কবরী: হিরোদের স্মৃতিপটে প্রথম সে হিরোইন

ঢালিউডের শীর্ষ নায়কদের মধ্যে আলমগীর, ফারুক, জাফর ইকবাল, উজ্জ্বল ও সোহেল রানার বড়পর্দায় অভিষেক ঘটেছিল ষাটের দশকের ‘হার্টথ্রব’ নায়িকা সারাহ বেগম কবরীর বিপরীতে; ক্যারিয়ারের প্রথম নায়িকাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন সোহেল রানা ও আলমগীর।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাতে মারা গেছেন কবরী। শনিবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে এ কিংবদন্তী চিত্রনায়িকাকে।

ষাটের দশকে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারে বেড়ে উঠা ভীরু ডাগর চোখের কিশোরী মিনা পাল মাত্র ১৪ বছর বয়সে নির্মাতা সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বড়পর্দায় যাত্রা শুরু করেন।

কয়েক বছরের ব্যবধানে নির্মাতা জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘বাহানা’ ও নির্মাতা খান আতাউর রহমানের ‘সোয়ে নদীয়া জাগে পানি’ সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কবরীর ভ্রু’র তালে উত্তাল হয়েছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া।

তারকা কবরীর বিপরীতে নায়ক হিসেবে তরুণ সোহেল রানার অভিষেক ঘটে সত্তরের দশকে; ১৯৭৪ সালের ২৪ মে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রে। ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেছিলেন সোহেল রানা।

ক্যারিয়ারের প্রথম নায়িকা হিসেবে কবরীকে আজীবন ‘হিরোইন’ বলে সম্বোধন করেছেন সোহেল রানা; আর সোহেল রানাকে ‘পারভেজ ভাই’ বলে ডেকেছেন করেছেন কবরী।

নায়ক হিসেবে ‘মাসুদ রানা’ সোহেল রানার প্রথম চলচ্চিত্র হলেও প্রযোজক হিসেবে এর আগে ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দর্শকদের মাঝে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।

শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবরীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাসহ নানা বিষয়ে কথা বললেন সোহেল রানা।

“তখন স্টার আর্টিস্টরা নতুন পরিচালক কিংবা হিরোদের সঙ্গে কাজ করা নিয়ে দোটানায় থাকতেন। কিন্তু কবরীকে যখন আমার ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলাম, তিনি জানালেন, কাজটি করবেন। পরে উনি হাসতে হাসতে বললেন, ছবিতে আরেক নায়িকা কে? বললাম, অলিভিয়া। এবার খুনসুটি করে বললেন, ওর দিকে আবার বেশি তাকাবেন না তো!”

“সহজেই মানুষকে আপন করে নেওয়ার অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল তার। সেইদিন থেকে আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। নতুন ডিরেক্টর কিংবা নায়ক হিসেবে আমি যাতে তার সঙ্গে কাজ করতে ইতস্তত বোধ না করি সেকারণেই তিনি মজার ছলে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন।”

পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘সুজন সখী’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘সারেং বউ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’সহ দুই শতাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে আলো ছড়িয়েছেন কবরী।

তার সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগের নায়ক ছিলেন রাজ্জাক। উপমহাদেশে যখন উত্তম-সুচিত্রার জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া তখনই বাঙালির চিরায়ত জুটিতে পরিণত হয়েছিলেন রাজ্জাক-কবরী।

‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘পরিচয়’, ‘অধিকার’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সোনালী আকাশ’, ‘অনির্বাণ’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘রংবাজ’ সহ অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন তারা।

‘রংবাজ’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কবরীকে লাস্যময়ী হিসেবে দেখা গেলেও ষাট ও সত্তরের দশকের দর্শকের কাছে তার মূল আবেদন ছিল বাড়ির পাশের মিষ্টি মেয়ে রূপে। যে নারী ঘরের, যে নারী অতি আপন, যে নারী বাংলার প্রকৃতির মতোই কোমল ও স্নিগ্ধ, সে রূপেই দর্শক হৃদয়ে চিরস্থায়ী কবরী।

কবরীর মাঝে দর্শকরা আবহমান বাংলার চিরায়ত নারীর প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মনে করেন সোহেল রানা।

“বাংলার নারীদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে আমরা যেমনটা অনুভব করি কবরীকে তেমনভাবেই সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। এখনকার নায়ক-নায়িকারা সবাই একই রকমভাবে কথা বলে। চুলে নানা রঙ করে। কিন্তু বাংলার সাধারণ নারীকে এমনটা কেউ কল্পনা করে না।”

“বাংলার মানুষকে মিষ্টি মেয়ের কথা ভাবতে বললে শুধু কবরীর কথাই ভাবে। সেকারণেই তাকে ‘মিষ্টি মেয়ে’ বলা হয়। বাংলার মানুষের অন্তর থেকে এ উপাধি এসেছে। এমনকি গ্রামে যারা হালচাষ করেন তারাও বলবেন কবরী মিষ্টি মেয়ে; কবরী বাংলার মেয়ে। কবরী তুলনাহীন।”

সোহেল রানা জানালেন, কবরী ব্যক্তিগত জীবনে বেশ আমুদে ছিলেন; জমিয়ে আড্ডায় দিয়ে চারপাশ মাতিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। কাছের মানুষদের সঙ্গে খুনসুটি করতে ভালোবাসতেন; অবসরে গল্পের বইয়ে ডুবে থাকতেন। আর নতুন কোনও বিষয়ে তার জানার আগ্রহ ছিল প্রবল।

“আমার সঙ্গে কথা বলে তখন রাজনীতি নিয়ে আলাপ করে। ছোটভাইয়ের (নায়ক রুবেল) সঙ্গে ফিটনেস নিয়ে কথা বলে। মানুষের সঙ্গে আলাপ করে নতুন কিছু শিখতে চাইত। জানার আগ্রহ কবরীকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।

“শেষ দশ-বারো বছরে কবরীর বক্তব্য যারা শুনেছেন তারা বলতে পারবেন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ নিয়ে কতটা ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করতে পারতেন তিনি। শিল্পী হিসেবে, মানুষ হিসেবে কবরী তুলনাহীন। শি ওয়াজ অ্যা ট্রু লিজেন্ড। বাংলাদেশে অনেক বড় বড় আর্টিস্ট পাওয়া যাবে কিন্তু কবরীকে পাওয়া যাবে না।”

১৯৭৩ সালে পরিচালক আলমগীর কুমকুমের পরিচালনায় ‘আমার জন্মভূমি’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার অভিনয় করেছিলেন আলমগীর; নায়িকা ছিলেন কবরী।

আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তিনি তখন নবীন শিল্পী ছিলেন; জ্যেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে প্রথম ছবির শুটিংয়ে সবসময় খোঁজখবর রাখতেন কবরী। নিজের টাকায় চকি, চাদর কিনে এনে শুটিংয়ের সেটে আমাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করতেন।

আলমগীর বলেন, “কবরী আমাদের শ্রদ্ধেয় আপা। মানুষ হিসেবে দুর্দান্ত ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। আর শিল্পী হিসেবে যাচাই করার ক্ষমতা আমার নাই। যাচাই করতে চাওয়াটাও আমার জন্য ধৃষ্টতা।”

কবরীর তারকা জীবন যেমন ছিল

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবরী বলেছিলেন, “মানুষের কাছাকাছি যেতে পারি না। নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকতে হয়। মানুষের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্যও অনেকে এটা করে। কারণ বাজারে ২৪ ঘণ্টা ঘুরলে কোনো তারকার আর দর থাকে না।”

তারকারা যে ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তা সাধারণ মানুষকেই প্রতিনিধিত্ব করে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে না পারলে চরিত্রায়নে কোনো প্রভাব পড়ে কিনা?

এমন প্রশ্নের জবাবে কবরী জানিয়েছিলেন, চট্টাগ্রামের একটি হাসপাতালে জন্ম নেওয়ার পর পুরো জীবনটাই শহরে কেটেছে তার; তবে অনেক চলচ্চিত্রেই গ্রামের নারীর চরিত্রও তুলে এনেছেন পরিচালকের চিত্রনাট্য ধরে।

“পরিচালক যখন কোনো চিত্রনাট্য বুঝিয়ে দেন সেটা ভালোভাবে রপ্ত করি। একেবারে সাধারণের সঙ্গে যে মিশি না তা কিন্তু নয়; আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েকে দেখি। ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছি। বাচ্চা হলে পেট ব্যথা করে কি না সেটাও তখন জানতাম না। সেটা মায়ের কাছ থেকে শিখেছি।”

এর বাইরে চলচ্চিত্র দেখে, বই পড়ে নিজেকে ঋদ্ধ করার চেষ্টা করতেন বলে জানিয়েছিলেন কবরী।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি

অভিনেত্রী কবরী একাত্তরের উত্তাল সময়ে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ভারতের বড় বড় শহরে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। সেখানে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেন। পরে দেশে ফিরে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন সিনেমায়।

সেলুলয়েডের সেই রঙিন জীবন শেষে কবরীর পরের জীবন-চলচ্চিত্রও কম বর্ণময় ছিল না। রাজনীতিতে নেমে জীবনের আরেক চলচ্চিত্রের মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছিল বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে।

এক সময় নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বধূ কবরীকে ভোটের মাঠে সেই নারায়ণগঞ্জেই নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সব জয় করেই ২০০৮ নবম সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাংসদ হয়েছিলেন তিনি।

২০০৬ সালে মুক্তি পায় কবরীর পরিচালার প্রথম চলচ্চিত্র ‘আয়না’। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও যোগ দিয়েছিলেন।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে ‘এই তুমি সেই তুমি’ নামে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন তিনি। সে কাজ আর তার শেষ হল না।