খোলস ছেড়ে বেরিয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দর তামিম

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে ছয় মাসের বিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই নির্ভার করে তুলল তামিম ইকবালকে? তার ব্যাটিং তো এমন ভাবনার পক্ষেই স্বাক্ষী দিচ্ছে! বিপিএলে এবার প্রথম দুই ম্যাচে ফিফটি করলেও ইনিংস গড়া আর শেষ হওয়া, সবই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। পরের দুই ম্যাচে তো শুরুতেই শেষ। সেই তামিম বিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরদিনই পুরো ভিন্ন চেহারায়!

যে তামিম আত্মবিশ্বাসী। যার ব্যাটের দাপটে রানের স্রোত তীব্রবেগে ছোটে তো বটেই, সেই জোয়ারে ভেসে যায় প্রতিপক্ষের মনোবলও। সেই তামিম, যিনি জানেন বড় রান তাড়ায় কীভাবে দায়িত্ব আর আগ্রাসনের মিশেলে গড়ে তুলতে হয় ইনিংস।

১৭ চার ও ৪ ছক্কায় ৬৪ বলে ১১১ রানের ইনিংসটি অনেককে ফিরিয়ে নিয়েছে পুরনো দিনে, অনেককে ডুবিয়েছে রোমাঞ্চে, অনেককে ভাসিয়েছে ভালোলাগায়। বিপিএলে বৃহস্পতিবার সিলেট সানরাইজার্সের বিপক্ষে মিনিস্টার ঢাকার হয়ে তামিমের ইনিংসটির মাহাত্মই এমন।

বিপিএলে বাংলাদেশের সফলতম ব‍্যাটসম‍্যান তিনি। এই ইনিংসের পর টুর্নামেন্টে স্থানীয়দের মধ‍্যে একমাত্র তারই আছে একাধিক সেঞ্চুরি। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতেও বাংলাদেশের ব‍্যাটসম‍্যানদের মধ‍্যে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি তামিমের। অন‍্যদের যেখানে দুটির বেশি নেই, সেখানে তার সেঞ্চুরি চারটি। রেকর্ডের আরও অনেক পাতায় তার নাম।

এরপরও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তামিমের ব‍্যাটিং নিয়ে হয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে তার স্ট্রাইক রেট, ইনিংসের গতি সবসময়ই আতশ কাঁচের নিচে। প্রতিটি সংবাদ সম্মলেন অবধারিতভাবে আসত এই প্রসঙ্গ, তোলা হতো কাঠগড়ায়। ত‍্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এক সময়ে এই প্রসঙ্গে কোনো প্রশ্ন করতেই তিনি মানা করেছিলেন।

ক‍্যারিয়ারের শুরুতে তামিম ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে আগ্রাসী ব‍্যাটসম‍্যানদের একজন। যিনি মাঠে নামতেন বোলিং গুঁড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে হয়ে ওঠেন পরিণত। সেই সঙ্গে বদলাতে থাকে তার ব‍্যাটিংয়ের ধরন।  কন্ডিশন, প্রতিপক্ষ কিংবা পরিস্থিতি বুঝে সেই অনুযায়ী ব‍্যাটিং করে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ভরসা। শটের পরিধি বাড়লেও কমতে থাকে ব্যবহার। কখনও কখনও নিজেকে গুটিয়ে রাখেন, সময় নিয়ে পরে চড়াও হন বোলাদের ওপর।

এই তামিমের ডট বল নিয়ে হয় প্রচুর চর্চা। কখনও কখনও সেসবের পক্ষে থাকে যুক্তি, কখনও হয় বাড়াবাড়ি। এই বিপিএলেও যেমন আলোচনায় ছিল তার ব্যাটিংয়ের গতি। মিরপুরে খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে ৪২ বলে করেন ৫০, চট্টগ্রাম চ‍্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে ৪৫ বলে ৫২। 

পরের দুই ম‍্যাচে অবশ‍্য থিতুই হতে পারেননি। গা ঝাড়া দেওয়ার জন‍্য তিনি বেছে নিলেন আপন আঙিনা। নিজ শহরে যেন অনেকটাই দেখা গেল পুরান তামিমকে।

বড় রান তাড়ায় তামিমের শরীরীভাষাতেও বোঝা যাচ্ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। চট্টগ্রামের এই মাঠ তার চিরচেনা। ভালো করেই জানেন, ক্রিজে থাকলে এখানে যে কোনো লক্ষ‍্যই তাড়া করা সম্ভব। ম‍্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও বললেন সেই কথা।

“লক্ষ‍্য ২২০ রান হলেও হয়ত আমরা জিততে পারতাম। আমি জানতাম, যদি আমরা ভালো শুরু করি, আমাদের খুব ভালো সুযোগ আছে। সৌভাগ‍্যবশত আমি ও শাহজাদ অসাধারণ একটি শুরু পাই। আর এরপর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।”

স্বীকৃত ক্রিকেটে প্রায় ছয়শ ম‍্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকা তামিম জানেন, ১২০ বলের ক্রিকেটেও প্রতিটি বলই মারতে নেই। এখানেও চাইলে সময় নেওয়া যায়। তিনি নিজে সফল হয়েছেন সেভাবে। এক-দুই রান নিয়ে প্রান্ত বদল করে খেলেছন। নিজের জোনে পেলে মেরেছেন বাউন্ডারি।

চট্টগ্রামেও নিজেকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। নিজের জোনে বল পেলেই কেবল মেরেছেন। খুব একটা জোর করে মারতে দেখা গেছে কমই। অন‍্য প্রান্তে বরং মোহাম্মদ শাহজাদকে দেখা গেছে বানিয়ে কিছু শট খেলতে।

আপন আলোয় উদ্ভাসিত তামিম তরুণদের দিলেন নিজের মতো করে খেলে যাওয়ার পরামর্শ। বললেন, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও চাইলে সময় নেওয়া যায়।

“নিজের স্কিল নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়া উচিত। যদি কোনো দুর্বলতা থাকে সেটা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করা উচিত। ক্রিকেটিং শটই খেলা উচিত। টি-টোয়েন্টি এমন ক্রিকেট নয় যে, প্রতিটি বলেই মারার চেষ্টা করতে হবে। নিজেকে শেপে রেখে ক্রিকেটিং শট খেলা উচিত। তাহলে এই সংস্করণেও সফল হওয়া যাবে।”

ভালো বল যেমন সমীহ করেছেন, বাজে বলের ফায়দা লুটেছেন তামিম। এই ইনিংস হয়তো একটি বার্তাই দিল, এখনও তিনি ফিরতে পারেন পুরান চেহারায়।