মুক্তিযুদ্ধ থেকে চর্চার মুক্তিতে  আজম খান

২৮ ফেব্রুয়ারি। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো সত্তর বছর। সে শুধু কাগজে কলমে।

পপগুরু আজম খানের বয়স গিটারের তারে আটকে আছে সেই ২১ ছোঁয়া বয়সে যখন কবির ভাষায় তরুণরা দুমড়ে মুচড়ে দেয় সকল বাধা।

বলছি আজম খানের কথা!

সে সময় হাতে স্মার্ট ফোন ছিল না। ছিল না কোনো সেলফির তাড়াহুড়ো। এমনই দিনে তার সঙ্গে দেখা- কথার সৌভাগ্য হওয়াটা চাট্টিখানি কথা না। কারণ স্মৃতির থেকে বড় ধারক আর কিছু নেই।

পেশাগত কাজে অনেকবার সাক্ষাৎ হলেও সামনে যখন গুরু আজম খান, বুকটা কেঁপে উঠবেই। যার গানে ছোটবেলা উত্তাল সেই লোকটা সামনে কেমন?

আমি যখন তাকে দেখি তখন তিনি পড়ন্ত বিকেলের জবা ফুলের মতন। সকালে পুঁজোর থালার নেওয়া জমা অর্চনা রূপে যেমন একটু নিস্তেজ তবুও সতেজ- অনেকটা তেমনই।

তার সঙ্গে গল্প বলা একটি বিজ্ঞাপনের জন্য। একটি টেলকো কোম্পানির জন্য তার গল্প নেব। কীভাবে তিনি দিনটাকে বদল করলেন। কীভাবে তিনি একটার পর একটা যুদ্ধ করে গেলেন- এই নিয়েই আমার কাজ। গল্পটা লিখতে হবে।

কমলাপুরের বাসাটা দেখলে কে বুঝবে এই বাসায় থাকেন সেই মুক্তিযোদ্ধা যার হাতের মেশিনগান বা গিটার যখন ঝলসে উঠতো তখন কাঁপতো ঢাকা শহর।

তাহলে সেই গল্পটাই হোক।

১৯৫০ সালের আজিমপুরে জন্ম নেওয়া একই হালকা পাতলা গড়নের মানুষটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে থাকেন আগুনে পোড়া লোহার মতন শক্ত।

কলোনি ছেড়ে কমলাপুরে নিজেদের বাসস্থানে উঠেন যখন তখন সবে এসএসসি দিয়েছেন। সাল ১৯৬৮। এই কাঁচা বয়সেই ১৯৬৯ সালে তিনি গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে রক্তের দাপট দেখান। ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর হয়ে সরাসরি পাকিস্থানী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

১৯৭১ সালে সরকারী চাকুরে বাবার উৎসাহে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। পায়ে হেঁটেই চলে গেছেন আগরতলা।

যোদ্ধাদের উজ্জীবিত রাখতে গানটাই তখন প্রেরণার উৎস। গণসঙ্গীত গাইতেন তখন। আব্দুল লতিফের লেখা গানই ছিল সঙ্গী।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমীর কাছে এলএমজি, রাইফেল চালানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

মাত্র ২১ বছর বয়সে আজম খান কুমিল্লার একটি সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ।

এই ২১ বছরের দাপুটে ছেলেটা যুদ্ধের পর সাদামাটা জীবনে ফিরে এসে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করেন পপ ঘরানার সঙ্গীত নিয়ে। তখন ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে থাকা টানাপড়েনে ‘বিদেশি ঘরানার’ সুর নিয়ে এগিয়ে চলাটা অনেকের কাছেই পাগলামি ছিল।

কিন্তু আজম খান বলেন, “পাগলামি না করলে জয় পাওয়া যায় না। সেই যুদ্ধ যেই যুদ্ধই হোক।”

নিজেই জানান কীভাবে নানান শো’তে তাকে কটু কথা শুনতে হয়েছে। সিনেমা হলে তখন টিকেটের বিনিময়ে গানের অনুষ্ঠান হত। সেখানে অনেকের ফাঁকে নিজের জায়গা করে নিতে হত।

১৯৭২ সালে এভাবেই পেলেন জয়। বিটিভিতে প্রচরিত হল তার ব্যান্ডের কনসার্ট। তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং লাকী আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দের সুবাদে সংগীত রাজ্যে উত্তাল ঢেউ নিয়ে ফিরে আসেন আজম খান। ঠিক সেভাবে যেভাবে ১৯৭১ সালে সদলবলে পরাজিত করেন হানাদারদের।

সঙ্গ একধরনের প্রভাবকই বটে। তাই পাড়ার বন্ধু ফিরোজ সাঁই এবং ফকির আলমগীরকে নিয়ে গানের যুদ্ধ চলতে থাকলো তার। সংযুক্ত হলেন পিলু মমতাজ এবং ফেরদৌস ওয়াহিদ।

বন্ধু ইশতিয়াকের অনুপ্রেরণায় তৈরি করেন একটি অ্যাসিড-রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’ বলা হয়ে থাকে এটি বাংলা গানের ইতিহাসে- প্রথম হার্ডরক।

১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে তিনি বিটিভিতে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ গানটি গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন।

যুদ্ধে শ্রবণশক্তিতে খাদ পড়লেও জীবনীশক্তি কেড়ে নিতে পারেনি তার কেউ।

এই রক সম্রাটের ভীষণ সাধারণ জীবনে বেঁচে থাকার পরেও কণ্ঠের জৌলুস কমেনি। বিজ্ঞাপনে হোক বা কোনও কনসার্টে- কেউ তার হাতের পায়ের ভঙ্গীমাতে কখনও বদল চোখে দেখেননি।

বিজ্ঞাপনটিতে তার তরুণ চরিত্রে অভিনয় করেন দ্রিক ব্যান্ডের ভোকাল সাইফ। চিত্রায়ণে অংশ নেয় গোটা দ্রিক ব্যান্ড।’ তখন আমি ওই বিজ্ঞাপনী সংস্থার সৃজনশীল লেখক দলের একজন।

বিজ্ঞাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, “থ্যাংক ইউ..” অথচ তা বলার কথা ছিল আমাদের।

আমরা যারা জৌলুসের পেছনে ঘুরে ভুলে যাই দ্বায়িত্ব- তাদের।

একজন আজম খান শিল্পী, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সুরযোদ্ধা। তিনি কোনো কারণে ন্যায়ের দাবী থেকে সরে আসেননি।

এরপর আরেকটি আয়োজনে তাকে পেয়ে বলেই ফেলি, “একটা ছবি তুলি?”

তিনি বললেন, “আরে আসো! কি কয়?”

এই ছোট্ট জীবনে এটাই আমার অন্যতম প্রিয় প্রাপ্তি। একজন লেজেন্ডের সঙ্গে একটা ছোট্ট মুহূর্ত।

আমার বয়সটাও সেখানেই আটকে গেছে। যেমন আটকে গেছে আজম খানের বয়স, সেই ২১-এ। সেই সময়- যখন থেকেই তিনি যোদ্ধা। যোদ্ধাদের মৃত্যু নেই- বয়স নেই, বিনাশ নেই।

সুকান্তের মতো তাই বলতেই হয়-

‘হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন

জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,

গত আকালের মৃত্যুকে মুছে

আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ।’