সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে, শুনেছেন উপমন্ত্রী

মহামারীকালের বিধি-নিষেধে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার।

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে বৃহস্পতিবার বন অধিদপ্তর আয়োজনে এক ওয়েবিনারে বক্তব্যে এ দাবি করে তিনি। তবে দাবির পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান তিনি পারেননি তিনি।

সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেন, “কোভিড-১৯ সারাদেশকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, সুন্দরবনসহ সকল সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোভিড-১৯ কিছু ভালো কাজ করেছে।

“আমাদের মাওয়ালী (মৌয়াল) যারা সুন্দরবনে এই সিজনে মধু সংগ্রহ করতে গেছে, তাদের কাছ থেকে শোনা কথা যে, এবার বাঘের পায়ের ছাপের মধ্যে প্রচুর বাচ্চা বাঘের পায়ের ছাপ তারা দেখেছেন। অর্থাৎ অবশ্যই বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

সুন্দরবনে অন্য প্রাণীর সংখ্যাও বেড়েছে দাবি করে, তাও বাঘের বিষয়ে অনুমানের পক্ষে যুক্তি দেখান তিনি।

“আগে আমরা সন্ধ্যা কিংবা ভোরবেলায় অল্প একটু আলোতে হরিণকে বাচ্চাদের নিয়ে পানি খাওয়ার দৃশ্য দেখতে পেতাম। এখন হরিণ এবং শুকর সারাদিন দেখা যাবে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের সংখ্যা একটু বেড়েছে।”

তবে সঠিক পরিসংখ্যান দিতে না পারার কারণ হিসেবে বাঘশুমারির প্রকল্প থেমে থাকাকে দেখান উপমন্ত্রী।

“এবার যদি বাঘশুমারির করতে পারতাম, তাহলে এর একটা উত্তর আমরা দিতে পারতাম। এখন বাঘের শুমারি দরকার।”

সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে অগ্রগতি কতদূর?  

বিশ্বে একক বনাঞ্চল হিসেবে সুন্দরবনেই এক সময় সবচেয়ে বেশি বাঘ ছিল।

২০০৪ সালে বন বিভাগের জরিপে পায়ের ‘ছাপ’ গণনা করে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। এরপর ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে ২০১৫ সালে করা শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নেমে আসে ১০৬টিতে। ২০১৮ সালের শুমারিতে তা বেড়ে ১১৪টি হয়।

সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্যের কাছে খাল পার হয়ে বনে ঢুকছে একটি বাঘ। ছবিটি ৯ জুলাই দুপুরে তোলা। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বিপন্ন প্রাণী বাঘ রক্ষায় সচেতনতায় প্রতিবছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিকভাবে বাঘ দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে এবছর দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘বাঘ বাঁচায় সুন্দরবন, সুন্দরবন বাঁচায় লক্ষ জীবন’।

বিশ্বের ১৩টি দেশের নেতারা ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে মিলিত হয়েছিলেন বাঘ সম্মেলনে। সেখানে ১২ বছরের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন তারা।

সেই সময় শেষ হতে আর এক বছর বাকি থাকলেও অর্জনের ঘর অনেকটাই খালি।

এই অবস্থায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন হাবিবুন নাহার।

তিনি বলেন, “বাঘ পছন্দ করে এই ধরণের পরিবেশ আমাদেরকে তৈরি করে দিতে হবে। সুন্দরবন ৫২ শতাংশ সংরক্ষিত আছে। অভয়ারণ্য এলাকায় কোনো মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই আয়তন আরও বাড়াতে হবে। তাহলে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।”

সুন্দরবনের বাঘের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে চোরা শিকার ও বাঘের চামড়া পাচার।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বাঘ শিকার প্রতিরোধে সুন্দরবনের মধ্যে জিপিএসের সাহায্যে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বন বিভাগ ড্রোন ব্যবহার করছে। বন্যপ্রাণীর সুপেয় পানির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মিঠাপানির পুকুরও খনন করা হয়েছে।

বাঘ সংরক্ষণে সবাইকে সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানান হাবিবুন নাহার।

বনে মানুষের প্রবেশ বন্যপ্রাণীকে আতঙ্কিত করে বলে সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ বন্ধ করার পক্ষেও মত দেন তিনি।

হাবিবুন নাহার বলেন, “গত বছর ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগের বিরাট কোনো এক নেতা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। আইন ভঙ্গ করায় পরে তাদেরকে রীতিমতো আটকে রাখা হয়েছিল।

“এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে কোনো এক এমপি তার পৌনে ৫০০ জনের একটি বহর নিয়ে লঞ্চ সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য বিকাল থেকে রাত পযন্ত অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু তাদের যেতে দেওয়া হয়নি। এখন হয়ত ৫-১০ জন করে যেতে পারে।”

বনকর্মীরা বহু সময় শিকারীদের গ্রেপ্তার করলেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাঘ: চোরাশিকার ও পাচার কতটুকু কমেছে?  

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ঘিরে নানা শিল্প কারখানা গড়ে ওঠাও বাঘের বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার কারণ বলে অভিযোগ করে আসছেন পরিবেশবিদরা।

তবে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, সুন্দরবনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ছাড়া নতুন কোনো শিল্প কারখানা হয়নি।

বনে মানুষের বিচরণ কমাতে এর পক্ষেও যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি মনে করি ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকলে মানুষও তাদের পেটের চিন্তা এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে পারবে। তখন বনে যাওয়ার চেষ্টা করবে না।”

ওয়েবিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল বলেন, বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় পশু বলেই তা রক্ষায় বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে।

“এটা জাতীয় প্রতীক, এটা না থাকলে জাতির এক সংকট তৈরি হতে পারে।”

বাঘের আশ্রয়স্থলে মানুষ প্রবেশের কারণে সুন্দরবন থেকে বাঘ কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“আইনে আছে সুন্দরবনে প্রবেশ করা যাবে না। ঢাকার সদরঘাটে থেকে লঞ্চ নিয়ে কীভাবে সুন্দরবনে ফুর্তি করতে পারে, তা আমি বুঝি না। বাঘের আশ্রয়স্থলে মানুষ যাচ্ছে যখন, তখন তাদের রক্ষার জন্য পুরুষ বাঘ বেরিয়ে আসছে, পুরুষ বাঘ বেশি মারা যাচ্ছে। তখন তাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না।”

বন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সচিব বলেন, “করোনার একটা ব্যাপার আছে, মানুষ যদি এখানে যায়, করোনা যদি ছড়ায়ে দেয়... আমরা বলতে চাচ্ছি করোনাকালের কথাটা আসছে। মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীর দেহে করোনা সংক্রমণের ঘটনা আছে। সুতরাং সুন্দরবনে বাঘ যারা বেঁচে আছে তাদের বংশ বিস্তারের জন্য আমি মনে করি মানুষের প্রবেশ সেখানে বন্ধ করতে হবে।”

দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সুন্দরবন না থাকলেও সেসব অঞ্চলের লোকজন নানা কাজের মাধ্যমে জীবিকা নিয়ে চলছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, “সেই জীবিকার ব্যবস্থা শুধুমাত্র বনে গিয়ে বাঘ মারা থেকে আরও অনেক কাজ আছে।”

সুন্দরবনের বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইকবাল আব্দুল্লাহ হারুন বলেন, “লবণাক্ত পানিতে চাষ হয় না বলে সুন্দরবনের বাঘের সাথে আশপাশের মানুষদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ে। সুন্দরবনের বাঘের প্রতিবেশটা ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে।”

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ২৫০টি বাঘ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন সুন্দরবনে অন্তত ২০০টি বাঘ করার লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে।

তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়তে শুরু করেছে, এটা আমরা ‍বুঝতে পেরেছি। দরিদ্র মানুষগুলো বনের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে, সেই দিকটিও বিবেচনা নিতে হবে।”

সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মহসিন হোসেন বলেন, “আমরা ২০২৭ সালের মধ্যে সুন্দরবনে ২০০টি বাঘে পরিণত করতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাঘের বসবাসের পরিবেশ আনতে হবে।”

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে বাংলাদেশ বন বিভাগের উপ-প্রধান বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বাঘ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ, বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিমও বক্তব্য দেন।