মূল্যস্ফীতি আর ঋণের চাপে চ্যাপ্টা হওয়ার দশা দরিদ্র দেশগুলোর

গমের মত রান্নার তেলের দামও বিপদে ফেলেছে অনেক দেশের মানুষকে। ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধ ইয়েমেনকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার আগে ওয়ালিদ আল-আহদাল নিজের সন্তানদের ভরণপোষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন না। লোহিত সাগরের তীরে নিজের জমিতেই ফলাতেন ভুট্টা; ছাগল আর গরু লালন-পালন করে দুধের চাহিদা মিটত।

অথচ গত চার বছর ধরে যুদ্ধ তাদের উদ্বাস্তু করে রেখেছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানার কাছে একটি তাঁবুতে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। শরণার্থী শিবিরে আরও ৯ হাজার পরিবারের সঙ্গে অসহায় জীবন কাটছে তার। স্থানীয় একটি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে যা পান তা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট খাবারই কিনতে পারেন না।

এখন আবার নতুন আরেক যুদ্ধ তার জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিসহ করে তুলেছে, যদিও সেই যুদ্ধ চলছে তার দেশের সীমানা থেকে ২ হাজার মাইল দূরে।

খাদ্যের দাম ক্রমশ বেড়েই চলছে। ইউক্রেইনে রাশিয়ার সেনা অভিযান শুরুর পর ইয়েমেনের বাজারে গমের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, দুধের দাম বেড়েছে দুই-তৃতীয়াংশ।

অনেক রাতেই আল-আহদাল (২৫) তার ২ বছরের মেয়ে এবং ৩, ৫ ও ৬ বছরের তিন ছেলেকে কিছুই খেতে দিতে পারেন না। সন্তানদের চা খাইয়ে ঘুম পড়িয়ে দেন।

আল-আহদাল নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “আমার হৃদয় ভেঙে যায়, যখন আমার সন্তানেরা ক্ষুধা পেটে খাবার খোঁজে এবং খেতে পায় না। কিন্তু কি করার আছে আমার!”

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ইয়েমেনের এই পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত একটি সংকটকে মূর্ত করে তুলেছে - দরিদ্র দেশগুলোতে বসবাস করা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ খাদ্য ও জ্বালানির সংকটে ভুগছে।

ইউক্রেইনে যুদ্ধ এরইমধ্যে বিশ্বকে নাজেহাল করা কোভিড-১৯ মহামারীতে ঘি ঢেলেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক ঋণপ্রবাহে কড়াকড়ি, এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের প্রবৃদ্ধির ধীর গতি।

ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টের অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ বলেন, “পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দাবানল সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটের পর এখনকার পরিস্থিতি তার চেয়েও বড় সংকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। সবকিছুই যেন স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিরুদ্ধে যাচ্ছে।”

ইউক্রেইনে সেনা অভিযান চালানোর জেরে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে রান্নার তেল, সার ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। পশ্চিমারা অবরোধ দিয়ে রাখায়, বিশ্বের বেশিরভাগ দরিদ্র অঞ্চলে কৃষির ফলন বিঘ্নিত ও পুষ্টির যোগান হুমকিতে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করে রাখার কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, পণ্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আটকে গেছে, বিশেষ করে ওইসব দেশে যারা আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে প্রায় অর্ধেক কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি জানিয়েছে, শুধু হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলেই এক কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ এ মুহূর্তে ক্ষুৎপিড়িত হওয়ার মুখে রয়েছে। ওই অঞ্চলে তীব্র খরা ও মহামারীর প্রভাবে এমনিতেই খাদ্য পরিস্থিতি নাজুক ছিল, এখন রাশিয়া ও ইউক্রেইন থেকে শষ্য রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের মোট গম রপ্তানির এক চতুর্থাংশ আসে এই দুই দেশ থেকে।

গত সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ বাজার সামাল দিতে ভারতও গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশ।

ইউনিসেফ সোমবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইউক্রেইনে যুদ্ধ এবং পশ্চিমাদের অবরোধের কারণে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা শিশুদের চিকিৎসায় দরকারি থেরাপিউটিক ফুডের কাঁচামালের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

এদিকে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নিজেদের বাজারের মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ঋণের সুদ হার বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদ হার বাড়ানোর কারণে ঋণপ্রবাহও ধীর হতে শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

বড় অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপ ঝুঁকিতে থাকা নিম্ন-আয়ের দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা গুটিয়ে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে সরে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে।

তারল্য প্রবাহ বদলে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারে ডলারের দাম চড়ছে এবং ভারত থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলের মত দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রা স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে। তাতে বিনিময় মূল্যে ব্যাপক দরপতন হচ্ছে। ঋণে কড়াকড়ি আরোপ করায় অনেক বেশি ঋণের চাপে থাকা দেশগুলোর সরকারের জন্য ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেছে।

চীনকে বলা হয় অনেক দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’, মহামারী পরবর্তী বিশ্বে ওষুধ সরবরাহেরও বড় উৎস হয়ে উঠেছে এশিয়ার এই দেশ। কিন্তু চীন সরকার সম্প্রতি কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে জিরো-কোভিড নীতি বাস্তবায়ন করায় কাঁচামালের চাহিদা কমে গেছে এবং বিশ্ব বাজারে চীনের তৈরি পণ্যের সরবরাহও ধীর হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের কারণে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেইনের বন্দরগুলো থেকে জাহাজ চলাচল আটকে দিয়েছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এর জেরে ইথিওপিয়া, সাউদ সুদান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে খাদ্য নিরাপত্তা চরম বিপর্যয়ে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেইনের গম সোমালিয়া ও বেনিনের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ করে, তানজানিয়া, সেনেগাল, কঙ্গো, সুদান ও মিসরের মোট চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটায়।

ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ইউক্রেইনে সেনা অভিযান শুরু করার পর পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ করলে এ পরিস্থিতিতে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে বিশ্ব বাজারে গমের দাম এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে যায়।

কয়েকজন অর্থনীতিবিদ খাদ্যপণ্যের এই দাম বৃদ্ধির জন্য বহুজাতিক কৃষি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্যে, মহামারী ও যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে চাহিদা ও সরবরাহের যোগসূত্রকে ছাপিয়ে বিশ্ব বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ঘোষের মতে, পুঁজিবাজারের আর্থিক জ্বল্পনাই খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপের সাংবাদিকদের একটি গোষ্ঠী- লাইটহাউজ রিপোর্টের বিশ্লেষণধর্মী তথ্য বলছে, এপ্রিলে জল্পনাকারীরাই প্যারিসের আন্তর্জাতিক গমের বাজারে ৭২ শতাংশ কেনাবেচার জন্য দায়ী ছিল, যা মহামারীর আগের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি।

ব্যাপক মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা না থাকা, জ্বালানি সংকটের জেরে ব্যাপক সহিংস বিক্ষোভে শ্রীলঙ্কায় সরকারের পতন হয়েছে। তিউনিসিয়া, ঘানা, সাউদ আফ্রিকা ও মরক্কোর পরিস্থিতিও ভালো নয় বলে সাম্প্রতিক এ প্রতিবেদনে হুঁশিয়ার করেছে অক্সফোর্ড ইকনোমিকস।

পাকিস্তানেও মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি সেদেশের পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও খুব একটা স্বস্তিতে নেই।

তুরস্কেও ব্যাপক মূল্যস্ফীতিতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ নাগরিকদের ভেতরে। ডলারের বিপরীতে ব্যাপক দর হারিয়েছে সেদেশের মুদ্রা লিরা।

ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। মহামারীর ধকল কাটিয়ে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরা এখন বড় চ্যালেঞ্জ ওই মহাদেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের সরকারের জন্য।