এক মাস বাকি থাকতেই গত অর্থবছরের সমান রেমিটেন্স

করোনাভাইরাস সঙ্কটে আমদানি ও রপ্তানি তলানিতে নেমে আসলেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এখনও অর্থনীতিতে আশার আলো জাগিয়ে রেখেছে।

গত পুরো অর্থবছরে যত রেমিটেন্স এসেছিল, চলতি অর্থবছরের এক মাস বাকি থাকতেই তার প্রায় সমান অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ায় কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশের রেমিটেন্স ‘ধাক্কা’ লাগেনি বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

যদি ‘এই প্রণোদনা’ না দেওয়া হত, তাহলে এবার অর্থবছর শেষে গত বছরের চেয়ে ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স কম আসতো বলে মনে করছেন তিনি।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) এক হাজার ৬৩৬ কোটি ৪০ লাখ (১৬.৩৬ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল এক হাজার ৫০৫ কোটি ১০ লাখ (১৫.০৫ বিলিয়ন) ডলার।

এ হিসাবে এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার বা ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছে।

গত অর্থবছরের পুরো সময়ে (জুলাই-জুন) এক হাজার ৬৪২ কোটি (১৬.৪২ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

সারাবিশ্বে মহামারীর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সদ্য সমাপ্ত মে মাসে ১৫০ কোটি ৩০ লাখ (১.৫ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

করোনাভাইরাস মহামারী গোটা বিশ্বকে সঙ্কটে ফেলে দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের রেমিটেন্সেও পড়েছে তার প্রভাব। আশঙ্কা করা হয়েছিল, আমদানি ও রপ্তানি আয়ের মতো রেমিটেন্সও তলানিতে নেমে আসবে। কিন্তু তেমনটি হয়নি।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল সোমবার রেমিটেন্সের হালনাগাদ তথ্য দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা আমাদের জন্য খুবই ভালো খবর যে, এই মহাসঙ্কটের সময়েও রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য আমি আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি; কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

তিনি বলেন, “তবে এক্ষেত্রে আমাদের সরকারেরও একটা বড় অবদান আছে। আমরা চলতি বাজেটের প্রথম দিন থেকে রেমিটেন্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রণোদনা রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।

“আমি হিসাব করে দেখেছি, যদি আমরা এই প্রণোদনা না দিতাম, তাহলে চলতি অর্থবছর শেষে গত অর্থবছরের চেয়ে ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স কম আসত।”

রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় রপ্তানি আয় কমার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।

গত মার্চ থেকে রেমিটেন্স কমে যাওয়া দেখে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না অর্থনীতিবিদরা।

কিন্তু ঈদের মাস মে’তে অতীতের যে কোনো ঈদের মাসের চেয়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। তবে আগামী দিনগুলোতে কী হবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত তারা।

অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আমরা ভেবেছিলাম আমদানি ও রপ্তানি আয়ের মতো রেমিটেন্সও একেবারে তলনিতে নেমে আসবে। কিন্তু তা হয়নি।”

তিনি আবারও বলেন, “একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এখন উপার্জন বা কাজের টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন না তারা (প্রবাসী)। জমানো টাকা যেটা ছিল সেখান থেকেই অথবা অন্য কারও কাছ থেকে ধার করে পরিবারের-পরিজনের বিপদের দিনে কিছু পাঠাচ্ছেন। সেটা ফুরিয়ে গেলে আর পাঠাতে পারবেন না।”

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিভিন্ন দেশে থাকা কোটি বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ। জিডিপিতে এই রেমিটেন্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো।

প্রতি বছরই ঈদের আগে রেমিটেন্সে গতি আসে। গত বছরের রোজার ঈদের আগে মে মাসে ১৭৪ কোটি ৮২ লাখ ডলারের রেকর্ড রেমিটেন্স এসেছিল। এক মাসের হিসাবে যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স।

এবার করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ইতোমধ্যেই সাত লাখের মতো প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরতে হয়েছে। যারা রয়েছেন, তাদেরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে তেমন রেমিটেন্স আশা করা হচ্ছিল না।

মার্চ থেকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যাওয়া ওই নিরাশার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

গত মার্চে ১২৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের রেমিটেন্স এসেছিল, যা গত বছরের মার্চ মাসের চেয়ে ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম।

পরের মাস এপ্রিলে রেমিটেন্স আরও কমে ১০৮ কোটি ১০ লাখ ডলারে আসে, তাও গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ কম।

কিন্তু মে মাসে চিত্র পাল্টাতে থাকে। প্রথম ১১ দিনে ৫১ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিটেন্স আসে, ১৩ মে পর্যন্ত আসে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ১৪ মে পর্যন্ত আসে ৮০ কোটি ডলার। ১৯ মে তা ১০৯ কোটি ১০ লাখ  ডলারে দাঁড়ায়।

২৮ মে পর্যন্ত আসে ১৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলা। ৩১ মে মাস শেষে সেই রেমিটেন্স গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি ৩০ লাখ ডলারে।

ঈদের পাশাপাশি রেমিটেন্সে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনার শর্ত শিথিল করার প্রভাবও রেমিটেন্সে পড়ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী ছাইদুর রহমান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মহামারীর কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সঙ্কট চলছে। আমরা ভেবেছিলাম রেমিটেন্সের পরিমাণ একেবারে তলানিতে নেমে আসবে। তবে তা হয়নি। প্রতিবারের মতো এবারও ঈদে পরিবার-পরিজনের জন্য বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়ছেন প্রবাসীরা।”

মহামারীর প্রভাব শুরুর আগে রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের উপরে ছিল।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবার রেমিটেন্স ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিয়েই অর্থবছর শেষ হত বলে মনে করেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রেমিটেন্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। জ্বালানি তেলের দাম একেবারে কমে আসায় তেলনির্ভর অর্থনীতির ওই দেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে বড় সঙ্কট। ফলে সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রেমিটেন্সের জন্য খুব ভালো খবর আসবে বলে তার মনে হয় না।

তবে এরপরও রেমিটেন্সে ৯/১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হবে বলে মনে করেন তিনি।

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি; ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।

রিজার্ভ ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার

ঈদে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় রপ্তানি আয় কমার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।

সোমবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

তবে আমদানি তলানিতে নেমে আসায় বিদেশি মুদ্রা খরচ না হওয়ায় রিজার্ভ ভালো অবস্থায় থাকার একটি কারণ বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

আরও খবর

রেমিটেন্সে উল্লম্ফন, রিজার্ভ ফের ৩৩ বিলিয়ন ছাড়াল  

হতাশার মধ্যে আশার চেয়েও বেশি রেমিটেন্স  

মহামারীতে অর্থনীতিতে ওলট-পালটে রপ্তানি আয় নামল রেমিটেন্সের অর্ধেকে  

কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেও ১০৮ কোটি ডলার রেমিটেন্স  

রেমিটেন্সে প্রণোদনার শর্ত শিথিল  

মহামারীর দিনেও ঈদের আগে রেমিটেন্স বেড়েছে