বনের বিনাশ বন্ধের ঘোষণায় বাংলাদেশ না থাকা অবিশ্বাস্য: টিআইবি

এভাবেই দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ফুসফুস। ব্রাজিলের কৃষক এবং কাঠচোররা আমাজন জঙ্গলের গাছ কেটে সাফ করে ফেলছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২৬) বন ধ্বংস বন্ধে বিশ্ব নেতারা যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশ একাত্মতা প্রকাশ না করায় উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলন থেকে ওই ঘোষণা আসার পরদিন বুধবার এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশের এমন সিদ্ধান্ত ‘চূড়ান্ত হতাশাজনক’ এবং ’অবিশ্বাস্য’।

১২৮ দেশের ওই ঘোষণার সঙ্গে অবিলম্বে একাত্মতা প্রকাশ করে বনাঞ্চল রক্ষায় সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

বন বিনাশের অবসান ঘটাতে অঙ্গীকার আসছে জলবায়ু সম্মেলনে  

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ৪৮ দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি হিসাবে বৈশ্বিক পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এবারের সম্মেলনে বেশ উচ্চকণ্ঠ।

কিন্তু জলবায়ু সম্মেলনের সবচেয়ে বড় সমঝোতায় একাত্ম হয়নি সরকার, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বন ধ্বংস বন্ধের অঙ্গীকার করেছে বিশ্বের ১২৮টি দেশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত ও মালদ্বীপ বাদে বাকি দেশগুলো এই সমঝোতায় একাত্ম হয়েছে।

বন রক্ষার এই অঙ্গীকারে স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে ব্রাজিলও রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমাজন অরণ্যের একটি বড় অংশের গাছ কেটে ফেলার।

তা তুলে করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, “ব্রাজিলসহ আফ্রিকার বহু দেশ এই ঘোষণায় যুক্ত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাড়া না দেওয়া অবিশ্বাস্য!

“অথচ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসেবে, বাংলাদেশে বার্ষিক বৈশ্বিক গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ বন উজাড় হয়, যা ২ দশমিক ৬ শতাংশ।”

বন ধ্বংসের ফিরিস্তি তুলে ধরে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুধু গত ১৭ বছরেই দেশের প্রায় ৬৬ বর্গকিলোমিটার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করা হয়েছে। আর বন বিভাগের হিসেবে, সারাদেশে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একর বনভূমি দখল হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি।

“এমনকি সরকারি-বেসরকারি নানা অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে পরিচিত সুন্দরবনও এখন হুমকির মুখে। এমন কঠিন বাস্তবতায় বৈশ্বিক এ ঘোষণায় বাংলাদেশের অবিলম্বে সম্পৃক্ত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।”

২০১৪ সালেও এরকম আরেকটি চুক্তির পরও বন রক্ষায় তেমন কোনো সাফল্য আসেনি। এ কারণে চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

এবারের নতুন ঘোষণায় লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৯ বছর সময়কে ’খুব স্বল্প’ হিসাবে অভিহিত করে আগের চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার প্রসঙ্গও বিবৃতিতে তুলে ধরেন ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, “এবারের ঘোষণা ব্যর্থ হলে ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জিরো কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হবে।

“তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশের উচিত, অবিলম্বে এই ঘোষণার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা এবং এর বাস্তবায়নে অধিক দূষণকারী রাষ্ট্রসমূহের কার্যকর ভূমিকা আদায়ে সচেষ্ট হওয়া।”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ কার্বন নির্গমন হ্রাসে কয়লার ব্যবহার বন্ধসহ ২০৩০ সালের মধ্যে বন রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে পর্যাপ্ত ও সময়াবদ্ধ অর্থায়ন নিশ্চিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়াস জোরদার করবে।”

বাংলাদেশের বনভূমিগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়লে বননির্ভর প্রায় দু’কোটি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাসহ পুরো দেশই হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিনি বলেন, “পরিবেশবাদীদের ক্রমাগত উদ্বেগ এবং স্থানীয় জনগণের তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদসত্বেও সরকার পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকায়- যেমন সুন্দরবনের কাছে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, কক্সবাজারের ঝিলংজা বনভূমির ৭০০ একর বন্দোবস্ত নিয়ে প্রশাসন একাডেমি স্থাপন এবং লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনে সাফারি পার্ক নির্মাণের মতো- নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

“অথচ এই প্রকল্পগুলোর কারণে পরিবেশের উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বন ধ্বংস আরও বৃদ্ধি পাবে। বন রক্ষায় হুমকি এধরনের প্রকল্পগুলো অবিলম্বে বাতিলে আমরা সরকারের শুভবুদ্ধি প্রত্যাশা করছি।”

একইসঙ্গে ২০২১ সালের পর আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদন না দেওয়ার দাবি জানান ইফতেখারুজ্জামান।