ইনামুল হক বিদায় নিলেন অশ্রু আর ফুলে

একজন শিক্ষক হিসেবে, অভিনেতা, নাট্যকার আর পরিচালক হিসেবে ইনামুল হক কেমন মানুষ ছিলেন, সেসব স্মৃতি ফিরে ফিরে এল সমাজের নানা অঙ্গনের প্রতিনিধিদের কথায়; কিন্তু দীর্ঘদিনের সহকর্মী আর বন্ধু আবুল হায়াত কিছু বলতে পারলেন না, ভেঙে পড়লেন কান্নায়।

মঙ্গলবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের শ্রদ্ধার ফুল আর বন্ধু-স্বজনদের অশ্রুমাখা ভালোবাসায় শিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই নাট্যজন।

ইনামুল হকের দুই মেয়ে হৃদি হক ও প্রৈতি হক, তাদের জামাতা অভিনেতা লিটু আনাম ও সাজু খাদেমও উপস্থিত ছিলেন শহীদ মিনারে।

হৃদি হক বললেন,“উনার ভাবনায়,চিন্তা-চেতনায় ছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ। তিনি আমাদের সকলের নাট্যগুরু, নাট্যপ্রাণ মানুষ। 

“সারাজীবন নাটক, থিয়েটার, শিল্পচর্চা… সেই গণআন্দোলনের সময় থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বাবা অনুবাদের কাজ করে গেছেন। যে ভালোবাসা তিনি মানুষকে দিয়েছিলেন, মানুষও তাকে সেই ভালোবাসা দিচ্ছেন।”

সোমবার বিকালে ৭৮ বছর বয়সে মারা যান মঞ্চ আর টেলিভিশনের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা ইনামুল হক। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে সংস্কৃতিকর্মীরা তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মঙ্গলবার সকালে তার কফিন নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দুপুরে মরদেহ নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেখানে জানাজা শেষে জোহরের নামাজের পর বনানী কবরস্থানে শায়িত হন অভিনেতা ইনামুল হক।

ইনামুল হকের সঙ্গে আবুল হায়াতের বন্ধুত্ব ৫০ বছরের। তিনিও একসময় বুয়েটে চাকরি করেছেন, একসঙ্গে তারা অভিনয় করেছেন বহু নাটকে।

মঙ্গলবার সকালে আবুল হায়াত শহীদ মিনারে এসেছিলেন অনেকের আগেই।বন্ধুর কফিনে ফুল দেওয়ার সময় তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। মেয়ে  নাতাশা হায়াত পাশ থেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, কিন্তু আবুল হায়াতের কান্না থামছিল না।    

ইনামুল হকের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন,  “তিনি হক একাধারে শিক্ষক, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, অধিকন্তু তিনি অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন।

“তিনি দীর্ঘ ৪৩ বছর বুয়েটে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন, বহু কালজয়ী নাটকের স্রষ্টা তিনি, বহু কালজয়ী নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন।”

চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার অবদানের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “তার মত এমন একজন গুণী মানুষের হঠাৎ প্রস্থান সত্যিকার অর্থেই এটি জাতির জন্য বেদনার, আমাদের সবার জন্য বেদনার। তার এই মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, নাট্য অঙ্গন ও সাংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন,“এরকম একজন অভিনেতা ও বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে আমরা অত্যন্ত শোকাহত। এই শূন্যতা আসলে পূরণ হবে না। তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আদর্শ হয়ে থাকবেন।”

ইনামুল হকের কফিনে ফুল দিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “তার চলে যওয়াটা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশরত্ম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করছি, সেই জায়গায় তিনি পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন।”

আজীবন তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করেছেন জানিয়ে তার অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণ তার স্বপ্ন ছিল। সেজন্য সর্বক্ষেত্রে তিনি আপোসহীন ভূমিকা রেখেছেন।

“এক প্রকার নীরবেই তিনি চলে গেলেন। এটা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তার যে কর্ম সেটা আমাদের আগামীদিনের পথ দেখাবে।”

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইনামুল হকের কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন দলটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অসীম কুমার উকিল বলেন, “বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, সব ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

“বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমরা উনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমরা উনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।”

শহীদ মিনারে ইনামুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “ইনামুল হক মানুকে সব সময় আনন্দ দিয়ে থাকতেন। তিনি হাসতে শিখিয়েছেন।

“তার প্রস্থানে দুঃখের মধ্যে সামান্যটুকু আনন্দ কে দেবে, আমি জানি না। অভিনয় জগত, শিক্ষাজগত সর্বত্র সব মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে তিনি আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছেন। আমি অন্তর থেকে তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। অনেক দিন তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”

শহীদ মিনারে ইনামুল হকের কফিনে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী, নাট্যকার ও অভিনেতা আবুল হায়াত, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবেদ খান।

এছাড়া সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ বেতার-টেলিভিশন শিল্পী সংস্থা, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ, ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অর্গানাইজেশন,বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গাঙচিল, কণ্ঠনীলন, বাংলাদেশ আবৃত্তি শিল্পী সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।