দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে টুর্নামেন্টের সেরা ওয়ার্নার

বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তেও ডেভিড ওয়ার্নারের ফর্ম নিয়ে চারদিকে চলছিল আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। ২২ গজে ব্যাট হাতেই জবাব দিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। দলের শিরোপা জয়ে রাখলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জিতে নিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

দুবাইয়ের ফাইনালে রোববার নিউ জিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে ২০ ওভারের বিশ্বকাপে প্রথম শিরোপার স্বাদ পায় ওয়ানডের রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া।

টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে দলকে সামনে থেকে পথ দেখান ওয়ার্নার। ফাইনালসহ শেষ তিন ম্যাচের দুটিতেই করেন ফিফটি, অন্যটিতে পঞ্চাশ ছোঁয়া হয়নি স্রেফ ১ রানের জন্য।

সব মিলিয়ে আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। ৭ ইনিংসে ৪৮.১৬ গড় আর ১৪৬.৭০ স্ট্রাইক রেটে রান ২৮৯। পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংস তিনটি।

অথচ বিশ্বকাপের আগে সময়টা পক্ষে ছিল না তার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইপিএল পুনরায় শুরুর পর দুটি ম্যাচ খেলার পরই জায়গা হারান সানরাইজার্স হায়দরাবাদের একাদশে। এরপর এমনকি ঠাঁই হয়নি দলটির ডাগ আউটেও। অথচ এই ফ্র্যাঞ্চাইজির একমাত্র শিরোপা তার নেতৃত্বে, এই দলের হয়ে তার ব্যাটিং ও নেতৃত্বের রেকর্ড দুর্দান্ত।

তখন থেকেই তার ফর্ম নিয়ে শুরু হয় ফিসফাস। আইপিএলের পর বিশ্বকাপের আগে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচেও ভালো করতে পারেননি তিনি। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হন মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই। ভারতের বিপক্ষে করেন স্রেফ ১ রান।

ভালো করতে পারেননি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও, ১৪ বলে করেন ১৫। সমালোচনাও বাড়তে থাকে আরও। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচের আগে এই প্রসঙ্গে ওয়ার্নার বলেছিলেন, “ফর্মহীনতার কথা শুনে আমার হাসিই পায়, কয়টা ম্যাচে রান পাইনি? আইপিএলে দুটি ম্যাচ আর দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে, এই তো!”

তার কথা যে ভুল ছিল না, সেটি প্রমাণ করে দেন তিনি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই। রান তাড়ায় ৪২ বলে খেলেন ৬৫ রানের দারুণ ইনিংস। তাতে ৩ উইকেট হারিয়ে ৩ ওভার বাকি রেখেই শ্রীলঙ্কার ১৫৪ রান টপকে যায় অস্ট্রেলিয়া।

পরের দুই ম্যাচে যদিও হাসেনি তার ব্যাট। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের হারের ম্যাচে করেন ১ রান, বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে ১৮।

তবে সেরাটা তিনি যেন জমিয়ে রেখেছিলেন শেষ দিকের জন্য। পরের তিনটি ইনিংসে করলেন যথাক্রমে অপরাজিত ৮৯, ৪৯ ও ৫৩।

সুপার টুয়েলভের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে তিনি অপরাজিত ৮৯ রানের ইনিংস খেলেন মাত্র ৫৬ বলে। বিধ্বংসী ইনিংসটি সাজানো ৯টি চার ও ৪টি ছক্কায়। দলকে জিতিয়ে তিনি নিজে জেতেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার।

সেই ফর্ম তিনি ধরে রাখেন নকআউট পর্বেও। সেমি-ফাইনালে পাকিস্তানের ১৭৬ রান তাড়ায় ওয়ার্নারের ৩০ বলে ৪৯ রানের ইনিংস পথ দেখায় দলকে। পরে মার্কাস স্টয়নিস ও ম্যাথু ওয়েডের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে শেষ ৩০ বলে ৬২ রানের কঠিন সমীকরণ অস্ট্রেলিয়া মেলায় এক ওভার বাকি থাকতেই।

এবার ফাইনালে খেললেন ৩৮ বলে ৪ চার ও ৩ ছক্কায় ৫৩ রানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। সেই নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে, প্রস্তুতি ম্যাচে যাদের বিপক্ষে পেয়েছিলেন ‘গোল্ডেন ডাক’।

বড় রান তাড়ায় শুরুতে অ্যারন ফিঞ্চকে হারানোর পর মিচেল মার্শের সঙ্গে ওয়ার্নারের ৫৯ বলে ৯২ রানের দ্বিতীয় উইকেট জুটি জয়ের পথে এগিয়ে নেয় অস্ট্রেলিয়াকে। ৫০ বলে ৬ চার ও ৪ ছক্কায় অপরাজিত ৭৭ রানের ইনিংসে দলের জয় নিয়ে ফেরেন মার্শ।

আসরে একটি জায়গায় ৩৫ বছর বয়সী ওয়ার্নার আছেন সবার ওপরে। সবচেয়ে বেশি ৩২টি চার এসেছে তার ব্যাট থেকেই। ছক্কা মেরেছেন তিনি ১০টি, মার্শের সঙ্গে যৌথভাবে আসরের চতুর্থ সর্বোচ্চ।  

ফাইনাল শেষে ওয়ার্নার বললেন, স্রেফ মৌলিক বিষয় ঠিক রেখেই টুর্নামেন্টে রানের দেখা পেয়েছেন তিনি।

“সবসময় ভালো অনুভব করেছি। অবশ্যই দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে উইকেটে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। কিন্তু আমার জন্য বিষয়টা ছিল মৌলিক ব্যাপারগুলো ঠিক রাখা। খুব কঠিন, কৃত্রিম উইকেটে কিছু বল মারার চেষ্টা করা।”

২০১০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারা অস্ট্রেলিয়া দলের অংশ ছিলেন ওয়ার্নার। ১১ বছর পর আরেকটি ফাইনালে এসে ২০ ওভারের বিশ্বকাপে শিরোপার আক্ষেপ ঘুচল তার ও তার দলের।

অথচ আসর শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বাজি ধরার লোক খুব একটা ছিল না। বিশ্বকাপের আগে টানা পাঁচটি টি-টোয়েন্টি সিরিজে হেরেছিল তারা। সেই দলই ঘরে ফিরছে বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে। ওয়ার্নার প্রশংসায় ভাসালেন পুরো দলকে।

“এক দশক আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালটা বেদনাদায়ক ছিল। এই ছেলেরা দুর্দান্ত। দুর্দান্ত সাপোর্ট স্টাফ, দুর্দান্ত দল...স্কোরবোর্ডে বড় রান থাকায় কিছুটা স্নায়ুচাপ ছিল। ছেলেরা যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছে, তা দেখে ভালো লাগছে।”