বন্যপ্রাণীর করিডোর: পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যৌথভাবে বন্যপ্রাণী করিডোর তৈরির প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরামর্শক হিসেবে যোগ্য বিবেচিত হওয়া দুই প্রতিষ্ঠানে প্রস্তাবে একই বিশেষজ্ঞের নাম ছিল, যা ‘অনৈতিক’ বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি।

অবশ্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারি সব নিয়ম মেনেই পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত ‘অনিয়ম’ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর গত অগাস্ট মাসে মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি তদন্ত করতে বলেছিল সংসদীয় কমিটি।

সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে সেই তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি সংসদীয় কমিটি। বিষয়টি আবারও তদন্ত করে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে কমিটিতে বিস্তারিত জানাতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলী পর্যালোচনা, কার্যকলাপ বা অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা সংসদীয় কমিটির কাজ। মন্ত্রণালয়ের চলমান বা আগের যে কোনো কাজ নিয়ে স্থায়ী কমিটি পর্যালোচনা করতে পারে।

হাতি ও বাঘ সংরক্ষণে ২০১৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘বঙ্গবন্ধু কনজারভেশন করিডোর’ নামে একটি অভয়ারণ্য তৈরির প্রস্তাব করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এশীয় হাতির চলাচলের জন্য দেশের সীমানায় তিনটি সংযোগ পথ তৈরির কথা বলা হয় ওই প্রস্তাবে। বন অধিদপ্তরকে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়।

সেই কাজের জন্য ‘ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি অব ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াইল্ডলাইফ ইন চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস অ্যান্ড কক্সবাজার উইথ মিয়ানমার অ্যান্ড ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এই প্রকল্প শুরু হয় গত বছরের জুলাই মাসে।

এ বছরের জুনে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে মেয়াদ আরও ছয়মাস বাড়ানো হয়। তিন কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ওই প্রকল্পের পরামর্শক ফার্মের চুক্তিমূল্যই দুই কোটি টাকা।

গত বছর সরকারি ক্রয় বিধি মেনে (পিপিআর) দরপত্র আহ্বান আহ্বান করা হলে, তিনটি প্রতিষ্ঠান পরামর্শক হওয়ার জন্য আবেদন করে। সেগুলো হলো- ওয়াইল্ড টিম, কনফার্ম বাংলাদেশ এবং আইইউসিএন বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস। এদের মধ্যে যোগ্যতার অভাবে কনফার্ম বাংলাদেশের আবেদন বাতিল হয়।

ওয়াইল্ট টিম ও আইইউসিএনের প্রস্তাব বিভিন্ন নির্ণায়কের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। কারিগরি মূল্যায়নে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে আইইউসিএন পায় ৮৫.৯৩ আর ওয়াইল্ড টিম পায় ৭৩.২০।

তবে আর্থিক প্রস্তাবে শতভাগ নম্বর পায় ওয়াইল্ড টিম। এখানে আইইউসিএন পায় ৮১.৯৫ নম্বর। সব দিক মিলিয়ে এগিয়ে থাকে আইইউসিএন।

এই কাজের জন্য ওয়াইল্ড টিম এক কোটি ৫৬ লাখ ১৪ হাজার টাকার প্রস্তাব দেয়; আর আইইউসিএন দেয় দুই কোটি ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার ৭০৬ টাকার প্রস্তাব।

কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দুটো মিলিয়ে আইইউসিএন এগিয়ে থাকায় পিপিআর অনুযায়ী তাদের প্রকল্প পরামর্শকের কাজটি দেওয়া হয়।

নথি থেকে জানা যায়, আইইউসিএন এবং ওয়াইল্ড টিম দুটি প্রতিষ্ঠানেরই ‘প্রফেশনাল স্টাফ’ হিসেবে নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজের।

একই ব্যক্তির নাম দুই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে থাকায় গত অগাস্ট মাসে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে সংসদীয় কমিটি।

সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, একই দরপত্রে বিশেষজ্ঞ দুই প্রতিষ্ঠানের গবেষক হিসেবে এক ব্যক্তির থাকাটা ‘সঠিক নয়’ এবং ‘অনৈতিক’।

ওই সময় মন্ত্রণালয়কে তদন্ত করে বিস্তারিত জানাতে বলা হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংসদীয় কমিটিতে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়, তা ‘সন্তোষজনক না হওয়ায়’ ফেরত পাঠাানো হয়।

ওই প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, পিপিআর মেনেই এ প্রকল্পের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই ব্যক্তির দুই প্রতিষ্ঠানে নাম থাকা নিয়ে বিস্তারিত কিছু ওই প্রতিবেদনে বলা হয়নি।

পাহাড়ে হাতির জন্য করিডোর করার ভাবনা  

সেখানে বলা হয়, আইইউসিএনের প্রস্তাবে আব্দুল আজিজের ‘কনসালটেন্ট কমিটমেন্ট লেটার’ থাকলেও ওয়াইল্ড টিমের প্রস্তাবে ওই চিঠি ছিল না। সেজন্য আইইউসিএনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত করার সময় আমরা মন্ত্রণালয়কে কোন টার্মস অব রেফারেন্স দিইনি। তারা আমাদের তদন্ত করে জানিয়েছে, পিপিআর অনুযায়ী সব ঠিক আছে। আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে খুব টেকনিক্যালি কিছু কথা বলা হয়েছে।

“যে ব্যক্তি দুই জায়গাতেই সই করেছেন, তাকেতো ব্ল্যাকলিস্টেড করা উচিত। এটা সঠিক নয়। সে যত বড় এক্সপার্ট হোক, এটা অনৈতিক। একজনকে লেটার অব কনসেন্ট দিয়েছে, আরেকজনকে দেয়নি। এটা কী? যে ফর্মে সই করেছে সেটাই যথেষ্ট। আলাদা করে লেটার অব কনসেন্ট লাগে না। এটার কোনো চাহিদা ছিল না।”

সাবের হোসেন বলেন, “দুই জায়গায় এক ব্যক্তির নাম থাকা নিয়ে তারা টেকনিক্যালি উত্তর দিয়েছে। অথচ আমরা ওটাই জানতে চেয়েছিলাম। সংসদীয় কমিটি মন্ত্রণালয়ের ওই তদন্ত প্রতিবেদন ফেরত পাঠিয়েছে। আবারও জানাতে বলা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে আমরা এটা দেখব।”

মন্ত্রণালয়ের তদন্তের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইইউসিএনের পরামর্শক আব্দুল আজিজের কাছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানতে চেয়েছিল, দুটি প্রতিষ্ঠানে তার নাম কীভাবে ছিল। 

বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্তের বিষয়টি তার জানা নেই।

“প্রকল্পের প্রশাসনিক দিক আমাদের দেখার কথা নয়। জানার কথাও নয়। আমরা পরামর্শক হিসেবে আছি। সেই হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। ভেতরের অন্য বিষয় আমাদের জানার কথা নয়। গবেষক হিসেবে গবেষণার কাজ করি।”

প্রকল্পটি গ্রহণ করার সময় এর পরিচালক ছিলেন বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো। বর্তমানে তিনি খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক।

যোগাযোগ করা হলে মিহির বলেন, “আমি এখন আর প্রকল্প পরিচালক নেই। বদলি হয়ে খুলনায় এসেছি। মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা বলা হয়েছিল। এর পরে কী হয়েছিল আমি তা জানি না। যেহেতু আমি আর প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই, বিস্তারিত জানাও নেই।”

ছয় মাস বাড়িয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান প্রকল্পটির বর্তমানে পরিচালক বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের এ বন সংরক্ষক বলেন, “মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটি যাছাই বাছাই করবে। প্রকল্পের এখানে কোনো সমস্যা নেই; আইইউসিএনকে রিক্রুট করার ক্ষেত্রে আইনেরও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ থাকলে তা মন্ত্রণালয়ই দেখবে।”