সোনার বড় চালান ধরার পর বাড়ছে ঘোষণা দিয়ে আনা

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সোনার দুটি বড় চালান ধরা পড়ার পর ঘোষণা দিয়ে সোনার বার আনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোষণা দিয়ে সোনার বার আনার এই প্রবণতা বাড়লে চোরাচালান কমার পাশাপাশি বাড়বে রাজস্ব আয়ও।  

তবে স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এটা পাচারকারীদের নতুন কৌশলও হতে পারে। এ ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে প্রায় তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১৬ জুন থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রুটের বিমান চলাচল শুরু হয়।

শুরুতে মহামারীর কারণে আটকে পড়া লোকজনই বেশিরভাগ দেশে ফেরেন। এরপর নিয়মিত যাত্রীরা ফিরতে শুরু করেন।

মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিমানেই ধরা পড়ছে সোনার বারের বড় চালান।

বাড়ছে ঘোষণা দিয়ে আমদানি

১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুবাইফেরত এনামুল কবির (৩৫) আটক হন ৮২টি সোনার বারসহ। কক্সবাজারে বাসিন্দা এনামুল ফিরছিলেন বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে।

এরপর ১৫ অক্টোবর আরেক বৃহস্পতিবারে দুবাই ফেরত বাংলাদেশ বিমানের আরেকটি ফ্লাইটের তিনটি আসনে নিচে আটটি প্যাকেটে ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করে কাস্টমস কর্মকর্তারা। তবে সেদিন কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

শনি, মঙ্গল ও বৃহস্পতি সপ্তাহের এই তিন দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৮৭ মডেলের ড্রিম লাইনার বিমান চট্টগ্রামে আসে। যে বিমানের ধারণ ক্ষমতা প্রায় তিনশ জনের মতো।

এছাড়া ওমানের মাস্কাট থেকেও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বিমান চলাচল করে সপ্তাহে তিনদিন।

তবে সম্প্রতি ধরা পড়া চালানগুলোর বেশির ভাগই দুবাই থেকে আসা বিমানের ভিতর ও বিমানের যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া।

বিমানবন্দর কাস্টমসের হিসেব অনুসারে, ১৫ অক্টোবরই শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তিনটি বিমানে ঘোষণা দিয়ে যাত্রীরা আনেন ১২০টি সোনার বার।

এর আগে ১৩ অক্টোবর ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল ৮৮টি সোনার বার।

অবৈধ দুটি চালান ধরার পর ১৭ অক্টোবর শনিবার ঘোষণা দিয়ে যাত্রীরা আনে ১১০টি সোনার বার।

মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়ে আনা হয় ১৬০টি সোনার বার, যা ১৩ অক্টোবরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

চলতি মাসের ২০দিনে ঘোষণা দিয়ে এই বিমানবন্দরে আসা যাত্রীরা মোট ৫১০টি সোনার বার এনেছেন। যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি (২৭০টি) এসেছে চলতি সপ্তাহের দুদিনে।

এসব বারের ওজন প্রায় সাড়ে ৫৯ কেজি। ১১৭ গ্রামের প্রতিটি বারে ২০ হাজার টাকা করে সরকার শুল্ক পেয়েছে প্রায় এক কোটি দুই লাখ টাকা।

এছাড়া চলতি মাসে অবৈধভাবে আনা প্রায় ২৫০টি সোনার বার ধরা পড়েছে যার ওজন ২৯ কেজি।

বিমানবন্দরে কর্মরত চট্টগ্রাম কাস্টমসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মনোয়ার মোরসালিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৈধ উপায়ে একজন যাত্রী সর্বোচ্চ দুটি সোনার বার আনতে পারেন। কেউ শুল্ক দিয়ে সোনা আনলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ে। তাতে কোনো আইনগত বাধাও নেই।”

চট্টগ্রামে দুবাই ফেরত যাত্রীর কাছ থেকে ৮২ সোনার বার উদ্ধার

চট্টগ্রামে বিমানের আসনের নিচে মিললো ১৬০ সোনার বার  

সোনা আসছে, যাচ্ছে কোথায়

করোনাভাইরাস সঙ্কটে বিমান চলাচল বন্ধ থাকার সময় বিমানবন্দর দিয়ে বৈধ বা অবৈধ কোনো সোনাই দেশে আসেনি।

এরমধ্যে কয়েকদফায় বেড়েছে সোনার দাম। করোনার আগে ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি সোনার ভরি এখন ৭৬ হাজার টাকার (২২ ক্যারেট) উপরে।

চট্টগ্রাম জুয়েলারি সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৈধ পথে ঘোষণা দিয়ে আনা হলেও এসব সোনার বারের বেশিরভাগই দেশের বাজারে থাকে না। তাই এই উপায়ে সোনা আনাটা চোরাচালানিদের একটি কৌশল হতে পারে।

“তাই যারা ঘোষণা দিয়ে সোনার বার আনছে তাদেরও ভালোভাবে তল্লাশি করা উচিত।”

তাহলে বিমানবন্দর দিয়ে আসা এসব সোনার বার কোথায় যায়- জানতে চাইলে ওই স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন, “স্থানীয় বাজারে এসব সোনা খুব কমই আমরা পাই। এটা ট্রানজিট কান্ট্রি। পার্শ্ববর্তী দেশে বিভিন্ন পথে এসব সোনা চলে যায়, যা মাদকসহ বিভিন্ন পণ্যের বিনিময় মূল্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।”

২০১৯ সালের ৩ মার্চ নগরীর সিআরবি এলাকায় ১০০টি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের সোনারপাহাড় এলাকায় ঢাকামুখী একটি জিপ থেকে ৬০০টি সোনার বার উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

চোরাচালানে জড়িতরা অধরা

আকাশপথে সোনা চোরাচালান চক্রের হোতা এবং জড়িতরা অধরাই থাকে।

১৫ অক্টোবরের অভিযানে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তা মনোয়ার মোরসালিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেদিন সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর আমরা বিমানে তল্লাশি চালাতে উঠি। তখন ক্যাটারিং সার্ভিসের লোকজন ও দুয়েকজন ক্লিনার বিমানে ছিল।

“যেভাবে বসার সিটের লেদার কভারের নিচে বেশ কয়েক সারি পরপর (আসন নম্বর- ১৪ই, ২৯ বি ও ৩৩ এ) কালো পলিথিনে মোড়ানো সোনার বারগুলো রাখা ছিল, তা কারও জানা না থাকলে খুঁজে বের করতে অনেক সময় লাগবে।”

তিনি বলেন, এসব বিভাগের কর্মীরা নেমে আসার সময় খাবারের ক্যাবিনেটে বা ময়লার প্যাকেটে করে সোনার বার নামিয়ে নিয়ে আসা সম্ভবপর।

“তাই এ বিষয়গুলো জানতে, জড়িতদের চিহ্নিত করতে আমরা পতেঙ্গা থানায় সোমবার একটি মামলা করেছি। আমাদের অনুসন্ধানও অব্যাহত আছে।”

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপক মীর আখতারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

শাহ আমানত বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার ফরহাদ হোসেন খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দুটি চালানের একটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। অন্যটিতে একজন আটক আছে।

“কাস্টমস আইনে মামলা হওয়ার পর পুলিশ এসব বিষয়ে তদন্ত করছে। এখনো এ বিষয়ে আমাদের কোনো ফাইন্ডিংস নেই।”

১ অক্টোবর ৮২টি বারসহ একজন গ্রেপ্তারের ঘটনায় হওয়া মামলাটির তদন্তভার এখন সিআইডির হাতে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার শাহনেওয়ার খালেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসামিকে আমরা রিমান্ডে এনেছি। জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখন তা বলা যাবে না।”

১৫ অক্টোবর ১৬০টি সোনার বার উদ্ধারের ঘটনায় থানায় করা মামলার বিষয়ে পতেঙ্গা থানার ওসি জোবায়ের সৈয়দ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মাত্র তদন্ত শুরু করেছি।