জলবায়ু বদলে বাড়ছে শিলাবৃষ্টি, বড় হচ্ছে শিলা

গেল ফেব্রুয়ারির শেষে ঠাকুরগাঁও সদরে এক দিন আধা ঘণ্টার শিলাবৃষ্টি আম ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি করে গেল। স্থানীয় বৃদ্ধ মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বললেন, শিলাবৃষ্টি প্রতিবছরই কম-বেশি হয়; কিন্তু এবার অল্প সময়ে যে পরিমাণ শিলা বর্ষণ হল, তেমনটা আর কখনও তিনি দেখেননি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে। তারা বলছেন, শিলাবৃষ্টির তীব্রতা এখন যেন আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। ঝড়ের সময় যে শিলগুলো পড়ছে, তার আকারও আগের চেয়ে বড় থাকছে।

এসব যে সাধারণ মানুষের নিছক কল্পনা নয়, তা বোঝা গেল ঢাকার স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের কথায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শিলাবৃষ্টি আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। বৈশাখের আগে পরে এটা হয় আমাদের দেশে। কিন্তু সমস্যা হল, এটার ফ্রিকোয়েন্সি, ইনটেনসিটি এবং ডিউরেশন বেড়েছে। অর্থ্যাৎ, আগের চেয়ে বেশি শিলাবৃষ্টি হচ্ছে, দীর্ঘসময় ধরে হচ্ছে আর শিলের যে আকার সেটাও বেড়েছে।”

কেবল বাংলাদেশেই যে এমন হচ্ছে তা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিস্তৃত এক প্রতিবেদনে বিবিসি লিখেছে, অনেক দেশেই এখন শিলাবৃষ্টির ধরন পাল্টে যাচ্ছে।

এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জেরে জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটাই হয়ত এর প্রধান কারণ।

শিলাবৃষ্টি কেন হয়

আবহাওয়ার ধর্ম হল, উষ্ণ বায়ু উপরের দিকে উঠবে, আর শীতল বায়ু নিচের দিকে নামবে। এর মধ্যে যদি শীতল পানির উৎস পাওয়া যায়, তখন মেঘে বরফ জমতে থাকে। এক পর্যায়ে বেশি ভারী হয়ে গেলে বাতাস আর সেটা বইতে পারে না, বজ্রমেঘের সঙ্গে সেই বরফ নেমে আসে শিলাবৃষ্টি হয়ে।  

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিলে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা থাকে বেশি। এর সঙ্গে আবহাওয়ার পাশাপাশি ভৌগলিক কারণও জড়িত।

“বজ্রমেঘ বা কনভেকটিভ ক্লাউড আমাদের দেশে তৈরি হতে পারে, আবার আমাদের দেশের বাইরে যেমন ওয়েস্ট বেঙ্গল, বিহার, ত্রিপুরা-মেঘালয়েও তৈরি হতে পারে। এদের ট্রান্সবাউন্ডারি বজ্রমেঘও বলে। অনেক সময় এই মেঘ দেশের বাইরে তৈরি হয়ে দেশে এসে পরিপক্ক হয়।”

শীতের পর সূর্যের উত্তরায়ন ঘটে। অর্থ্যাৎ সূর্য কিরণ এ অঞ্চলে লম্বভাবে ভূভাগে পড়ে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ হয়ে ওঠে উত্তপ্ত। দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বঙ্গোপসারের উপর দিয়ে বাতাস আসে জলীয়বাস্প নিয়ে।

“জলীয়বাষ্প আমাদের দেশের ভেতরে বেশি থাকে, আর বিহার-পশ্চিমবঙ্গে থাকে কম। একে একটা রেখা দিয়ে বিভক্ত করা যায়; একে বলে ড্রাই লাইন।

“তো ড্রাই লাইনের ডানে, অর্থ্যাৎ আমাদের দেশের ভেতরে বজ্রমেঘ তৈরি হয়। এজন্য রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, মাদারীপুর, পাবনা, বগুড়া, ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট- এই বরাবর মার্চ-এপ্রিলে বজ্রমেঘ তৈরির ঘনঘটা একটু বেশি থাকে।”

আবহাওয়াবিদ মল্লিক বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাতাস থাকে উত্তপ্ত ও শুষ্ক, তার সঙ্গে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সংস্পর্শে বজ্রমেঘ হয়; তাতে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়, তার সঙ্গে হয় শিলাবৃষ্টি হয়।

তবে এমনও দেখা যায়, কোথাও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে আবার কোথাও হচ্ছে না। কখনও রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওয়ে শিলাবৃষ্টি হল, কিন্তু একই বজ্রমেঘে বরিশালে শিলাবৃষ্টি হল না।

তিনি জানান, সাধারণত ১৪ হাজার ফুটের নিচে যদি হিমাংক রেখা (যেখান থেকে বাতাসের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে নেমে যায়) থাকে এবং সেখানে বজ্রমেঘ তৈরি হয়, তাহলে শিলা হয় আকারে তুলনামূলক বড়, কারণ এগুলো কম দূরত্ব পেরিয়ে নেমে আসে।

কিন্তু হিমাংক রেখা যদি আরও উপরে চলে যায়, সেক্ষেত্রে শিলাবৃষ্টির স্থায়ীত্ব কমে আসে, কারণ ওই দূরত্ব অতিক্রম করে ভূপৃষ্ঠে আসতে আসতে শিলাখণ্ড গলতে থাকে।

এই আবহাওয়াবিদও বলছেন, বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে।

“এই যে বজ্রমেঘ তৈরি এবং তা থেকে উৎপন্ন শিলাবৃষ্টি, এটা প্রতিবছরই আমাদের দেশে হয়। তবে ইদানিং এর চরিত্রে কিছুটা অস্বাভাবিকতা বিরাজ করছে।”

‘ঝড়ে এত বড় শিলা আগে দেখি নাই’

রাজধানীতে হঠাৎ শিলা বৃষ্টি  

ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝড়-শিলা বৃষ্টি, ছয়জনের মৃত্যু
বসন্তের শুরুতেই শিলাবৃষ্টির আভাস

শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট কৃষকের স্বপ্ন  

শিলাবৃষ্টিতে ফরিদপুরে ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজ চাষি  

''  

কী ঘটছে বাংলাদেশে?

ছেলেবেলায় শিল কুড়ানোর স্মৃতি অনেকের জীবনে যতটা মিষ্টি, কৃষকের জন্য শিলাবৃষ্টির অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর কিছু নয়। এমনকি কখনও কখনও তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

২০১৮ সালে চৈত্রের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শিলাবৃষ্টি হয়, সে সময় অন্তত ছয়জন মারা যান।

কয়েক জায়গায় শিলার আঘাতে টিনের চালা ফুটো হয়ে যায়; ঝড়ো হাওয়ায় ঘর উপড়ানোর পাশাপাশি ঝরে যায় আমের কুঁড়ি।

সেবার উত্তরের জেলাগুলোতেও ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এপ্রিলে ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে টানা ভারি বৃষ্টির সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে পেঁয়াজের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ বছর জানুয়ারিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি উপজেলায় আধা ঘণ্টার শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয় বোরো ধানের বীজতলা, সরিষা, গম, মসুর, খেসারি, পেঁয়াজ ও রসুনসহ নানা ধরনের ফল ও সবজি ।

বিবিসি বলছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে ভারি শিলাবৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৬ সালে গোপালগঞ্জে। সে সময় ১ দশমিক ২ কেজি ওজনের শিলাখণ্ডও নেমে এসেছিল আকাশ থেকে। সেই শিলাঝড়ে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, শিলাবৃষ্টি নিয়ে বাংলাদেশে বড় পরিসরে গবেষণা নেই। তবে তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, যেসব এলাকায় শিলাবৃষ্টি বেশি দেখা যাচ্ছে, সেসব এলাকায় বজ্রপাতও বেশি হচ্ছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ফর বাংলাদেশ’ বা এনএপির জিরো ড্রাফট প্রকাশ করেছে এ বছর জানুয়ারিতে। ২০১৮ সালের থার্ড ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অব বাংলাদেশ টু ইউএনএফসিসিসির বরাতে সেখানে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে বছর বছর শূন্য দশমিক ০০৫৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বাড়ছে বাংলাদেশে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বজ্রপাত ও ঝড়-সাইক্লোন।

২০১৮ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) এক পত্রে চা চাষের এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়, অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়।

সেখানে বলা হয়, “প্রতি বৈশাখে স্বাভাবিক কারণেই শিলাবৃষ্টি হয় এদেশে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া শিলাবৃষ্টির শিলার আকৃতিও দিনে দিনে বড় হয়ে যাচ্ছে। গড়ে একটা শিলার ব্যস হয় ৫ থেকে ১৫০ মিলিমিটারের মধ্যে।”

২০১৯ সালে কলোরাডোতে ঝড়ের সময় পড়া এই শিলের ব্যাস ১২ সেন্টিমিটার। ছবি: ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস, গুডল্যান্ড ফোরকাস্ট অফিস

অন্য দেশে কী হচ্ছে?

বিভিন্ন দেশে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা বদলে যাওয়া নিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বেশ কিছু ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

২০২১ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিস্টারশায়ারে শিলাবৃষ্টির সময় গলফ বল আকৃতির শিলা বর্ষণ শুরু হয়। তাতে কেবল জানালার কাচই ভাঙেনি, অনেক গাড়িও দুমড়ে যায়।

২০২০ সালের জুনে কানাডার ক্যালগারিতে যে শিলাবৃষ্টি হয়, তাতে একেকটি বরফ টুকরা ছিল টেনিস বলের সমান। ওই শিলাবৃষ্টিতে ৭০ হাজার ঘর আর যানবাহনের ক্ষতি হয়, নষ্ট হয় ফসল। মেরামত আর ক্ষতিপূরণে ব্যয় হয় ৯৪ কোটি মার্কিন ডলার।

টেক্সাস, কলোরাডো, অ্যালাবামায় গত তিন বছরে রেকর্ড ভেঙে দেওয়া শিলাখণ্ড দেখা গেছে; ১৬ সেন্টিমিটার বা ৬ দশমিক ২ ইঞ্চি ব্যাসের শিলা খণ্ডও ঝড়েছে সেসব এলাকায়।

২০২০ সালে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি অচল করে দিয়েছিল ১৮ সেন্টিমিটার বা ৭ ইঞ্চি ব্যাসের শিলার স্তূপ।      

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপক শিলাবৃষ্টির পর মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা শহরের ছয়টি এলাকা দেড় মিটার বরফের নিচে ঢাকা পড়ে যায়। রাস্তার গাড়িগুলোও বরফে ডুবে যায়।

ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির পথঘাট শিল জমে এতটাই সাদা হয়ে যায় যে অনেকে ওই পরিস্থিতিকে শিকাগো কিংবা লন্ডনের তুষারপাতের সঙ্গে তুলনা করেন। সেদিন সন্ধ্যায় দিল্লি বিমানবন্দরে ৩০টির বেশি ফ্লাইট স্থগিত করতে হয় শিলাবৃষ্টির কারণে।

বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর এখন শিলাবৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে গড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার।    

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে হুমকির মুখে হিমালয়ের হিমবাহ
ছয় দশকে দেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস

দেশে ৭ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা
ঢাকা নগরীতে ২৫ ‘হিট আইল্যান্ড’

বিশ্বে ‘সবচেয়ে দূষিত’ বাংলাদেশের বাতাস  

২০১৮ সালে মধ্য চৈত্রে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি

শিলের টুকরা কত বড় হতে পারে?

ইউএস ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুসারে, ঘণ্টায় ১০৩ কিলোমিটার বেগের ঊর্ধ্বমুখী বাতাস একটি গলফ বলের সমান শিলার টুকরা ধরে রাখতে পারে। আবার ২৭ শতাংশ ক্ষেত্রে শিলার টুকরা বেসবল আকার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।

প্রচণ্ড ঝড়ের মেঘে তৈরি হওয়া একেকটি শিলা আকারে ২৫ মিলিমিটার বা এক ইঞ্চিরও বেশি হতে পারে।

আগে গবেষকদের ধারণা ছিল শিলার টুকরা গোলাকার হয়। সম্প্রতি এই ভুল ভেঙেছে তাদের। দেখা গেছে, রাগবি বলের মত উপরিভাগ সমতল হতে পারে শিলাখণ্ডের।

শিল আকারে যত বড় হবে, এর বাইরের গড়ন তত এবড়োখেবড়ো হবে। এতে করে বাতাসের বাধা কাটিয়েও দ্রুত মাটিতে আঘাত করতে পারে একেকটি শিলের টুকরা। আর যত জোরে নিচে আছড়ে পড়বে, ক্ষয়ক্ষতি তত বেশি হবে। 

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ কুমজিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গত দুই দশকে অন্তত ১০টি প্রতিবেদনে ছয় ইঞ্চিরও বেশি ব্যাসের শিলের তথ্য মিলেছে। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ এক কেজি ওজনের শিলাখণ্ড মিলেছে সেখানে।

শিলাবৃষ্টি: দেড় মিটার বরফের চাদরের নিচে মেক্সিকোর শহর

দিল্লিতে হঠাৎ প্রবল শিলাবৃষ্টি

২০১৮ সালে শিলার আঘাতে টিনের চালা ফুটো হওয়ার এই ছবি লালমনিরহাটের।

উষ্ণায়নই কারণ?

কানাডা সরকারের সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেইঞ্জ কানাডার বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান ব্রিমেলো শিলাবৃষ্টির ধরনে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, শিলার টুকরোগুলোর আকার বড় হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আর্দ্রতা, ঊর্ধ্বমুখী বাতাসের চাপ দরকার হয়। আর বিশেষভাবে প্রয়োজন হয় গরম ও শীতল বাতাসের উপস্থিতি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট প্লেইন এবং অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টের মত বিশেষ কিছু অঞ্চলে প্রবল শিলাবৃষ্টি দেখা যায়।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের মাত্রা বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে আর্দ্রতা। 

“পৃথিবী যেখানেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, সেদিকেই শিলাবৃষ্টিপাত বাড়ছে। এখন যে অঞ্চলে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নেই, সেসব জায়গাতেও ধীরে ধীরে একসময় আর্দ্রতা বাড়তে থাকবে; আর তাতে শিলাবৃষ্টিও বাড়বে।”

জলবায়ুর পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, অস্ট্রেলিয়া আর ইউরোপে শিলাবৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে। অন্যদিকে কমে আসবে পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায়। এবং আগামীতে আরও ভারী শিলাবৃষ্টি হবে।

ব্রিমেলো ও তার সহকর্মীরা উত্তর আমেরিকায় শিলাবৃষ্টির কমে আসার কথা জানালেও সেখানে শিলার আকার আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন।

ফ্রান্সে নরম উপাদানে বানানো এক ধরনের ব্লক বিছিয়ে গবেষণা করেছেন এই গবেষক দল, ওই ব্লকের নাম তারা দিয়েছেন ‘হেইল প্যাড’। শিলাখণ্ড এই প্যাডে আছড়ে পড়লে এর আকার ও সংখ্যার ধারণা পাওয়া যায়।

দেখা গেছে, গরম যত বেড়েছে, বড় বড় শিলাখণ্ড আছড়ে পড়ার প্রবণতা তত বেড়েছে।

একটি শিলার প্রস্থচ্ছেদ করলে ভেতরের স্তর বিন্যাসে বোঝা যায় উপরের বাতাসে কতবার ঘুরেছে এই জমাট জলকনা। 

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা রাজ্যের অরোরা শহরে পাওয়া ১৭ সেন্টিমিটার বা ৭ ইঞ্চি ব্যাসের শিলাখণ্ড নিয়ে নিরীক্ষা করে দেখেন গবেষকরা। 

৫০০ গ্রাম ওজনের শিলাখণ্ডটির একেবারে ভেতরে স্পঞ্জের মত বাতাস, আর উপরে স্বচ্ছ বরফের আস্তর জমেছিল। যদি এটি বাতাস ছাড়া নিরেট বরফখণ্ড হত, তাহলে ভলিবল আকারের ব্যাসের এমন বরফ খণ্ডের ওজন হত আড়াই কেজির মত।

ব্রিমেলো বলেন, ২৬ মিলিমিটার বা এক ইঞ্চি ব্যাসের শিলার টুকরা প্রতি সেকেন্ডে ১১ থেকে ২২ মাইল গতিবেগে নেমে আসে। আর ২৫ থেকে ৪৫ মিলিমিটার বা এক থেকে এক দশমিক ৭ ইঞ্চি ব্যাসের শিলাখণ্ড প্রতি সেকেন্ডে ২২ থেকে ২৯ মাইল বা প্রতি ঘণ্টায় ৪৯ থেকে ৬৫ মাইল গতিতে ঝরে পড়ে। 

এমন গতিবেগে আছড়ে পড়া শিলাখণ্ড ছাদে ফাটল ধরাতে বা গাড়ির কাচ ভেঙে দিতে পারে। মাঠের ফসল নষ্ট এবং মানুষ ও প্রাণিদের আহতও করতে পারে। এসময় বিমান চলাচল করলে শিলার আঘাতে ক্ষতি হতে পারে।

বাংলাদেশের আবহওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে শিলাবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বলা থাকলেও শিলার পরিমাণ বা আকার নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। 

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “আমাদের রেকর্ডে প্রতি বছরই শিলাবৃষ্টি হয়েছে। কখনও কখনও আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি ডায়ামিটারের শিলা পাওয়া গেছে। তবে শিলা বড় হচ্ছে কি না, এরকম স্টাডি আমাদের এখনও নেই।”           

তবে বাংলাদেশে বায়ু দূষণ যেহেতু বাড়ছে, তার সঙ্গে শিলার আকার বড় হওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে মনে করেন মল্লিক।

তিনি বলেন, “বাতাসে ভারী বস্তুকণা যদি বেড়ে যায়, এদের ফরেইন পার্টিকল বা ডোপিং পার্টিকেল বলে, বিশেষ করে শিল্প এলাকায় এটা হয়, তাতে শিলাবৃষ্টির ঘনঘটাও বেড়ে যেতে পারে।”