হয় ক্যাচ ছাড়া। ৭ রানে প্রজাপতি কাশ্যপের ক্যাচ ছাড়েন মুস্তাফিজ। শর্ট থার্ড ম্যানে সেটি কঠিন ছিল। তবে মুস্তাফিজের বলে মাহমুদউল্লাহ ছাড়েন জাতিন্দার সিংয়ের সহজ ক্যাচ। সেই জাতিন্দার বেশ কিছুক্ষণ উইকেটে থেকে যন্ত্রণা দেন বাংলাদেশকে।

কাশ্যপ প্রজাপতিকে বিদায় করে দলকে দ্বিতীয় উইকেটও এনে দেন মুস্তাফিজ। তবে পাওয়ার প্লেতে ওমান তুলে ফেলে ৪৭ রান। পরের ওভারে সাকিবকে চার-ছক্কায় চমকে দেন জাতিন্দার।

রানের সেই গতিতে লাগাম টানেন মেহেদি। নিজের প্রথম ২ ওভারে মাত্র ৬ রান দেন তিনি। সেই চাপ কাটানোর চেষ্টায় তাকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে উইকেট দেন ওমান অধিনায়ক জিশান মাকসুদ।

জাতিন্দার টিকে ছিলেন বলে তখনও ছিল ওমানের আশা। সাকিব আক্রমণে ফিরে সরিয়ে দেন বড় এই বাধা। লেগ স্টাম্পের বাইরের বলটিতে ছক্কার চেষ্টায় তিনি ধরা পড়েন সীমানায়। ৩২ বলে ৪০ করে তিনি আউট হতেই অনেকটা শেষ হয় ওমানের সম্ভাবনা।

ম্যাচ জেতানোর মতো ব্যাটসম্যান আর ছিল না দলে। কেউ চমকপ্রদ কিছু করতে পারেনওনি। ওমানের অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইন আপ ১১ রানের মধ্যে হারিয়ে বসে ৫ উইকেট।

সাকিব নিজের শেষ ওভারে উইকেট নেন দুটি। শেষ দিকে মুস্তাফিজ ফিরে নেন আরও দুটি উইকেট।

কেবল প্রথম ধাপ পেরোনো হলো, বাংলাদেশের উদযাপন তাই ছিল পরিমিত। তবে গ্যালারি ঠাসা বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য এটিই ছিল উদযাপনের বড় উপলক্ষ। প্রথম ম্যাচের হতাশার পর খেলা দেখতে আসা প্রবাসী বাংলাদেশিরা মাঠ ছাড়েন আনন্দ-উল্লাসে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৫৩ (লিটন ৬, নাঈম ৬৪, মেহেদি ০, সাকিব ৪২, সোহান ২, আফিফ ১, মাহমুদউল্লাহ ১৭, মুশফিক ৬, সাইফ ০, তাসকিন ১*, মুস্তাফিজ ২; বিলাল ৪-০-১৮-৩, কালিমউল্লাহ ৪-০-৩০-২ , ফায়াজ ৪-০-৩০-৩,, নাদিম ৪-০-৩৫-০, আকিব ২-০-১৬-০, জিশান ২-০-১৭-১)।

ওমান: ২০ ওভারে ১২৭/৯ (আকিব ৬, জাতিন্দার ৪০, প্রজাপতি ২১, জিশান ১২, আয়ান ৯, সন্দিপ ৪, নাসিম ৪, কালিমউল্লাহ ৫, নাদিম ১৪*, ফায়াজ ০, বিলাল ০*; তাসকিন ৪-০-৩১-০, মুস্তাফিজ ৪-০-৩৬-৪, সাইফ ৪-০-১৬-১, সাকিব ৪-০-২৮-৩, মেহেদি ৪-০-১৪-১)।

ফল: বাংলাদেশ ২৬ রানে জয়ী।

ম্যান অব দা ম্যাচ: সাকিব আল হাসান।

''