নিন্দার কাঁটা মাড়িয়ে নন্দিত প্রহরে মার্শ

মিচেল মার্শ ডানা মেলে দিলেন। উড়তে চাইলেন যেন। রুখবে তাকে কে! তিনি বাঁধনহারা। গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের শটে বল যখন বাউন্ডারিতে, মার্শ তখন ছুটলেন ড্রেসিং রুমের দিকে। তবে যেতে আর পারলেন কোথায়! সতীর্থরা মাঠে ছুটে এলেন আরও আগেই। মার্শ হারিয়ে গেলেন তাদের আলিঙ্গনে। বিশ্বজয়ের উল্লাস। প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপার অনির্বচনীয় অনুভূতি। আর, এক বুক তৃপ্তি। যে দিনটির অপেক্ষায় তিনি ছিলেন!

অপেক্ষাটার কথা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৯ অ্যাশেজে। সেবার এক সংবাদ সম্মেলনে কথা উঠল মার্শের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ-সমালোচনা নিয়ে। সংবাদ মাধ্যমেই কেবল নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অনুসারীদের কাছেও তিনি ‘খলনায়ক।’ সেদিন মার্শ হেসে বলেছিলেন, “আমি জানি, অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ মানুষ আমাকে পছন্দ করে না। আশা করি, একদিন আমি তাদের মন জয় করে নেব।”

মার্শের সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি অবশেষে এসে গেল।

তার নিজের শহর পার্থ থেকে ৯ হাজার কিলোমিটার দূরে, যে শহরের মাঠে একদিন দুয়ো শুনেছিলেন, সেই মেলবোর্ন থেকে সাড়ে ১১ হাজার কিলোমিটার দূরে, দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে জাদুকরি দেড় ঘন্টায় মার্শ নিশ্চিত করে ফেললেন, এবার তিনি অস্ট্রেলিয়ানদের চোখের মণি হবেন।

বিশ্বকাপ ফাইনালে ৫০ বলে ৭৭ রানের অপরাজিত ইনিংস, ২০ ওভারের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বিশ্ব শিরোপার কারিগরদের একজন এবং ফাইনালের ম্যান অব দা ম্যাচ। মার্শকে এখন ভালোবাসতেই হবে।

অনেক পথ পেরিয়ে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক অনেক প্রতীক্ষার পর তবেই এলো এই দিন। দীর্ঘ এই পরিভ্রমণে পথচ্যুত হয়েছেন তিনি অনেকবার।

যদিও এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। নামেরও তো একটা ওজন আছে! অস্ট্রেলিয়ার মার্শ পরিবারের সন্তান বলে কথা। অস্ট্রেলিয়ার এক সময়ের সেরা ওপেনার ও ব্যাটিং ভরসা, খেলোয়াড় হিসেবে যিনি জিতেছেন ১৯৮৭ বিশ্বকাপ আর কোচ হিসেবে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ, সেই জেফ মার্শের ছেলে তিনি। শন মার্শের তিনি ছোট ভাই। পারিবারিক পরিচয়ই তাকে ঠিক পথে রাখার কথা। কিন্তু তা হয়নি সবসময়।

ছেলেবেলা থেকেই তিনি তুমুল প্রতিভাবান। একসময় অবশ্য অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলও খেলেছেন। রাজ্যের বয়সভিত্তিক দলেও খেলেছেন। তবে মার্শ পরিবার থেকে ক্রিকেটেই থিতু হওয়াটা ছিল অবধারিত। ২০১০ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া।

তখন থেকেই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ধরে নিয়েছিল, দুর্দান্ত এক অলরাউন্ডার উঠে আসছে। খ্যাতিমান কোচ মিকি আর্থার একবার ঘোষণা করলেন, জ্যাক ক্যালিসের মতো অলরাউন্ডার হওয়ার সামর্থ্য আছে মার্শের। প্রত্যাশাগুলোও বলে দিচ্ছিল তার প্রতিভা কেমন।

কিন্তু ক্রিকেট মাঠের বাইরেও আরও অনেক দিকে তার প্রতিভা প্রকাশিত হতে থাকে। তার অ্যালকোহল আসক্তির কথা ক্রমেই প্রকাশ্য হতে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার অব এক্সিলেন্সে থাকার সময় নেশায় চুর হয়ে সকালে অনুশীলনে যাওয়ায় বহিষ্কার করা হয় তাকে। বয়স তখন মোটে ২০। ২১তম জন্মদিনে বড় ভাই শন মার্শ ও রাজ্য দলের সতীর্থদের নিয়ে রাতভর পার্টি করে আবার খবরের শিরোণামে আসেন। শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে শাস্তি পেতে হয় তখনও। এমনকি ক্রিকেট ক্যারিয়ারই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় তখন।

চোট-আঘাতও তার সঙ্গী থাকে সেই সময় থেকেই। ফিটনেস নিয়ে খুব সচেতন ছিলেন না। তাই একের পর এক ইনজুরি আসতেই তাকে। ক্যারিয়ারে কতবার চোটের কারণে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছে, মার্শ নিজেও বুঝি বলতে পারবেন না তা।

এসবের ফাঁকে ক্রিকেট মাঠে নামলেই দেখাতেন তার প্রতিভার ঝলক। দারুণ সম্ভাবনাময় হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়ে যায় ২০১১ সালেই। মাঠে তাকে যথেষ্ট পরিণত বলেও মনে হতো। সেই ২০১৪ সালেই তাকে অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে রায় দিয়ে দেন সেই সময়কার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। কিন্তু পারফরম্যান্সে ধরে রাখতে পারেননি তিনি ধারাবাহিকতা।

দলে আসা-যাওয়া চলছিল। ক্রিকেট ক্যারিয়ার বারবার পথ হারিয়ে আবার পথে ফিরছিল। ২০১৭ সালে কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার বলেন, মার্শকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে দেখেন। ২০১৮ সালে তাকে যৌথভাবে সহ-অধিনায়ক করা হয় টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দলের। কিন্তু ফর্ম হারিয়ে দলে জায়গাও হারান।

এর মধ্যে মাঠে কাগিসো রাবাদার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে জরিমানা গুনতে বাধ্য হন। ভারতের বিপক্ষে মেলবোর্ন টেস্টে তাকে দুয়ো দেয় স্থানীয় দর্শকেরা। নেতৃত্ব পাওয়া তো বহুদূর, ফর্ম হারিয়ে দলে জায়গাও হারান।

পরে আবার দলে ফেরেন। ভালো পারফর্ম করে জায়গা পাকা করার আভাস দেন। এরপর আবার বিপত্তি। এবার ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচে আউট হওয়ার পর ড্রেসিং রমে ফিরে হতাশায় দেয়ালে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলেন নিজের হাত। ল্যাঙ্গার তখন তাকে বলেন, ‘ইডিয়ট।’

বিগ ব্যাশের ম্যাচে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে আউট হওয়ার পর যেভাবে ‘নো’ বলে চিৎকার করেন এবং গালিগালাজ করতে করতে মাঠ ছাড়েন, সেরকম কিছু মাঠে দেখা যা কম সময়ই।

তিন সংস্করণেই অনেক সুযোগ পেয়ে ততটা কাজে লাগাতে না পারা, অসংখ্য চোট-আঘাত, খুব কাছের বন্ধুর মৃত্যুতে মানসিক আঘাত, ফিটনেস ও চোটের কারণেও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হওয়া, সব মিলিয়ে একটা সময় ভয়ঙ্কর সময় আসে তার জীবনে। নিজেকে হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয় তার। ক্রিকেট অনুসারীদের কাছেও তাই ভাবমূর্তি গিয়ে ঠেকে তলানিতে।

তার নিজেরও সেই উপলব্ধি হয়। ২০১৯ অ্যাশজের সময় ‘একদিন মন জয় করতে চাওয়ার’ সেই কথাটি হয়তো ছিল তার ভেতরের তাড়নাই।

অবশেষে সেই দিনটি এলো। ধারাবাহিত হতে পারলেও পারফর্ম করেছেন তিনি নানা সময়ই। তবে দেশবাসীর মন জয় করতে তো সেরকম উপলক্ষ্যও লাগে! এই বিশ্বকাপ যেমন।

এবছর টি-টোয়েন্টিতে তার নতুন রূপে যাত্রার শুরু গত জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে। মূল ব্যাটসম্যানদের কয়েকজন না থাকায় তিন নম্বরে খেলার সুযোগ দেওয়া হয় তাকে। তিনি তা লুফে নেন দুহাতে। পাঁচ ম্যাচের ওই সিরিজে করেন তিনটি ফিফটি। পরে বাংলাদেশ সফরে ভীষণ ব্যাটিং দুরূহ উইকেটে তিনি ছিলেন দুই দল মিলিয়ে অনেকটা ব্যবধানে এগিয়ে থেকে সিরিজের সর্বোচ্চ রান স্কোরার।

এরপর বিশ্বকাপে অবশ্য শুরুটা ভালো করতে পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১১ করে আউট হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একাদশে জায়গাও হারান। তবে দল হারায় পরের ম্যাচেই তাকে ফেরানো হয়। আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচে করেন ঝড়ো ফিফটি। সেমি-ফাইনালে দল শুরুতে উইকেট হারানোর পর ধাক্কা সামাল দেন তিনি ডেভিড ওয়ার্নারের সঙ্গে জুটিতে। আর ফাইনালে তো তিনিই সেরা। দলকে জিতিয়ে তবেই মাঠ ছাড়েন নায়কের বেশে।

এমন মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরতে পারলেই না লোকের মনে ঠাঁই পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট, বিশ্বক্রিকেটেও নিজের নাম খোদাই করা যায়। মার্শ পারলেন। অবশেষে।