নোনা জলের কাব্য: ‘বিজ্ঞানমনষ্ক’ গতিশীল এক চলচ্চিত্র

কপাল খারাপ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। ‘নোনা জলের কাব্য’ ছবির ভাগ্যে সেটা খাটবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এই ছবিটা নিয়ে তেমন কোন আলোচনাই চোখে পড়েনি। উপকূলীয় অঞ্চলের এক জেলেপাড়ার মানুষদের নিয়ে ‘বিজ্ঞান মনষ্ক’ দারুণ গতিশীল এক ছবির নাম ‘নোনা জলের কাব্য’!

ধর্মীয় কু-সংস্কার আর প্রচলিত বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া এই ছবিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ভাস্কর্য ও মূর্তি নিয়ে। উত্তরও দেওয়া হয়েছে এভাবে-নির্দিষ্ট কারও মূর্তি যেটা উপাসনাতে ব্যবহৃত হয়, সেটি আর ভাস্কর্য এক নয়! ভাস্কর্য এমন এক নির্মাণ যেটি যে কোন কিছুর প্রতীক হয়ে থেকে যেতে পারে বছরের পর বছর! ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ প্রার্থনা করে না!

বাবার স্মৃতি নিয়ে উপকূলীয় এক জেলে পাড়ায় বেড়াতে আসে ছবির নায়ক তিতাস জিয়া, ছবিতে যার নাম রুদ্র। সে জেলেদের জীবনে অভ্যস্ত হতে যেয়ে জড়িয়ে যায় অনেকের সাথে। এলাকার বাশার নামের এক জেলের বাসায় ‘পেইং গেস্ট’ হিসেবে থাকে রুদ্র। ছোট ছোট ছেলেরা তার কাছে ছবি আঁকা আর ভাস্কর্য বানাতে শেখে। পাড়ায় রাষ্ট্র হয়ে যায় যে রুদ্র ছেলেপেলেদের ‘উল্টাপাল্টা’ কাজ শেখাচ্ছে। তার সাথে সবাইকে মিশতে মানা করে দেয় এলাকার চেয়ারম্যান ও তার লোকেরা। জেলেদের নৌকায় ইলিশ আগের মতো ধরা না পড়লে বিশেষ নামাজ ও মিলাদের আয়োজন করা হয়। রুদ্র বোঝাতে চেষ্টা করে এর বৈজ্ঞানিক কারণ ভিন্ন। প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণ না করলে প্রকৃতি হয় তার ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়। পরের সিজনে ভালো মাছ ধরা পড়লে জেলে পাড়ার অনেকে রৌদ্রর প্রতি সদয় হয়। রৌদ্র জেলেদের জীবন দেখতে সমুদ্র যখন উত্তাল তখন জেলে নৌকায় উঠে সমুদ্রে যায়। রৌদ্রর ‘সী সিকনেসে’ আক্রান্ত হবার দৃশ্যটাও শিক্ষণীয়। এরপরে একদিন আসে সাত নম্বর সিগনাল এর ঘোষণা। চেয়ারম্যানের দাদনে জর্জরিত জেলেদের মাছ ধরতে যেতে বলা হয়। রেডিও শুনতে মানা করা হয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রচার করা হয়- আমাদের বাবা চাচারা তো রেডিও শুনত না। তারা কীভাবে মাছ ধরত?

রুদ্র সবাইকে এই আবহাওয়ায় মাছ ধরতে যেতে মানা করে। বেঁচে থাকার জন্য সাইক্লোন সেন্টারে যেতে পরামর্শ দেয়। টানটান উত্তেজনার এই ছবিতে শেষমেষ সাইক্লোন সেন্টার হয় সবার বাঁচার ঠিকানা।

সমুদ্র পাড়ের জেলেদের জীবনটা গতিশীল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মারমুখো ছোবলের নিচে তাদের জীবন। জীবনটা তাদের দাদনে জর্জরিত, লেখাপড়া শেখার ইচ্ছে থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়া তাদের জীবন। পুরো ছবিতে সমুদ্রের এই রূপ আর মানুষের জীবন সংগ্রাম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সমুদ্র পাড়ে সেট বানিয়ে রা বৃষ্টিতে শুটিং করাও দুরূহ। তার চেয়েও কঠিন জেলে পাড়ার মানুষদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অভিনয় করা। রুদ্ধশ্বাস গল্পের শেষ পরিণতি দেখার টানটান উত্তেজনাও আছে ছবিতে।

নোনা জলের কাব্য মুক্তি পেয়েছে ২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর। পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম সিনেমা এটি। ছবিতে রুদ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিতাস জিয়া, যিনি ‘মৃত্তিকা মায়া’য় অভিনয় করে পুরস্কার পেয়েছিলেন। টুনি চরিত্রে অভিনয় করেছেন তামান্না তাসনুভা, যিনি আবদুল্লাহ মো. সাদের প্রথম ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। চেয়ারম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু এবং তার সহযোগীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ। বাশার (জেলে) এর ভূমিকায় অনিয় করেছেন অশোক ব্যাপারি। শিশু চরিত্র সহ সবগুলো চরিত্রে এক কথায় ‘দুর্দান্ত’ অভিনয় করেছেন সবাই। রুদ্র ছাড়া কাউকে জেলে পাড়ার বাইরের মানুষ মনে হয়নি।

এই ছবির শুটিং হয়েছে কুয়াকাটায় এবং চিটাগংয়ে। ছবির শুরুটাতেই চেনা বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে। চিটাগং পোর্টে মাল খালাস করতে ‘উপরি’ দেওয়া লাগে। সাগর পাড়ের জেলেদের জীবন আর নিয়তিনির্ভর এই গল্পের শুটিং হয়েছিল কুয়াকাটার গঙ্গামতির চড়ে। পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত জানিয়েছেন গঙ্গামতির চড়টা এখন আর মানচিত্রে নেই। চলে গেছে সমুদ্রের জলের নীচে! অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ জানিয়েছেন একটা জাহাজ চট্টগ্রাম উপকূলে আটকা পড়েছিল। রুদ্র ও টুনির পালানোর ঘটনা এই জাহাজে চিত্রায়িত হয়েছে।

জয় হোক বাংলা ছবির।

গ্লাসগোয় প্রদর্শিত হল ‘নোনা জলের কাব্য’