বন্ধু হারিয়েছে খালে, শিশুটি তাই খালের পাড়ে

চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় যার সঙ্গে খালে খেলতে নেমে এখন নিখোঁজ কামাল, সে খেলার সাথী রাকিব বন্ধুর জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই এলাকায়। বন্ধুর খোঁজে কয়েকবার নেমেওছিল ওই খালে।

নিখোঁজ ১১ বছরের কামালের সমবয়সী রাকিব। বাবা-মাহীন রাকিবের আশ্রয়দাতা কামালের বাবা আলী কাউসার। ষোলশহর রেল স্টেশনেই তাদের বসবাস।

এদিকে নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে ষোলশহর এলাকায় অপেক্ষা করছেন কাউসারও। জীবিত অবস্থায় পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, এখন লাশটি হলেও যেন পাওয়া যায়, তার অপেক্ষায় তিনি।

সোমবার বিকালে নগরীর ষোলশহর এলাকার চান্দগাঁও ভূমি অফিস সংলগ্ন চশমা খালে খেলতে নেমেছিল রাকিব ও কামাল। বৃষ্টি আর পানির স্রোতে তখন কামাল তলিয়ে যায়।

একদিন পর খবরটি পেয়ে মঙ্গলবার বিকালে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তার ২৪ ঘণ্টা পরও শিশুটির কোনো খোঁজ মেলেনি।

বুধবার ষোলশহর এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযানের সময় আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যায় নিখোঁজ কামালের বন্ধু রাকিবকে।

রাকিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানায়, তার মা-বাবা নেই। বন্ধু কামালের বাবা কাউসারের কাছেই তার বেড়ে উঠা। আশ্রয়দাতা এবং অভিভাবক বলতে তিনিই। এক সময় সে তার বন্ধু কামাল ও তার বাবা কাউসারের সঙ্গে একটি বাসায় থাকত। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের ঠিকানা ষোলশহর রেল স্টেশন।

নিখোঁজ কামাল

কামালের বন্ধু রাকিব

রাকিব জানায়, প্রতিদিন সকালে তারা বের হয়ে খবরের কাগজ বিক্রি করত। আবার কখনও কখনও খুঁজে বেড়াত প্লাস্টিক, লোহাসহ বিভিন্ন ভাঙারি মালামাল। সেগুলো বিক্রি এবং কাউসারের দিনমজুরির আয়ে চলত তাদের তিনজনের দিন।

কামাল কীভাবে নিখোঁজ হল- সেই বর্ণনা দিয়ে রাকিব বলে, “সকাল বেলা আমরা দুজন মিলে বের হয়েছিলাম। দুই নম্বর গেইটে ঘোরাঘুরি করেছিলাম কিছুক্ষণ। বৃষ্টি চলে আসায় ফিরে যাই রেল স্টেশনের দিকে। প্রতিদিন এক ভাইয়া (এক স্বেচ্ছাসেবী কর্মী) এসে আমাদের ভাত খাওয়ান। সেগুলো খেয়ে আবার ঘোরাঘুরি শুরু করি।

“হাঁটতে হাঁটতে খালের আবর্জনার ভেতর একটি হলুদ ফোম দেখে দুজন সেখানে নেমে পড়ি। আমরা দুজন সেটার ওপর উঠে ভাসতে থাকি। কিছুক্ষণ ভাসার পর হঠাৎ স্রোতে উল্টে যাই। আমি দেয়ালের (খালের বাঁধ) সাথে লেগে আটকে যাই, কামাল স্রোতে ভেসে যায়।”

“বেশ কিছুক্ষণ আমি কামাল কামাল ডাকি। আশেপাশের অনেকেই দেখেছে, কিন্তু বৃষ্টিতে কেউ আসেনি,” অনর্গল বলতে থাকে রাকিব।

“কামালকে না পেয়ে আমি ভয় পেয়ে যাই। স্টেশনে গিয়ে ভেজা কাপড় পাল্টে ফেলি। তখনও আব্বুকে (নিখোঁজ কামালের বাবা কাউসার) কিছু বলিনি। এক লোক এসে আব্বুকে বলে তোর ছেলে পানিতে ভেসে গেছে। তখন আব্বু পাগলের মতো হয়ে যায়। আমিও তখন জানাই।”

এরপর রাকিবকে নিয়ে কাউসার সন্ধ্যায় চান্দগাঁও সার্কেল ভূমি অফিসের সামনে আসে, যেখানে ভেসে গিয়েছিল কামাল। নালায় নেমে সারারাত খোঁজাখুঁজি করেও পায়নি।

“কাল দুপুরে সামির ভাই (স্বেচ্ছাসেবী) যখন ভাত দিতে এসেছিল, তখন তাকে বলেছিলাম। উনি ফায়ার সার্ভিসে টেলিফোন করে জানায়। তারপর ফায়ার সার্ভিস এসে কামালের খোঁজ শুরু করে।”

রাকিবের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যেখানে নেমেছিল, তার পূর্ব দিকে রাস্তার নিচ দিয়ে দুটি বক্স কালভার্ট গেছে। স্রোতে তার একটিতে ঢুকে যায় কামাল।

এদিকে ২৪ ঘণ্টায় সন্ধান নাম মিললেও নিখোঁজ কামালের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও খালের ময়লা তুলছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিশুটি নিখোঁজের প্রায় ২২ ঘণ্টা পর আমাদের খবর দেওয়া হয়। আমদের রেসকিউ, ডুবুরিসহ তিনটি ইউনিট কাজ করছে। শিশুটি হয়ত আবর্জনার স্তূপের ভেতর আটকে আছে, না হয় ভেসে গেছে। আমরা আমাদের উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”

কাজটি যে কঠিন, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেশ কয়েক টন আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে। রাস্তার নিচে আমাদের কর্মীরা যেখানে কাজ করছে, সেটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। প্রচুর গ্যাস… সেখানে আবর্জনা জমে আছে। আবার কিছুক্ষণ পরপর স্রোত আসছে।”

ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা যেখানে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে, সেখানে সন্তানের ছবি নিয়ে ঘুরঘুর করছেন কাউসার। আবার বিভিন্নজনের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তার দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে কামাল সবার ছোট। সাত বছর আগে তার স্ত্রী মারা যান। দুই মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর ঘরে। বড় ছেলে ঢাকার কারওয়ান বাজারে একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক। ছেলে কামাল ও রাকিবকে নিয়ে তিনি থাকেন ষোলশহর রেল স্টেশনে।  

কাউসার বলেন, “সোমবার আমি বিভিন্নজনকে এসে বলেছি আমার ছেলে নিখোঁজের কথা। সবাই বলে পাগল… কেউ বিশ্বাস করেনি। সেজন্য আমি নিজেই নালায় নেমে খুঁজেছি আমার কামালকে।

নিখোঁজ কামালকে জীবিত না পেলেও তার দেহটা যেন খুঁজে পাওয়া যায়, সে অপেক্ষায় এখন বসে কাউসার ও তার সন্তানতুল্য রাকিব।

চট্টগ্রামে নালা-খালে পড়ে নিখোঁজ এটাই প্রথম ঘটনা নয়। সম্প্রতি আরেক ব্যক্তি নালায় পড়ে নিখোঁজ হওয়ার পর তার সন্ধান আর মেলেনি। খালে পড়ে এক তরুণীসহ আরও তিনজনের মৃত্যু ঘটে।

‘খেলনা কুড়াতে’ চশমা খালে নেমেছিল চট্টগ্রামের শিশুটি  

চট্টগ্রামে খালে পড়ে তলিয়ে গেছে শিশু