বিপন্ন প্রাণী, পরিযায়ী পাখি হত্যায় জামিন মিলবে না, সংশোধন হচ্ছে আইন

হাতি ও বাঘ হত্যার অপরাধে যে শাস্তি, অন্য বিপন্ন প্রাণী হত্যায়ও একই মাত্রার শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার।

সংশোধিত আইনে পরিযায়ী পাখি এবং সব বিপন্ন প্রাণী হত্যার মামলা ‘জামিন অযোগ্য’ এবং এই অপরাধ ‘আমলযোগ্য’ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (বন শাখা) দীপক কুমার চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন বিভাগ আইন সংশোধনের কাজ করছে। তারা খসড়া পাঠালে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে পরবর্তী কাজ করা হবে।”

উল্লুক বিপন্ন বন্যপ্রাণীর তালিকায় রয়েছে।

শাস্তির আওতা বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই আইনের অনেকগুলো বিষয় নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। শাস্তিসহ আরও কিছু বিষয় আছে। সবগুলো নিয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত নভেম্বর মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সর্ম্পকিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় ওই আইন পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়।

ওই বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী শুধু বাঘ আর হাতি নয়, সব বিপন্ন প্রাণী হত্যা শাস্তিযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।

ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

দেশে শকুন এখন অতি বিপন্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঘ ও হাতির মতো অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী হত্যাকে শাস্তিযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ সংশোধনের কাজ চলছে। 

বিদ্যমান আইনে বাঘ ও হাতি হত্যায় সর্বনিম্ন ২ এবং সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এই অপরাধ আমলযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য।

আইন সংশোধন হলে সব বিপন্ন প্রাণী হত্যা ‘জামিন অযোগ্য’ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চিতা বাঘ, লামচিতা, উল্লুক, সাম্বার হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, তিমি বা ডলফিন, পরিযায়ী পাখির মতো বিপন্ন প্রাণী হত্যায় শাস্তিও বাড়বে।

বর্তমানে এসব প্রাণী হত্যায় সর্বোচ্চ ৩ বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল এবং সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যায়।

এছাড়া পরিযায়ী পাখি হত্যার শাস্তি বর্তমানে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আছে।

বন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তারা শাস্তি বাড়িয়ে আইন সংশোধনের কাজ করছেন। মন্ত্রণালয়ে পাঠালে সেখানে সার্বিক বিষয় পরীক্ষা করা হবে।

সুন্দরবনে রয়েছে কুমির।

এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিপন্ন বন্য প্রাণীর হালনাগাদ যে তালিকা রয়েছে, সে অনুযায়ী এসব বন্য প্রাণী হত্যা করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে আইনের সংশোধন চলছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।

“সংশোধনের পর আইনটি পাস হলে হাতি ও বাঘ হত্যার মতো অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী হত্যার শাস্তিও বাড়বে।” 

বাংলাদেশ ১৯৮১ সালের ‘কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেনজারড স্পেশিস অব ওয়াইল্ড ফোনা অ্যান্ড ফ্লোরা (সিআইটিইএস)’ এবং ২০০৫ সালের ‘কনভেনশন অন দ্য কনভারসেশন অব মাইগ্রেটরি স্পেশিস অব ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস (সিএমএস)’-এ স্বাক্ষরকারী দেশ।

পরিযায়ী পাখির বিচরণ প্রায় সারাদেশে।

তাই, বিপন্ন বন্যপ্রাণীর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধ করতে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বিপন্ন প্রাণী রক্ষা আইন সংশোধনের পাশাপাশি এর যথাযথ বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিলুপ্ত প্রাণীর বিলুপ্তির ঝুঁকি হ্রাস করার ক্ষেত্রে আইনের এ সংশোধনী প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সফলতা নির্ভর করছে আইনের প্রয়োগের ওপর। আইন যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই আইন সংশোধনের উদ্দেশ্য সফল হবে।”