দূষণ: সাভার শিল্পনগরীর ভবিষ্যত কোন পথে

রাজধানী থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পরও পরিবেশ দূষণ পিছু ছাড়ছে না চামড়া খাতের; সাভারে শিল্পনগরী স্থাপনের চার বছর পর এখন একই কারণে ‘বন্ধের’ সুপারিশ জোরালো হলে প্রশ্ন উঠেছে এ শিল্প এলাকার ভবিষ্যত কোন পথে তা নিয়ে।

শিল্পনগরীর বর্জ্যে ধলেশ্বরী নদী দূষণের কারণে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির আপাতত বন্ধের সুপারিশের পর এবার পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চিঠি দেবে।

সোমবার সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সংসদীয় কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে দূষণের দায়ে এ শিল্পনগরী ‘বন্ধ করতে’ শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠাবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য শোধনাগার থেকে বেরোনো তরল ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

এদিন সংসদ ভবনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে এক প্রশ্নের জবাবে সাবের হোসেন বলেন, “কোনো ইনডিভিজুয়াল ইউনিট যদি ইটিপি করে, সেটার বিষয় আলাদা করে বিবেচনা করা হবে।

“আজকে ফাইনাল ডিসিশন হয়েছে, এটা বন্ধ হয়ে যাবে। এটা মিনিস্ট্রিরও সিদ্ধান্ত। আমরা জানিয়ে দিয়েছি। এটা চিঠি ইস্যু হয়ে যাবে।”

সাভারের হেমায়েতপুরে হরিণাধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিক। অনেক চেষ্টার পর রাজধানী ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ট্যানারি সেখানে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আদালতের নির্দেশে তাদেরকে সেখানে যেতে বাধ্য করা হয়।

তবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার- সিইটিপি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হলেও শিল্পনগরীর ১৫৪ প্লটের মধ্যে ১৩০টি এখন উৎপাদনে রয়েছে। এসব ট্যানারির বর্জ্যে ধলেশ্বরী নদীর দূষণ বাড়ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংসদীয় কমিটি বলছে, পরিপূর্ণ ব্যবস্থা নিয়ে এ শিল্পনগরী চালাতে হবে। যতদিন তা না হয় তা বন্ধ রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান। সোমবারের বৈঠকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও সংসদীয় কমিটির সঙ্গে একমত পোষণ করা হয়।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি সাবের সাংবাদিকদের বলেন, “সাভারে ট্যানারি যেটা আছে, আমরাতো তাদের চিঠি দিয়েছিলাম। সরকারের পক্ষ থেকে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব এসেছিলেন। উনার বক্তব্য শুনলাম।

“আমরা টাস্কফোর্সকে স্বাগত জানাই। টাস্কফোর্স তাদের কাজ করবে। তবে তারা নতুনভাবে আবার আবেদন করবে তাদের ছাড়পত্রের জন্য।“

তিনি বলেন, “আমাদের যে চাহিদাগুলো আছে সেগুলো তারা পূরণ করবে। আমরা তাদের সহযোগিতা করব, কীভাবে করলে এটা কমপ্লায়েন্ট হতে পারে। সেটা করার পর, তারা নিয়ম অনুযায়ী যদি ছাড়পত্র পায় তারা শিল্পনগরী চালু করতে পারবে। তার আগে এখনই এটা বন্ধ করতে হবে। এটা চলতে পারবে না।”

গত ২৩ অগাস্ট কমিটির বৈঠকেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হওয়ায় এ শিল্প নগরী ‘আপাতত বন্ধ রাখার’ সুপারিশ আসে।

কমিটির সুপারিশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কাছে চিঠি দেয়। চামড়া শিল্প নগরী ‘কেন বন্ধ করা হবে না’, তা বিসিকের কাছে জানতে চায় সংসদীয় কমিটি।

এ বিষয়ে জানতে শিল্পনগরী ও সিইটিপি প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিসিকের চেয়ারম্যান মোশতাক হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি।

শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তাফা কামালের মন্তব্যও জানা যায়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে সাবের হোসেন বলেন, “নারায়নগঞ্জে ছয়টা ডাইং কারাখানা তাদের ছাড়পত্র নেই। আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এখানেও বন্ধ করে দেব।

“আগে শোকজ করা হয়েছিল। জবাব এসেছে। আপাতত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। মিনিস্ট্রি এখন শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিককে চিঠি পাঠাবে।”

বর্জ্য খোলা জায়গায় রেখে দেওয়া বিপদজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার এলাকায় বালু নদীর পানি পচে গেছে। কয়লার মত কালো। চর্ম রোগ হয়।”

সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদন হয়, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে ২৫ হাজার ঘনমিটার।

সংসদীয় কমিটি বলছে, দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিবেশে মিশছে। গত তিন বছরে এক কোটি ৬৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে গেছে। এর বাইরে ক্রোমিয়াম শোধনের ব্যবস্থাও নেই সেখানে।

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর ট্যানারি কারখানা থেকে বর্জ্য ফেলা হয় এই ডোবার ভেতরে। স্থানীয়রা জানায়, রাতের আঁধারে তা ফেলা হয় ধলেশ্বরী নদীতে। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

এ কারণে অগাস্টে সাভারে ট্যানারি বন্ধের সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

এরপর গত সেপ্টেম্বরে ‘চামড়া শিল্পখাতের উন্নয়নে সুপারিশ তৈরি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণের লক্ষ্যে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স’ এক বৈঠক করে বলেছে, তারা এই শিল্পের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ চায়।

চামড়া শিল্প নগরী বন্ধ না করে পরিবেশ সম্মত ও দূষণ মুক্ত করার পক্ষে টাস্কফোর্স।

ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং অন্যান্য সব কাজ এখনও শেষ হয়নি।

এ অবস্থায় কিছু ট্যানারি পরিবেশ ছাড়পত্র পেলেও এখন পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়নে সময় নেওয়া হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকরা কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বেকায়দায় রয়েছেন বলে ট্যানারিমালিকদের ভাষ্য।

চামড়া শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত পরিবেশে উন্নীত করতে ২০০৩ সালে হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার কাজে হাত দেয় বিসিক। তবে দীর্ঘদিনেও তা স্থানান্তর না হওয়ায় উচ্চ আদালত হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেওয়ার পর ২০১৭ সালের এপ্রিলে কারখানাগুলো একযোগে স্থানান্তরিত হয়।

আরও পড়ুন:

পরিবেশ দূষণ রোধে সাভারের ট্যানারি বন্ধের সুপারিশ  

চামড়া শিল্পের জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব  

সাভারের ট্যানারি কেন বন্ধ হবে না, বিসিকের কাছে ব্যাখ্যা দাবি