আড়ালের ছবিগুলো হৃদয় গহীনেই রাখছেন লিটন

অনুশীলনে নিজেকে ভেঙে গড়া। নেটে নিমগ্ন থাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানো। বিন্দু বিন্দু শ্রমের ফোঁটাগুলোই আজ ২২ গজে ফুটে উঠছে সাফল্যের ফুল হয়ে। নিজের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়া করে, অনেক লড়াই করে এই নন্দনকানন গড়ে তোলার পালা চলছে, বলছেন লিটন কুমার দাস। তবে চাষবাসের গল্প তিনি আড়ালেই রাখতে চান।

লিটন নিজের প্রতিভার জানান দিতে শুরু করেন বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে। দেশের ক্রিকেটে সাড়া জাগান তিনি ২০১৪-১৫ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিয়ে। জাতীয় দলে জায়গাও মেলে দ্রুত। শুরু হয় বাস্তবতার সঙ্গে তার কঠিন লড়াই।

একের পর এক ব্যর্থতা আসতে থাকে। তুমুল প্রতিভাবান হয়েও নিজেকে মেলে ধরতে না পারা আরও অনেকের সঙ্গে তার নামও যুক্ত হতে থাকে। দলে আসা-যাওয়ার পালাও চলতে থাকে। মেঘে মেঘে গড়িয়ে যায় বেলা। তাকে ঘিরে হতাশাও বাড়তে থাকে।

সেই দুঃসহ সময়টা পেছনে ফেলে তিনিই এখন দলের আশা-ভরসার জায়গা। গড় দেড় বছরে টেস্টে দলের সফলতম ব্যাটসম্যান তিনি, তার ধারেকাছে নেই কেউ। ক্যারিয়ারের প্রথম ২৫ টেস্টে তার ছিল না কোনো সেঞ্চুরি। এখন ৮ টেস্টের মধ্যে তিনটি সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন ভিন্ন প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভিন্ন মাঠে।

ওয়ানডেতে ঠিক এক বছর আগে গত মে মাসে দেশের এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার পর বাদ পড়েছিলেন তৃতীয় ম্যাচে। দলে ফেরার পর ৯ ইনিংসে তার সেঞ্চুরি দুটি, ফিফটি দুটি। আরও দুই ইনিংসে রান আছে ৩২ ও ৪৮।

টি-টোয়েন্টিতে গত বছর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন টানা। খেসারত দিতে হয়েছে দলে জায়গা হারিয়ে। গত মার্চে ফিরেছেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে। ফিরেই প্রথম ম্যাচে করেন ৪৪ বলে ৬০।

পারফরম্যান্সে যেমন দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিকতা, তেমনি ব্যাটিংয়েও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। উইকেটে তার বিচরণে ঠিকরে বেরোয় আত্মবিশ্বাস।

এই পরিবর্তনের পেছনের গল্প তো পুরোপুরি জানা গেল না। উইকেটে ব্যাট হাতে তিনি যতটা খোলতাই, মাইক্রোফোনের সামনে ততটাই অন্তর্মুখী। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ১৪১ রানের ইনিংসের পর দ্বিতীয় দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে স্রেফ ছোট্ট করে বললেন, “আপনারা ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার কাছে মনে হয়, আমার অনুশীলনের মেথড বদলেছে।”

বদলটা কোন ধরনের, সেই রহস্যের গভীরে যাওয়া বহুদূর, দুয়ারটাই তিনি খুললেন না।

“কীভাবে বিশ্লেষণ দেব এটা এখন আমি…মানে, আমি এখন কীভাবে বিশ্লেষণ দেব যে কি বদল হয়েছে, আমি এটা বিশ্লেষণ দিতেও পারব না।”

“খুব কঠিন এটা বলা… কী কী করি বা কী বদলেছে। আমার কাছে মনে হয়, প্র্যাকটিসের মেথড বদলেছে, তা বলতে পারি। তবে কী কী বদলেছে, তা বলতে পারব না যে কীভবে সফল হলাম বা কেন হচ্ছি, এই জিনিসটা আমার ভেতরেই থাক।”

একটা পরিবর্তন খুব ভালোভাবেই নজর কাড়ছে সবার। আগে উইকেটে গিয়ে ছটফট করতেন। কিংবা থিতু হলেও অনেক সময় তাড়াহুড়ো থাকত তার ব্যাটিংয়ে। অনেক সময়ই অতি রোমাঞ্চপ্রিয় হতে গিয়ে হারাতেন উইকেট। এখন তিনি আর সেই চঞ্চলা হরিণী নন। এই লিটন উইকেটের মূল্য বোঝেন। বড় ইনিংস গড়ার রসায়ন জানেন।

এখানে তিনি খানিকটা কৃতিত্ব দিলেন বাংলাদেশের সাবেক ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্সকে।

“অবশ্যই আমি এখন বুঝি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধরনটা কেমন। কতক্ষণ ধরে ব্যাটিং করলে রানগুলো বড় হবে। আমার মনে হয়, সে (প্রিন্স) জিনিসগুলো আমাকে বুঝিয়েছিল, তা অনেকটাই আমার জন্য কাজের এবং আমি ওই জিনিসটাই অনুসরণ করি এখনও পর্যন্ত।”

নিজের খেলা তিনি এখন কতটা বোঝেন, সেটির আরেকটি প্রমাণ মিরপুর টেস্টের সেঞ্চুরিটি। ইনিংসজুড়ে তিনি পুল শট খেলেছেন দারুণ। তবে একবার ভুল করে ফেলেছিলেন। লঙ্কান পেসার আসিথা ফার্নান্দো তাকে শর্ট বলে কাবু করার কৌশল নিয়েছিলেন। তাতে কাজও হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। একটি শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ঠিকমতো টাইমিং করতে পারেননি, বল উঠে যায় ওপরে। তবে ক্যাচ নিতে পারেননি বদলি ফিল্ডার কামিন্দু মেন্ডিস।

ওই ওভারেই আসিথা শর্ট বল দেন আরও দুটি। আগের লিটন আবারও পুল খেলেন, দুটিতেই দারুণ টাইমিংয়ে বল পাঠিয়ে দেন বাউন্ডারিতে। নিজেকে জানা থেকেই এই বিশ্বাসটা এসেছে, বললেন লিটন।

“প্রতিটি খেলোয়াড়ের একেকরকম শট থাকে। আমার কাছে মনে হয়, গত এক দেড় বছর ধরে ভালোই পুল শট খেলছি। নিয়ন্ত্রণ আমার আছে (এই শটে)। আমার তাই বিশ্বাস ছিল যে, সে শর্ট বল করলেও এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারব, স্কোর করতে পারব। আত্মবিশ্বাস ছিল বলেই আমি (পুল) খেলা চালিয়ে গেছি।”

চালিয়ে গেছেন, সফলও হয়েছে। সফল হয়েই চলেছেন। পেছনের গল্পগুলি আড়ালে রাখলেই বা কী আসে যায়, দৃশ্যমান ছবিগুলি তো ভরিয়ে দিচ্ছে চোখ আর মন!