উত্তরাঞ্চলে আর খাদ্য ঘাটতি নেই, দুর্ভিক্ষও নেই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলে আর খাদ্য ঘাটতি নেই, এমনকি দুর্ভিক্ষও নেই; এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নতির যে লক্ষ্য ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার তা পূরণ করতে ‘সক্ষম হয়েছে’।

রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নবনির্মিত ‘রংপুর বিভাগীয় সদর দপ্তর কমপ্লেক্স ভবন’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, রংপুর বিভাগে যে সমস্ত শাক-সবজি, তরি-তরকারি হয়, সেগুলো যেন প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার সে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

“এদেশে আর কখনও যেন মঙ্গা দেখা না দেয়, আর কখনও দুর্ভিক্ষ যেন না হয়, এদেশের মানুষ যেন আর কষ্ট না পায়।”

অতীতে রংপুর বিভাগের মানুষের নানা সংকটের কথা তুলে ধরে ওই অঞ্চলের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানান সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, “নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েই কিন্তু রংপুরবাসী এই সব সুযোগ সুবিধাগুলো পেয়েছেন, সেটা বোধ হয় ভুললে চলবে না।

“আমি বলব, এই অঞ্চলে এখন আর খাদ্য ঘাটতি তো নেই-ই আর দুর্ভিক্ষও নেই। কাজেই এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নতি সেটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। সেটা আমরা করতে পেরেছি।”

রংপুর বিভাগের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, “এখন উদ্বৃত্ত খাদ্যের অঞ্চল হয়ে গেছে রংপুর। যেখানে এক সময় খাবারের অভাবে মানুষ ধুকে ধুকে মারা যেত।”

টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এই ১৩ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর যত উন্নতি হয়েছে এর আগে অনেকেই তো, বিশেষ করে রংপুরের লোকই তো ক্ষমতায় ছিল কিন্তু রংপুরের মানুষের তেমন কোনো ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। তারা নিজেদের ভাগ্য গড়েছে, সাধারণ মানুষের ভাগ্য গড়েনি।”

শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই অঞ্চলে শিক্ষার হার কম ছিল, কিন্তু এখানে মেধাবী ছাত্র ছিল, কাজেই আমরা সেদিকে হিসেব করে আমরা এখন পদক্ষেপ নিয়েছি।”

প্রধানমন্ত্রী জানান, কুড়িগ্রামে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে এবং লালমনিরহাটে অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারো-স্পেস ইউনিভার্সিটি, রংপুরে বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্ধে তার নামে একটা কমপ্লেক্স এবং ট্রেনিং সেন্টার করা হয়েছে।

“রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় বেগম রোকেয়ার নামেই আমরা করে দিয়েছি, তিনিই প্রথম শিক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেই আমরা কিছু লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছি। এ অঞ্চলের প্রত্যেকটা জেলায় কিন্তু মেডিকেল কলেজ হচ্ছে।”

রংপুরের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করা হচ্ছে এবং যমুনা নদীর ওপর আলাদা রেল সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত রেলের ব্যবস্থা করছি, চার লেনের ঢাকা রংপুর মহাসড়ক ছয় লেনের করা হয়েছে।

“প্রত্যেকটি বিভাগীয় সড়ককে আমরা চার লেনের করে দিচ্ছি আর হাইওয়ে ছয় লেনের করে দিচ্ছি। রংপুরসহ সকল বিভাগে ফুড টেস্টি ল্যাবরেটরি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, শিল্প কারখানা করতে হবে, কিন্তু যত্রতত্র না। কৃষিজমিও রক্ষা করতে হবে, কারণ এ অঞ্চলের জমি খুবই উর্বর।

“আর দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেন শিল্প গড়ে উঠে সেই শিল্প গড়ার সময় এবং যারা বিনিয়োগ করবেন তাদের আমি বলব, এই দিকটাও দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।”

ওই অঞ্চলভিত্তিক যে সমস্ত পণ্য উৎপাদিত হয়, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা এবং সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “খাদ্য উৎপাদনে আমাদের যেহেতু প্রাকৃতিক… দেশ, সেজন্য আমরা এখানও সাইলো নির্মাণ করে দিচ্ছি, যেখানে আমাদের খাদ্য আমরা অন্তত দুই থেকে তিন বছর সেটা রাখতে পারি, নষ্ট না হয়।

“অর্থাৎ ধান-চাল যে রক্ষা করা যায় সেভাবে আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। যাতে একবার দুবার যদি ফসল নষ্টও হয়, আমাদের যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়, কারও মুখাপেক্ষী হতে না হয়। আমাদের নিজেদের খাদ্য দিয়েই যেন আমরা মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারি।”

রংপুর বিভাগীয় সদর দপ্তর কমপ্লেক্স ভবন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিভাগীয় যে অফিসটা… আমরা চেয়েছি এমন একটা জায়গায় এই কমপ্লেক্স ভবনটা করে দেওয়া যেন সব জেলাগুলোর একটা সেন্টার পয়েন্ট হয়।

“সেখানে গিয়ে যেন তারা সহজে কাজ করতে পারে, তাদের সেবাটা নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করেই আমরা রংপুর বিভাগের সদর কমপ্লেক্সটা আমরা নির্মাণ করেছি।”

রংপুর বিভাগীয় সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে এ অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল ওয়াহাব ভূঞাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক চিন্তাভাবনা নিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে এই ১০ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং টাকাও সাশ্রয় হয়েছে।

“সাধারণত দেখা যায় একটা প্রকল্প নিলে টাকার আর সাশ্রয় হয় না বরং পরে আরও চায়। কিন্তু এখানে প্রায় ২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। কারণ আমরা তো প্রকল্পে কখনো বাঁচাতে দেখি না।”

সেজন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি আশা করি ভবিষ্যতে যারা অন্যান্য কমপ্লেক্সগুলো করবে তারাও যেন এটা মাথায় রাখে। একটু কমালে আমাদের ধন্যবাদ…।”

দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। মানুষ অনেক স্বচ্ছল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের শীতার্ত মানুষের সহযোগিতায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এবার শীত পড়েছে, সবাই শীতে কষ্ট পাচ্ছেন। আমরা সাধ্যমত সহযোগিতা করেছি, যারা বিত্তশালী আছেন তাদেরকে অনুরোধ করব আপনারা শীত বস্ত্র বিতরণ করতে পারেন।”

আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠন করে বাংলাদেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠন করে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করতে চাই, সেটা আমাদের লক্ষ্য। ২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে আমরা যে ঘোষণাগুলো দিয়েছিলাম আল্লাহর রহমতে একে একে সবগুলো আমরা বাস্তবায়ন করেছি।”

বাংলাদেশ যে এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, “এই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে, সেই পরিকল্পনা আমি করে দিয়েছি।”

বাংলাদেশকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান।

অনুষ্ঠানে আরও  বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আলী আজম, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল ওয়াহাব ভূঞা।