রূপকথার রাজকুমার- ওয়াসীম

তিনি ছিলেন নায়ক। সে রূপকথার হোক বা গ্রামের কোনো চরিত্রের; তিনি ওয়াসীম।

মিষ্টি মেয়ে কবরীর অন্তিম যাত্রার রেশ না কাটতেই চলে গেলেন দুর্দান্ত নায়ক ওয়াসিম।

পর্দায় যার বয়স বাড়েনি, বাস্তবে যিনি নায়ক ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না।

রুপালি পর্দার এই রূপকথার রাজপুত্রকে নিয়ে লিখলেন আরাফাত শান্ত।

নায়ক ওয়াসীমের মৃত্যুর খবর শুনে মনে হলো আমাদের চেনা ভূবন আস্তে আস্তে কীভাবে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরই আবার শুনলাম অভিনয় শিল্পী এস এম মহসীন মারা গেছেন। মৃত্যু আমাদের কাছে শোকের হলেও কিছুটা অবশ্য উদযাপনের ব্যাপারই। চলে যাওয়ার পরই একজন মানুষের জীবনকে পুরোটা নৈর্ব্যক্তিক ভাবে দেখা যায়। সেখানে এসব অকাল মৃত্যু শুধুই বেদনার্ত ও শূন্য করে তোলে।

অধিক গ্রামীণ ও রূপকথার রাজা বাদশা ধরনের সিনেমা করার জন্য যেটা অনেকেই জানে না নায়ক ওয়াসীম খুবই অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করা লোক।

পাকিস্তান আমলে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা। প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় ‘মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান’ হয়েছেন।

তিনি চার-পাঁচ বার বডিবিল্ডিংয়ে ‘মিস্টার পাকিস্তান’য়ের ঢাকা থেকে প্রতিযোগী ছিলেন। সবার চোখেই ছিলেন সুদর্শন। সানগ্লাস, শার্ট ও বেলবটম প্যান্ট পরে ঘুরতেন, তার বাবাও যথেষ্ট ধনী ব্যবসায়ী, ঢাকাতেই বড় হওয়া, কখনও সিনেমা করবেন, ভাবেননি।

একদিন হেঁটে যাচ্ছিলেন গুলিস্তান দিয়ে, দুই লোক এসে বললো, “আমাদের বস আপনাকে ডাকে।”

তিনি যেয়ে দেখলেন পরিচালক মহসিন বসা।

বললেন, “এরকম একটা সিনেমা বানাবো, তোমাকে নিতে চাই।”

ওয়াসীম সিরিয়াস মনে না করে রাজি হলেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হল চিত্রালীর সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরীর বোনের বাসায়।

অডিশনে তিনি যাই বলেন তাই ওকে। আউটডোর চিত্রায়ণেও তাই, এক টেকেই সব ওকে। এই প্রতিভা দেখে খুব মুগ্ধ সবাই।

তিনি কখনই আগে লুঙ্গি পরেননি।  গ্রামেও থাকেননি। কিন্তু লম্বা কোর্তা, পাজামা, রাজা বাদশাহর পোশাক এসবই হয়ে গেল তার ‘আইডেন্টিটি’।

প্রথম সিনেমায় তার নায়িকা ছিলেন ববিতা, নাম ‘রাতের পর দিন’।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সিনেমা করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীর অফিসার পদের চাকরি পেয়েও যাননি।

এস এম শাফি, মমতাজ উদ্দীন, ইবনে মিজান- সবার পছন্দের ছিল নায়ক ওয়াসীম। আর ওয়াসীমের ছবি মানেই বক্সঅফিসে সাফল্য।

এক সময় মনে করা হত তিনি শুধু গ্রামীণ আর রাজা বাদশার সিংহাসন দখলের তরবারী যুদ্ধেই সিদ্ধহস্ত।

তবে সবাইকে ভুল প্রমাণ করে সামাজিক অ্যাকশন ছবিতেও তিনি সফল।

একটা ছবি আছে নাম ‘ইমান’। সেখানে তিনি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এই ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

‘বাহাদুর’ ছবি করতে গিয়ে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন।

সাগরের পাড়ে ঘোড়া চালাচ্ছিলেন ইবনে মিজানের সেই ছবিতে, তো জোয়ারের টানে ঘোড়া-সহ তাকে প্রায় গভীর পানিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ছোটবেলায় খেলাধুলার সঙ্গে ছিলেন আর শারীরিক ভাবে সুঠাম বলেই সে যাত্রায় ঘোড়াসহ বেঁচে ফিরেন। ঘোড়া চালনায় খুবই দক্ষ ছিলেন।

বাংলা সিনেমায় তার চেয়ে ভালো বাস্তব জীবনে ঘোড়া চালাতে আর কেউই পারতো না। বাংলা সিনেমায় তখন ঘোড়াগুলি ছিল ছোটো খাটো। কিন্তু তার কাজে অবশ্যই আনা হতো, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ঘোড়া, যা দেখতে ভালো, লম্বা ও বয়সে তরুণ।

তিনি যেন বাংলা ছবিতে হলিউডের মতো ‘ওয়েস্টার্ন’ নায়ক।

অসংখ্য কালজয়ী গান আছে যা আপনি ভাবতেই পারবেন না নায়ক ওয়াসীমের লিপে ছিল।

যেমন- ‘এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না’, ‘চুমকী চলেছে একা পথে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘একা একা কেনো ভালো লাগে না’, ‘আয় রে মেঘ আয় রে’।

চাইলে আরও অনেকগুলো গানের নাম উল্লেখ করা যায়। এত সুন্দর আর শ্রোতাপ্রিয় সব গান তার ভাগ্যেই ছিল।

বিশেষ করে ‘দি রেইন’ ছবির কথা না বললেই নয়। অলিভিয়া-ওয়াসীম জুটি ছিল দেশের সবার মুখে মুখে।

এখন আমরা তামিল ভাষায় ছবির হিন্দি ডাবিং দেখি, তখন এই ছবির ডাবিং হয়েছে অনেকগুলো ভাষায়। এর সিনেমোটোগ্রাফি এত ভালো। গানে দেখবেন ‘আয় রে মেঘ আয় রে’ কত সুন্দর।

এই সুন্দর গানের জন্য তাদেরকে অভিযাত্রীর মতো পাহাড়ে উঠতে হয়েছে, মেঘের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে, দেখা গেল মেঘের দেখা নাই, গানের কাজ যখন শুরু হলো তখন সত্যি সত্যি পাহাড়ের একদম কাছে মেঘ, যেন ছায়া দিচ্ছে।

নায়ক ওয়াসীম কেমন জনপ্রিয় ছিল তা এই ফেইসবুক ইন্টারনেটের যুগে বোঝা যাবে না।

যেখানেই যেতেন খালি মানুষ আর মানুষ, সবাই তাকে দেখতে চায় এক নজর। আর তখন ঢাকা কেন্দ্রিক ছিল না কিছুই, দেখা যেত আজ মহেশখালী তো কাল নারায়ণগঞ্জ, পরশু আবার টাঙ্গাইল এভাবেই হত দৃশ্য ধারণের কাজ।

সুচরিতা, শাবানা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, অঞ্জনা এই ছিল ওয়াসীমের নায়িকা। এদের সবার সঙ্গে তার সফল জুটি।

এফডিসিতে প্রচলিত ছিল নায়ক ওয়াসীমের সঙ্গে ছবি করলেই হিট।

‘শোলে’ ছবির বাংলা রিমেইক ‘দোস্ত দুশমন’ কিংবা নিখাদ কমেডি ছবি ‘নান্টু ঘটক’ হোক- সব চরিত্রেই তিনি সফল।

পরিচালকদের সঙ্গে সারাদিন পড়ে থাকতেন। আসলে কী গল্প, কী চাচ্ছেন পরিচালক এসবই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান।

নায়ক হিসেবে প্রায় দেড়শ সিনেমায় অভিনয় করেছেন ওয়াসীম। নব্বই দশকে যখন স্যাটেলাইটের নতুন যুগের সূচনা হল তখন ওয়াসীমদের মতো নায়কদের নিয়ে সিনেমা করা বন্ধ হলো। অথচ নায়ক ওয়াসীমের দেওয়ার ছিল অনেক কিছু।

বক্স অফিসে দুই দশক রাজত্ব করা শেষে তিনি কাজ পাচ্ছিলেন না তখন। তাদের মতো নায়ককে নিয়ে কেউ গল্পও ভাবে নাই।

আক্ষেপে সিনেমা জগত থেকেই দূরে চলে যান।

মেজবাহ উদ্দিন ওয়াসীমের বন্ধু ছিলেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান; মারা গেছেন আড়াই বছর আগে।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সারা এফডিসিতে ওয়াসীমের চেয়ে ডেডিকেইটেড কোনো হিরো নাই।”

দুজনের ছেলেবেলা কেটেছে একসঙ্গে। দুজনেই সুদর্শন ছিলেন, দেখা যেত টিকেট ছাড়া স্টেডিয়ামে ঢুকে যেতেন ফুটবল দেখতে, পুলিশ দেখেও কিছু বলতো না।

১৯৫০ সালের ২৩ মার্চ চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন ওয়াসীম। বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ এপ্রিল মারা গেলেন।

তিনি মস্তিষ্ক, স্নায়ু, কিডনি ও হৃদসংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। কয়েকদিন আগে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

চলে গেলেও ওয়াসীম বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।