‘আমিনি’ নামের গর্ব ও পিএনজির টেস্ট খেলার স্বপ্ন

ওমান ক্রিকেট একাডেমি মাঠে বুধবার দুপুরে চলছিল পাপুয়া নিউ গিনির অনুশীলন। সেন্টার উইকেট থেকে ছক্কা মারার হাত সাফাই করছিলেন চার্লস জর্ডান আমিনি। বেশ কয়েকটি বল আছড়ে ফেললেন গ্যালারিতে। ঠিক সোজাসুজি বসে প্রেসবক্সের সংবাদকর্মীরাও তখন সন্ত্রস্ত্র, বল যে তাদের আশেপাশেও উড়ে এলো কয়েকবার! বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচেও যদি তার এমন কিছু শট দেখা যায়, নিশ্চিতভাবেই হুল্লোড় উঠবে পোর্ট মোরসবির একটি বাড়িতে।

এমনিতে পাপুয়া নিউ গিনিতে (পিএনজি) রাগবি লিগের উন্মাদনায় ক্রিকেট হালে পানি পায় না। তবে ওই একটি বাড়িতে ক্রিকেটই ধ্যানজ্ঞান। পিএনজির ক্রিকেটই দাঁড়িয়ে ওই পরিবারের পরিচয়ে। দেশটির ক্রিকেট মানেই একরকম আমিনি পরিবার।

ক্রিকেট ইতিহাসে ক্রিকেট পরিবারের গল্প তো কম নেই। তবে পরম্পরায় আমিনি পরিবারের সঙ্গে তুলনীয় কিছু পাওয়া ভার।

এই পরিবারের সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্কের শুরু গত শতাব্দির শুরুর দিকে। চার্লসের পরদাদা আমিনি ক্রিকেট দল গঠন করে নৌকায় রাজধানী পোর্ট মোরসবিতে গিয়ে শহরের বিভিন্ন দলের সঙ্গে ম্যাচ খেলতেন।

তার হাত ধরেই এই পরিবারের ক্রিকেট চলতে থাকে বংশ পরম্পরায়। আমিনির ছেলে ব্রায়ান আমিনি স্কুলে পড়াশোনা করেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে ক্রিকেটের সঙ্গে তার বন্ধন পোক্ত হয়। ক্রমে তিনি নিজেকে তুলে নেন জাতীয় পর্যায়ে। যে সময়টায় সেখানে শুধু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা প্রবাসীরাই ক্রিকেট খেলতেন, ব্রায়ান ওই সময়টাতেই পিএনজির প্রথম স্থানীয় অধিনায়ক হয়ে ইতিহাস গড়েন।

১৯৭৫ সালে সফরকারী ফিজির বিপক্ষে পিএনজিকে নেতৃত্ব দেন ব্রায়ান। এমনকি ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হয় তার।

খেলা ছাড়ার পর ব্রায়ান কাজ শুরু করেন ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে। পিএনজির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন তিনি আগে থেকেই। নিউ জিল্যান্ডে পাপুয়া নিউ গিনির হাই কমিশনার হন তিনি।

সেখানে ক্রিকেটের প্রেমে মজে যায় ব্রায়ানের ছেলে চার্লস আমিনি। পোর্ট মোরসবিতে বাড়ির আঙিনায় খেলে মনের খোরাক মেটাত ছোট্ট চার্লস। নিউ জিল্যান্ডে গিয়ে প্রথমবার টার্ফ উইকেটের স্বাদ পেয়ে আরও পোক্ত হয় তার ক্রিকেট প্রেম।

পরে দেশে ফিরে খেলা চালিয়ে যান চার্লস। সুযোগ পান জাতীয় দলে। এক সময় অধিনায়কত্বও পান। ক্রমে হয়ে ওঠেন পিএনজির ক্রিকেটের কিংবদন্তি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে লম্বা সময় নেতৃত্ব দেন দলকে। ১৯৮৬ আইসিসি ট্রফি থেকে শুরু করে ১৯৯৭ পর্যন্ত প্রতিটি আইসিসি ট্রফিতে খেলেন তিনি।

চার্লসের বোন শেরিল আমিনিও ছিলেন ক্রিকেটার। পাপুয়া নিউ গিনির মেয়েদের জাতীয় দল বিদেশি দলের বিপক্ষে যখন প্রথম ম্যাচ খেলে, জাপানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে খেলেন শেরিল। পরে জাতীয় দলের মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ক্রিকেটের পথচলায়ই চার্লসের পরিচয় কুনের সঙ্গে। পরিচয় থেকে পরিণয়। সেই কুনে আমিনি পরে নেতৃত্ব দেন পিএনজির মেয়েদের জাতীয় দলকে!

এই চার্লস ও কুনে দম্পতির তিন ছেলে। একসময় চার্লস কাজ করতেন মেলবোর্নে। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি মেলবোর্নের ক্রিকেটীয় আবহেও খেলাটির জগতে ঢুকে পড়েন তিন ছেলেই।

বড় ছেলে ক্রিস্টোফার আমিনি পেস বোলিং অলরাউন্ডার। পিএনজির প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২০১৪ সালে দেশকে নেতৃত্ব দেন ক্রিস্টোফার। মেজো ছেলে কলিন আমিনি ছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে পিএনজির অধিনায়ক। আর ছোট ছেলে চার্লস জর্ডান আমিনি জুনিয়র আজকের আলোচিত চরিত্র। পিএনজির এই দলের সহ-অধিনায়ক এবং লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার। দলের সেরা ক্রিকেটাদের একজন।

এই পরিবারের ক্রিকেট গাঁথুনির কথা যদি আরেকবার এক কাতারে দেখে নেওয়া যায়, চার্লস আমিনির দুই ভাই ক্রিকেটার, তাদের বাবা ক্রিকেটার, মা ক্রিকেটার, ফুপু ক্রিকেটার, দাদা ক্রিকেটার ও পরদাদাও ক্রিকেটার।

চার্লস আমিনির দুই কাজিনও ক্রিকেট খেলেছেন। তবে স্বীকৃত পর্যায়ে আসতে পারেননি।

পোর্ট মোরসবিতে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু আছে, ‘আমিনি পার্ক।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন পরিবারের সম্মানে মাঠের নাম।

সমৃদ্ধ এই ক্রিকেট পরিবারের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি চার্লস জর্ডান আমিনি। অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায় থেকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন তিনি। ২০০৮ ও ২০১০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলেন দেশের হয়ে। সেই পথে ধরে এক সময় পা রাখেন জাতীয় দলে। এখনও পর্যন্ত খেলেছেন ২১ ওয়ানডে ও ২৭ টি-টোয়েন্টি। আইসিসির ডিভিশন ক্রিকেট লিগগুলোয় খেলেন নিয়মিতই। গত তিন বছর ধরে জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক তিনি। ২০১৩-১৪ মৌসুমে বিগ ব্যাশে রুকি চুক্তিতে ছিলেন সিডনি সিক্সার্সে।

পরিবারের ক্রিকেট ঐতিহ্য শতবর্ষী হলেও বিশ্বকাপে তাদের প্রথম প্রতিনিধি চার্লস। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন ২৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার বললেন, পরিবারের সবার গর্ব এই বিশ্বকাপ তার সঙ্গী।

“তারা খুবই রোমাঞ্চিত। প্রতিদিনই ম্যাসেজ পাঠায়, কথা হয়। সবসময়ই বলে, আমাকে নিয়ে তারা কতটা গর্বিত। ‘আমিনি’ নামটাকে ধারন করতে পেরে আমি গর্বিত ও সম্মানিত। আশা করি, আমার পরিবারের পরের প্রজন্মও এই ধারা ধরে রাখবে। বিশ্বমঞ্চে আমার পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি সম্মানিত। ওরা আমাকে নিয়ে গর্বিত। আশা করি, আমিও ওদেরকে গর্ব উপহার দিয়ে যাব।”

পিএনজির ক্রিকেট ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও কাঠামো খুব সমৃদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলা ক্রিকেটারদের নিয়েই মূলত জাতীয় দল গঠন করা হয়। তবে এবার বিশ্বকাপ খেলতে পারা তাদের দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় এক অর্জন।

চার্লস আমিনির স্বপ্নের সীমানায় এখন টেস্ট ক্রিকেটও আছে। একসময় আইসিসি ট্রফিতে একসঙ্গেই নিয়মিত অংশ নিত পিএনজি ও বাংলাদেশ। মুখোমুখি লড়াই যদিও হয়নি খুব একটা। ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় এসিসি ট্রফির সেমি-ফাইনালে পিএনজিকে ৭ উইকেটে হারিয়ে পরে শিরোপাও জেতে বাংলাদেশ।

বাবার কাছে সেই সময়ের বাংলাদেশের গল্প শোনেন চার্লস। আর স্বপ্ন দেখেন, বাংলাদেশের পথ ধরেই একদিন টেস্ট খেলবে পিএনজি।

“(সেই সময়ের) অনেক কথাই তিনি বলেন। একটা টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, পিএনজি হয়েছিল তৃতীয় (১৯৯৬ এসিসি ট্রফি, পিএনজিকে হারিয়ে ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ)। তার কাছ থেকেই জেনেছি, ওই পর্যায় থেকে ভ্রমণ করেই বাংলাদেশ আজকের পর্যায়ে এসেছে। আশা করি, পিএনজিও তেমন কিছু করতে পারবে।”

“শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়েও একসময় আমাদের মতো এই অবস্থায় ছিল। সহযোগী দেশ থেকে নানা ধাপ পেরিয়ে উঠে আসতে হয়েছে। আশা করি আমরাও একদিন টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারব।”