‘বাংলাদেশে আসলে অভিজ্ঞতার দাম নেই’

পরিসংখ্যানের দিক থেকে ক্যারিয়ারের মন্থরতম সেঞ্চুরি। ব্যাটিংয়ের ধরনের দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে স্থিতধী ইনিংস। ক্যারিয়ারে সবচেয়ে ধীরস্থির ও নিয়ন্ত্রিত ইনিংসটিই হয়তো চট্টগ্রাম টেস্টে খেললেন মুশফিকুর রহিম। তবে সেই তিনিই ঝড় তুললেন সংবাদ সম্মেলনে। মাইক্রোফোনের সামনে উগড়ে দিলেন ক্ষোভ, হতাশা, আক্ষেপ সবকিছুই।

মুশফিকের সংবাদ সম্মেলনের আগেই অবশ্য দেশের ক্রিকেট আঙিনায় আলোড়ন ফেলে দেন তার স্ত্রী। জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে বুধবার দ্বিতীয় সেশনে মুশফিক সেঞ্চুরি করার পর তার উদযাপনের একটি ছবি দিয়ে স্ত্রী ইনস্টাগ্রামে লিখেন, “আমরা হাসি মুখেই বিদায় নিবো ইনশাল্লাহ, তবে আপনাদের রিপ্লেসমেন্ট আছে তো? সেদিকেও একটু নজর দিলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়ন হতো।”

তার স্ত্রীর পোস্ট ধরেই সংবাদ সম্মেলনে মুশফিকের দিকে ছুটে যায় প্রশ্ন। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেই মাঠের ভেতরে-বাইরে নানা কারণে সমালোচনার মুখে আছেন মুশফিক। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে তুলাধুনা করা তো হচ্ছেই, এমনকি বোর্ড কর্তারা পর্যন্ত গত বিশ্বকাপ থেকে নানা সময়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রকাশ্যে নানা কিছু বলছেন।

চারপাশের এসবের প্রভাবেই কি পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত প্রকাশ্যে খোঁচা বা কথার লড়াইয়ে জড়াচ্ছেন? মুশফিক আক্ষেপটা সরাসরিই তুলে ধরে বললেন দায়িত্বশীলদের আরও পরিণত আচরণ করতে।

“আসলে মাঝে মাঝে একটু হলেও খারাপ লাগে। খেলোয়াড়রা হিসেবে এটা কাম্য নয়। বাংলাদেশেই আমি দেখেছি, একটা দিন সেঞ্চুরি করলে ব্র্যাডম্যানের চেয়েও বড় খেলোয়াড় হয়ে যায়। আবার ২-৩ ম্যাচে রান না করলে গর্ত করে গর্তের মধ্যে ঢুকে যেতে হয়। আমার মনে হয় এটা শুধু বাংলাদেশেই হয়।”

“জানি না এটা কাদের সমস্যা, কারা এটা বলে থাকে। তারা যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সাপোর্ট করে থাকেন, তারা যদি আরও পরিণত হতে পারেন তাহলে ক্রিকেটারদের জন্য আরও ভালো।

মুশফিকের মতে, সিনিয়র ক্রিকেটারদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুললে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনেও ভালো দৃষ্টান্ত হবে।

“আমরা তো সিনিয়র হতে পারি, আমরা তো আর খুব বেশি দিন খেলবও না। এটা একটা কালচারের ভেতর দিয়ে যায়। আমি মনে করি, জুনিয়র যারা আছে, আমরা যদি তাদের সাপোর্ট করি, তারা এখান থেকে আরও অনুপ্রাণিত হতে পারবে। কারন মাঠে আমাদের এত কিছু করতে হয়, এসবের সঙ্গে যদি মাঠের বাইরেও এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাহলে মাঠের কাজ করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।”

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চলতি চট্টগ্রাম টেস্টে সেঞ্চুরিটির পথে বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে ৫ হাজার রান স্পর্শ করেছেন মুশফিক। দেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ানও ছিলেন তিনিই। এখনও পর্যন্ত একাধিক ডাবল সেঞ্চুরির একমাত্র কৃতিত্ব তার। টেস্টে দলের সর্বোচ্চ ইনিংসও এসেছে তার ব্যাট থেকেই।

তবে দেশের ক্রিকেটে এরকম ছাপ রেখে যাওয়ার প্রশ্নে মুশফিকের উত্তরে ফুটে উঠল অভিমান।

“চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু নেই, সত্যি বলতে। বাংলাদেশে আসলে অভিজ্ঞতার দাম নেই। ১৭ বছর যে কাটিয়েছি এটাই অনেক বড় ব্যাপার। সামনে আল্লাহপাক আমার জন্য যা রেখেছে, ততটুক ভালোভাবে খেলতে চাই।”

তার ওসব প্রাপ্তি যে স্রেফ কপালগুণে পাওয়া নয়, অনেক ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে ধরা দিয়েছে, সেটিও তিনি বললেন বেশ একটু ক্ষোভের সুরে।

“এই যে কপালটা দেখছেন (ক্যাপ উঁচিয়ে কপাল দেখিয়ে), ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল, নিমাল মাওলা ওয়া নিমান নাসির’, আমি যখন উঠে অনুশীলন করি, তখন আপনাদের অনেকেই ঘুমিয়ে থাকেন। তো আল্লাহর রহমতে কিছুটা হলেও তো আল্লাহ দেখেন…।”