পুনর্বাসন ছাড়া লালদিয়ার চর ‘ছাড়বেন না’ বাসিন্দারা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শিগগির উচ্ছেদের উদ্যোগের মধ্যে লালদিয়ার চরের বাসিন্দারা পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীরা সরকার বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না করলে ওই ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, এখানে ভাড়াটিয়ারা থাকে। যৌথ সার্ভে করলে সেটার উত্তর বের হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আদালতের প্রতিনিধিসহ থেকে সার্ভে করা হোক।

“এখানে যদি আদি বাসিন্দাদের বাইরে কেউ এসে থাকে তাহলে তা বের হবে। ২০১৪ সালে লালদিয়ার চরের সি ব্লকে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল করতে বন্দর উদ্যোগ নিয়ে তাদের সাথে যৌথ সার্ভে করা হয়। সেখানে ৪৫২ জনকে বন্দরই চিহ্নিত করেছিল। আমরা বলেছিলাম ৪৮২ জন। অল্প পার্থক্য। সেটা শুধু সি ব্লকে। এ ব্লকে ১৭০০ পরিবার থাকে। কোনো সার্ভে করা হয়নি। সার্ভে হলে পরিষ্কার হয়ে যাবে ৭২ সালে আমরা কোন পরিবারগুলো ছিলাম।”

উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন এই ১৪ হাজার মানুষ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

“শুনেছি জেলা প্রশাসক মহোদয় একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। যেখানে লিখলে কাজ হবে সেখানে লিখেছেন। সর্বোচ্চ মহলের অনুমতি পেলে আশাকরি আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি একটা প্রস্তাব দিয়েছি। সেটার উত্তর না আসা পর্যন্ত কিছু বলতে চাইছি না। আগে উত্তর আসুক তারপর আপনাদের জানাবো।”

শুক্রবার সকালে পতেঙ্গার লালদিয়ার চর থেকে বেশ কয়েকটি বাসে করে হাজার খানেক নারী-পুরুষ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হন।

মানববন্ধন চলাকালে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সংহতি জানিয়ে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম রনি বলেন, জাতির জনক একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিমান ঘাটি সম্প্রসারণের জন্য তিনি অত্র এলাকার বাসিন্দাদের লালদিয়ার চরে স্থানান্তর করেছিলেন।

“এমন সময়ে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে যখন সারাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ ছাড়া তাদের উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে উস্কানি হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলটিকে, ক্ষতিপূরণের মানবিক আবেদনকে নসাৎ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একটি মানবিক আবেদনকে উস্কানিমূলক বলে যে বক্তব্য এসেছে তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”

রনি বলেন, “চট্টগ্রামের মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রামবাসীর অধিকার হরণ করা যাবে না। ব্রিটিশরা পারেনি, একাত্তরে সোয়াত জাহাজ বন্দরের আশেপাশের মানুষ রক্ত দিয়ে ফিরিয়েছিল। এই বন্দরের উন্নয়ন হয়েছে। বন্দরের টাকায় পায়রা বন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দর হচ্ছে। তখন বন্দরের আশপাশ থেকে অসহায় মানুষকে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। কোনো ভাড়াটিয়ার জন্য আন্দোলনে নামিনি, আন্দোলনে নেমেছি যারা পৈত্রিক ভূমি হারিয়েছে তাদেরকে পুনর্বাসন করার দাবিতে। পুনর্বাসন না হলে এ আন্দোলন এক দফা এক দাবিতে যাবে। অন্যথায় চট্টগ্রামবাসীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি বা আইনের কথা বলে ন্যায্য অধিকার থেকে দূরে রাখতে চাইলে তার দাঁতভাঙা জবাব চট্টগ্রামের মানুষ দেবে।”

আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াহিদুল আলম বলেন, “রোহিঙাদের আশ্রয় দিয়েছেন আমাদের নেত্রী। তাহলে আমাদের কেন ঠাঁই হবে না? নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, উস্কানিদাতাদের তালিকা হচ্ছে।

“১০ দিন ধরে বিদ্যুৎ-পানিহীন মানবেতর জীবনযাপন করছি। আজ যদি মহিউদ্দিন চৌধুরী বেঁচে থাকতেন এ কথা আপনি বলতে পারতেন না। মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা আজও বেঁচে আছে। এ জমি বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের রায় কেন বাস্তবায়ন করছেন না? আমরা বেঁচে থাকতে উচ্ছেদ হবে না। আমাদের গায়ের উপর বুলডোজার চালাতে পারলে উচ্ছেদ করুন।”

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চু বলেন, “১৯৭২ সালে সরকারের নির্দেশে মানুষগুলো এখানে আশ্রয় নিয়েছে। আজ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আদালতে বলা হয়েছে এখানে কোনো আদি বাসিন্দা নেই। প্রয়োজনে আদালত যেন সরেজমিন দেখে সিদ্ধান্ত নেন।

“জেলা প্রশাসক উদ্যোগ নিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। আশাকরি একটি ভালো সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে না কিন্তু স্থায়ী সমাধান চাই। আশাকরি ভালো সমাধান আসবে।”

পতেঙ্গা থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. আলী বলেন, “নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন বন্দর দেশের লাইফ লাইন। এতে আমাদের অবদান আছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে পোড়াপাড়ার বাসিন্দারা এখানে আসে। এমনিতে নয়। আমাদের অধিকার আছে।”

৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ওয়াহিদুল আলম জানান, ২০০৫ সালে এ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের এক রায়ে লালদিয়ার চরবাসীকে পুনর্বাসন করতে বন্দরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী লালদিয়ার চরে উচ্ছেদে অনড় অবস্থানের কথা জানান। পাশাপাশি বলেন, সেখানে পুনর্বাসনের মতোও কেউ নেই।

লালদিয়ার চরে জমি ‘দখলে রেখে’ যারা আর্থিক ‘ফায়দা লুটেছে’ তাদের তালিকা করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়ার চরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে আন্দোলনে নামে লালদিয়ার চরে বাসিন্দারা।

১৯৭২ সালে বিমান ঘাঁটি সম্প্রসারণের সময় স্থায়ী বন্দোবস্তি পাওয়ার আশ্বাসের ভিত্তিতে নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে লালদিয়ার চরে বসতি শুরু করে স্থানীয় কয়েকশ পরিবার। এখন ওই এলাকায় ২৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষের বসবাস।

ইতিমধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ চরবাসীর পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সদস্য বিদায়ী প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনও পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরোধীতা করেছেন।

এমনকি নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় বুধবার চরের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে সরকারে প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সবশেষ বৃহস্পতিবার নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনও একই দাবি জানান।

উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন চান লালদিয়ার চরের বাসিন্দারা

লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযানে অনড় নৌ প্রতিমন্ত্রী