মুজিব-মেহেদি রানার দারুণ বোলিংয়ে সাকিবদের জয়

ওপেনিংয়ে ফিরে ক্রিস গেইলের ঝলকের পরও লক্ষ‍্যটা নাগালেই রাখতে পেরেছিলেন থিসারা পেরেরা, মেহেদি হাসানরা। তবে বোলিংয়ে তাদেরও যেন ছাড়িয়ে গেলেন মুজিব উর রহমান, মেহেদি হাসান রানারা। তাদের নৈপুণ‍্যে প্রিমিয়ার ব‍্যাংক খুলনা টাইগার্সকে হারাল ফরচুন বরিশাল।

জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে শনিবারের প্রথম ম‍্যাচে ১৭ রানে জিতেছে সাকিব আল হাসানের বরিশাল।

আগের দিনের দ্বিতীয় ম‍্যাচে তামিম ইকবাল বলেছিলেন, এখানে ২২০ রানের লক্ষ‍্যও তাড়া করে জেতা সম্ভব। দিনের প্রথম ম‍্যাচে রানটা একটু কমই হয়। তবু ১৪১ রানের লক্ষ্য কঠিন হওয়ার কথা নয় খুব বেশি। কিন্তু সেটাই খুলনার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায় বাঁহাতি পেসার মেহেদি হাসান রানা ও রহস‍্য স্পিনার মুজিবের বোলিংয়ে।

ইনিংসের প্রথম ওভারে জোড়া উইকেট নিয়ে খুলনাকে নাড়িয়ে দেন মুজিব। ১৯তম ওভারে তিন উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষকে ১২৪ রানে থামিয়ে দেন রানা। 

ওই ওভারের আগ পর্যন্ত ম্যাচ ছিল দোদুল্যমান। শেষ দুই ওভারে খুলনার প্রয়োজন ছিল ২১ রান, উইকেট ছিল ৩টি। তখনও ক্রিজে মুশফিকুর রহিম। কিন্তু এক ওভারে স্রেফ ৩ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়ে বরিশালকে জিতিয়ে দেন রানা। শেষ উইকেটটি ছিল খুলনার শেষ ভরসা মুশফিকেরই।

ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ১৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা মেহেদি রানা। গত বিপিএলে বড় চমক ছিল তার বোলিং। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে শুরুতে জায়গা না পেলেও পরে নেমেই দারুণ বোলিং করে ১০ ম্যাচে নেন ১৮ উইকেট। সেবারও চট্টগ্রামে নিজের প্রথম ম্যাচে নিয়েছিলেন ২৩ রানে ৪ উইকেট, এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত যা ছিল তার সেরা বোলিং। 

বাঁহাতি এই পেসারের শেষের চমক জাগানো বোলিংয়ের মতো ম‍্যাচের শুরুতেও চমক দেখায় বরিশাল। বিস্ময় জাগিয়ে শুরুতেই নামিয়ে দেয় জেইক লিন্টটকে। এই চায়নাম্যান বোলারের ব্যাটিং সামর্থ্য খুব পরিচিত নয়। গত টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে এক ম্যাচে ২০ বলে ৪১ করলেও ক্যারিয়ারের ৩৯ টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে রান ছিল আর ৫২। তাকেই এবার ওপেনিংয়ে নামিয়ে দেয় বরিশাল।

ম্যাচ সেরা মেহেদি হাসান রানার উল্লাস। ছবি: সুমন বাবু।

আগের দুই ম‍্যাচে পাঁচে খেলা ক্রিস গেইলও এবার ফেরেন ওপেনিংয়ে। প্রিয় পজিশনে ফিরে ব‍্যাটিংয়ে কিছুটা ঝলক দেখান ক‍্যারিবিয়ান মহাতারকা।

টস হেরে ব‍্যাটিংয়ে নেমে কামরুল ইসলাম রাব্বির প্রথম বলে লিন্টট নেন সিঙ্গেল। পরের বলটি যেন দেখলেন গেইল। বুঝে নিলেন উইকেটে কীভাবে আসছে বল। এরপর তিন বলে তার ব‍্যাট থেকে আসে তিনটি বাউন্ডারি। মাঝেরটি ঠিক মতো খেলতে পারেননি, ব‍্যাটের কানায় লেগে কিপার ও স্লিপের মাঝখান দিয়ে যায় বাউন্ডারি। বাকি দুটি বাউন্ডারি আসে চমৎকার শটে।

কোভিড থেকে সেরে ওঠা অফ স্পিনার শরিফউল্লাহকে টানা দুই চার মেরে স্বাগত জানান লিন্টট। পরের বলে বেরিয়ে গিয়ে চড়াও হতে গিয়ে ফেরেন বোল্ড হয়ে (৬ বলে ১১)।

পরে শরিফউল্লাহর ওভারেই দুটি চার মারেন গেইল। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে ছক্কায় ওড়ান মেহেদিকে। অফ স্পিনার মেহেদির বলে সেটাই একমাত্র বাউন্ডারি।

আগের ম‍্যাচে স্লোয়ারে বেশ ভুগিয়েছিলেন থিসারা। গেইল যেন জানতেন কূ আসছে, সেভাবেই অপেক্ষায় ছিলেন। সঠিক উচ্চতায় একটি স্লোয়ার পেয়ে পুল করে মিডউইকেট দিয়ে ওড়ান ছক্কায়। থিসারার চার ওভারে বাউন্ডারি ওই একটিই।

ব্যাটিং অর্ডারে ওলট-পালট করা বরিশাল তিনে তুলে আনে জিয়াউর রহমানকে। কিন্তু শুরুতে তিনি ছন্দ পাচ্ছিলেন না। প্রথম ১১ বলে চার করা ব্যাটসম্যান গা ঝাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন একটি ছক্কা মেরে। কিন্তু কামরুলের পরের বলেই মেহেদিকে ক‍্যাচ দিয়ে শেষ হয় তার পথ চলা।

এরপর বরিশাল বড় ধাক্কা খায় গেইলকে হারিয়ে। সিকুগে প্রসন্নর শর্ট বলে লং অন দিয়ে চার মেরে পরের বলে ছক্কার চেষ্টায় ‘ইউনিভার্স বস’ ধরা পড়েন সৌম‍্য সরকারের হাতে। 

ব‍্যাটিং অর্ডারে সব সময় ক্রিজে ডানহাতি-বামহাতি কম্বিনেশন রাখতে চেয়েছে বরিশাল। সেটা খুব একটা কাজে লাগেনি। প্রমোশন পেলেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি নুরুল হাসান সোহান। অনেকটা সময় ক্রিজে থাকলেও ইনিংসকে গতি দিতে পারেননি তৌহিদ হৃদয়।

আগের তিন ম্যাচে তিনে খেলে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা সাকিব এবার নামেন সাতে। ডট দিয়ে শুরেু করে পরের দুই বলেই তিনি মারেন চার। কিন্তু এরপরই শেষ!

থিসারার স্লোয়ারের জন‍্য যদিও প্রস্তুতই ছিলেন তিনি। নিচু ফুলটস বল পেয়ে গায়ের জোরে মারেন মিড-উইকেট দিয়ে। খুব একটা টাইমিং হয়নি, সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত এক ক‍্যাচ মুঠোয় জমান আন্দ্রে ফ্লেচার।

এক বল পর আরেক স্লোয়ার বলে গায়ের জোরে স্লগ করার চেষ্টায় বোল্ড হয়ে থামেন শান্ত।  এরপর খুব একটা এগোয়নি বরিশালের ইনিংস।

রান তাড়ায় শুরুতেই হোঁচট খায় খুলনা। চার বলের মধ‍্যে হারায় তারা আন্দ্রে ফ্লেচার ও সৌম‍্য সরকারকে।

মুজিবকে একটি চার মারার পর ছক্কার চেষ্টায় ক‍্যাচ দেন ছন্দে থাকা ফ্লেচার। আগের বলে ১ রান করা সৌম‍্য এবার পেলেন ‘গোল্ডেন ডাক।’ পা বাড়িয়ে খেলার বদলে মুজিবকে পেছনের পায়ে খেলার চেষ্টায় হন এলবিডব্লিউ।

দ্রুত রান তোলার আশায় চারে নামায় তারা মেহেদি হাসানকে। রনি তালুকদার ও মেহেদি চেষ্টা করেন রানের গতিতে দম দিতে। কিন্তু পারেননি তারা।

ওপেনিংয়ে ফিরে নিজের ঝলক কিছুটা দেখান ক্রিস গেইল। ছবি: সুমন বাবু।

লিন্টটের অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বল তাড়ায় কিপারের গ্লাভসে ধরা পড়েন রনি (১৬ বলে ১৪)। সাকিবকে ছক্কা মারার এক বল পর বেরিয়ে গিয়ে চড়াও হওয়ার চেষ্টায় স্টাম্পড হন মেহেদি ২৩ বলে ১৭)।

আগের ম‍্যাচে রান পাওয়া মুশফিক খেলছিলেন আস্থার সঙ্গে। ইয়াসির আলি চৌধুরিকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন অধিনায়ক। কিন্তু একটু বেশিই সময় নিয়ে ফেলেন তারা। ৪৬ রানের জুটি গড়তে খেলেন ৪০ বল।

রানের চাপ টের পাচ্ছিলেন ইয়াসির। বেরিয়ে এসে মেহেদি রানার উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টায় তিনি হন বোল্ড।

সময়ের দাবি ছিল বড় শট। থিসারা গিয়ে তা মেটাচ্ছিলেন ভালোভাবেই। প্রথম স্পেলে দুর্দান্ত বল করা মুজিবকে শেষ ওভারে চার-ছক্কার ধাক্কা দেন লঙ্কান এই অলরাউন্ডার। পরে যখন তিনি মাথার ওপর দিয়ে সীমানা ছাড়া করলেন শফিকুল ইসলামকে, ম্যাচে ফেবারিট তখন খুলনাই।

পরের বলেই আবার বদলে যায় চিত্র। শফিকুলের শর্ট বলে ছক্কার চেষ্টায় লিন্টটের দারুণ ক্যাচে পরিণত হয় থিসারা (৯ বলে ১৯)।

ঝড় তোলার মতো আরেক লঙ্কান তখন আসেন ক্রিজে। কিন্তু সেই ব্যাটসম্যান সিকুগে প্রসন্নকে জ্বলে উঠতে দেননি লিন্টট।

এরপর খুলনার ভরসা কেবল মুশফিক। প্রিয় স্লগ সুইপে লিন্টটকে ছক্কা মেরে কিছুটা আশাও জাগান তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাননি সতীর্থ কারও সহায়তা, পারেননি তিনি নিজেও।

১৯তম ওভারের প্রথম বলেই স্কয়ার লেগে শফিকুলের হাতে জীবন পান মুশফিক। পরের চার বলের মধ‍্যে দুই অলরাউন্ডার ফরহাদ রেজা ও শরিফউল্লাহকে বিদায় করেন মেহেদি। শেষ বলে স্কুপ করার চেষ্টায় কিপারের হাতে ধরা পড়েন মুশফিক (৩৬ বলে ৪০)।

মাঝারি পুঁজি নিয়েও ম্যাচ জিতে তখন খুশিতে ভাসছে বরিশাল।  

চার ম্যাচে দুই দলেরই এখন জয়-হার সমান দুটি করে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ফরচুন বরিশাল: ২০ ওভারে ১৪১/৯ (লিন্টট ১১, গেইল ৪৫, জিয়া ১০, সোহান ৮, শান্ত ১৯, হৃদয় ২৩, সাকিব ৯, শুক্কুর ২, মুজিব ৭, মেহেদি রানা ১*; কামরুল ৩-০-৩০-২, মেহেদি ৪-০-১৮-১, শরিফউল্লাহ ৩-০-২৭-১, থিসারা ৪-০-১৮-২, প্রসন্ন ৪-০২৮-১, ফরহাদ ২-০-১৮-২)

প্রিমিয়ার ব‍্যাংক খুলনা টাইগার্স: ১৯ ওভারে ১২৪ (ফ্লেচার ৪, সৌম‍্য ০, রনি ১৪, মেহেদি ১৭, মুশফিক ৪০, ইয়াসির ২৩, থিসারা ১৯, প্রসন্ন ২, ফরহাদ ০ শরিফউল্লাহ ১, কামরুল ; মুজিব ৪-০-২২-২, সাকিব ৪-০-৩০-১, সাকিব ৪-০-২৪-১, লিন্টট ৩-০-১৯-২, জিয়া ১-০-১১-০, মেহেদি রানা ৩-০-১৭-৪)।

ফল: ফরচুন বরিশাল ১৭ রানে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: মেহেদি হাসান রানা।