শ্রীদেবীর অন্তকথন

চলচ্চিত্রে যতটা প্রাণবন্ত, ব্যক্তিজীবনে তার উল্টো। কিশোর থেকে যৌবন রুপালি পর্দায় কেটেছে জীবন।

শ্রীদেবির কথা স্মরণ করে লিখলেন আরাফাত শান্ত।

চলচ্চিত্র পরিচালক রাম গোপাল ভার্মা শ্রীদেবীর চলে যাওয়ার পর একটা সুন্দর টুইট করেছিলেন। যার সারমর্ম হলো, ‘ক্লান্তিকর কিন্তু তারকাখচিত এক জীবনের পরিসমাপ্তি।’

সেই কিশোর বয়সে অভিনয়ে নেমে বাবা-মা কে বানিয়েছেন লোভী। সন্তানের চেয়ে মেয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে পারিবারিক আয়ের প্রধান উৎস। তামিল সিনেমাতে তিনি যেসব হিরোর বিপরীতে অভিনয় আর নাচ গান করতেন তাদের কেউ কেউ তার পিতার চাইতেও বয়সে বড়। স্কুল কলেজ বাদ, সারাদিন খালি সেটে সেটে কাজ কর। মালায়লাম, হিন্দি তামিল, কানাড়া, তেলেগু সব ভাষায় কাজ করেছেন।

রাম গোপাল জানিয়েছিলেন, ‘এত কষ্টের অর্জিত টাকা নিয়ে পরিবারে অশান্তি আর ঝগড়া না হলে তিনি কোনোদিন এক প্রডিউসারকে বিয়ে করতেন না।’

তাই শ্রীদেবীর শুধু গ্ল্যামার নয় তার প্রদীপের নিচে অন্ধকার জীবনের গল্পও সবার জানা উচিত।

এমনিতেই ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি নানান কারণে আমাদের জন্য শোকের। এই দিনগুলোর কথা মনে আসলে কেমন জানি নিজেকে আরও তুচ্ছ ভাবা শুরু করি। বিডিআর নিহত অফিসারদের পরই মনে পড়ে শ্রীদেবীর অকাল প্রয়াণের কথা।

শ্রীদেবী কত বড় অভিনেত্রী তা নিয়ে লিখবো না আজ। অনেক মানুষ পোস্ট দেবে, শ্রীদেবী মারা গেলে আমাদের কী? যেমন শুনেছিলাম ববডিলান নোবেল পেলে আমাদের কী?

আমাদের কিছুই না। আবার আমাদের অনেক কিছু। আমি বা আমরা কোনোদিন নায়িকা শ্রীদেবীর কাছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখি না, স্বপ্নেও ভাবি না দেখা পাওয়ার। তবুও ভালোবাসি কারণ তাদের অভিনয় আমাদের ভালো লাগে। মনে করিয়ে দেয় তাদের প্রথম দেখার অনুভব, অগনিত সিনেমা নিয়ে নস্টালজিয়া।

আমি বড় হই নস্টালজিয়া আর এইসব অনুভবকে সঙ্গে নিয়ে। বয়স বাড়লে তারাই হয় কাছের মানুষ। এদের কারও বিদায় মানে নিজের ভেতর থেকে একটু একটু খালি হয়ে যাওয়া। এভাবেই প্রিয় অভিনেতা শিল্পী লেখকের চলে যাওয়া আমাদেরকে এক শূন্যের সাগরে ভাসায়, মনে হয় আমিও হারিয়ে যাচ্ছি এদের সঙ্গে।

শ্রীদেবীর ‘চালবাজ’ সিনেমার এক গানের কথা, ‘কিসি কি হাত না আইয়ি হ্যায় ইয়ে লারকি’। গায়ে ১০৩ জ্বর নিয়ে তিনি এটার শুট করেছেন। গানের কথার মতোই সবার ধরা ছোয়ার বাইরে চলে গেলেন প্রিয় শ্রীদেবী।

পর্দায় শ্রীদেবী এত ‘স্পন্টেনিয়াস’, লাস্যময়ী অথচ তিনি ব্যক্তিগতভাবে মৃদুভাষী আর খুব নম্র কথার এক মানুষ। পরিবার নিয়েই ছিল তার জীবন, যা মজা করতেন তাদের সঙ্গেই।

সরোজ খান, অভিনেত্রী সারিকা, নায়িকা শ্রীদেবী এরা একদম অন্য ধরনের এক শৈশবে বড় হওয়া।

সরোজ খান তিন বছর বয়স থেকে সিনেমায় ‘ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার’ হয়ে সংসার চালান। সারিকা বাসায় খুব কম সময় কাটিয়েছেন, পাঁচ বছর থেকে তিনি শিশু অভিনেত্রী। স্কুলে যান নাই। টিউটর এসে পড়িয়ে যেত। কোনো ছেলে-মেয়ের সঙ্গে আলাপই করতে পারতেন না ফিল্মের লোকদের বাইরে।

কারণ স্টুডিও আর স্টুডিওতে বড় হওয়া সারিকার সেই দক্ষতা ছিল না।

শ্রীদেবীর কথাই ধরা যাক, সদ্য কিশোরী হয়ে পিতার বয়সি সব নায়কদের সঙ্গে নাচ-গান করতে হত। এসব অদ্ভুত মিথস্ক্রিয়া নিয়ে কখনও সিনেমা টিনেমা হয় নাই।

পল রাশ আর জুড এপাটোর নেটফ্লিক্সে সিরিজ আছে। যেখানে দেখায় ‘প্রোটাগনিস্ট’ এরকম এক শিশু অভিনেত্রীর ‘সেট টিউটর’য়ে কাজ করে।

শ্রীদেবীর সিনেমা আমি দেখেছি অনেক পরে। ক্লাস এইটে থাকতে যেদিন এক বন্ধুর বাসায় ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ দেখেছিলাম। ‘হাওয়া হাওয়াই’ গানটা অনেকদিন আমার মাথায় ঢূকে বসেছিল। তারপর তো শ্রীদেবীর অনেক সিনেমাই দেখা হয়েছে কিশোর বেলায়।

এর ভেতর মনে পড়ে এক বৃষ্টিস্নাত শুক্রবারে এক বন্ধুর বাসায় ভিসিডিতে দেখেছিলাম ‘লাডলা’ আর ‘চালবাজ’। ছোট মানুষ তখন খুব সহজেই মুগ্ধ হই। তা অঞ্জন দত্ত আর ওয়ারফেইজ যাই হোক।

এরপর তো শ্রীদেবীর কত সিনেমাই দেখলাম। একজন বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হিসাবে তিনি দারুণ, তার চেয়েও সাবলিল তার ‘এক্সপ্রেশন’। হলিউড হলে তিনি কত অসাধারণ সব সিনেমা করতে পারতেন, কিন্তু বলিউডে অজস্র বাজারী সিনেমার ভীড়ে শ্রীদেবীও অপ্রাসঙ্গিক হবে সহজেই।

আমাকে আরও অবাক করে শ্রীদেবীর সাক্ষাৎকার,  দেখবেন এত শান্তশিষ্ট, প্রতিটা কথার মাত্র পাঁচ ছয় শব্দে জবাব। তার ভেতরে একটা জবাব আমার খুব প্রিয়, ‘এমনিতে আমি লোকজনের সঙ্গে মিশি না, বাসায় আমি এমন না, ছোটবেলা থেকেই বাসায় এত মজার কাণ্ড করতাম বলে আমাকে বাসার সবাই জোকার বলতো।’

‘ইংলিশ ভিংলিশ’ দিয়ে শ্রীদেবী অনেকদিন পরে আবার ফেরত আসেন দারুণ ভাবে। সিনেমাটার চিত্রনাট্য এত ভালো ছিল যে, শ্রীদেবীর অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে দারুণ ভাবে।

আমার ধারণা ছিল যদি শ্রীদেবীর মেয়েরা আরও বড় হয়ে গেলে, তাদের সময় আরও কম দেওয়া যখন লাগবে তখন শ্রীদেবী আরও ভালো অভিনয় করতে পারবেন।

কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস তার আগেই তিনি চলে গেলেন।

তবে এমনিতে ভাগ্য তার সহায় ছিল। তার যে দুটি ছবি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল- ‘চাদনী’ ও ‘নাগিন’ দুটোতেই তিনি প্রথম ‘চয়েজে’ ছিলেন না।

তার বেশির ভাগ ছবি ব্যবসা সফল। জীবনের অনেক আয়োজনের আগেই হুট করেই তিনি চলে গেলেন ২০১৮ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি। প্রয়াণ দিবসে স্মরণে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।